দেশি মুরগির তা’য়ে বন মুরগির বাচ্চা ফোটাচ্ছেন মারমা যুবক

ওই খামারি বন মুরগির ডিমকে দেশি মুরগির তা’য়ে ফুটিয়ে ঘরে পালন করছেন; ফলে তিনি বন্যপ্রাণী নিধন আইনে অপরাধী নন বলে জানায় বনবিভাগ।

উসিথোয়াই মারমাবান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Oct 2023, 03:40 PM
Updated : 10 Oct 2023, 03:40 PM

পাঁচ বছর আগে পাহাড়ে জুম চাষ করতে গিয়ে তিনটি বন মুরগির ডিম কুড়িয়ে পেয়েছিলেন মারমা যুবক হ্লাসুইঅং। ডিমগুলো তিনি ঘরে আনেন। তখন তার বাড়িতে একটি দেশি মা মুরগি ডিমে তা দিচ্ছিল। অনেকটা শখের বশে সেই তা’য়ে ডিম তিনটি বসিয়ে দেন তিনি। এক মাস পর দুটি ডিম ফুটে বাচ্চা হয়।

এরপর বাচ্চা দুটি দেশি মা মুরগির সঙ্গে বড় হতে থাকে। এর মধ্যে একটি মুরগি, অন্যটি মোরগ। দিনে দিনে বংশবৃদ্ধি হয়ে এখন বন মুরগি খামারে পরিণত হয়েছে।

বান্দরবানের সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের রাবার বাগান এলাকার মেওয়া পাড়ার বাসিন্দা হ্লাসুইঅং মারমা। বান্দরবান সদর থেকে সেখানে যেতে মোটরসাইকেলে সময় লাগে ৪০ মিনিট। তারপর আধা ঘণ্টার হাঁটা পথ।

খামারে গিয়ে দেখা যায়, হ্লাসুইঅং মারমা দেশি মুরগির সঙ্গে বন মুরগিকে খাবার দিচ্ছেন। তিনি জানান, বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলে অর্ধশতাধিক বন মুরগি রয়েছে।

বন মুরগির ডিমকে দেশি মুরগির তা’য়ে ফুটিয়ে ঘরে পালনের অভিনব কাজে অবাক হয়েছেন স্থানীরাও। অথচ বন মুরগি স্বভাববশত বনে-জঙ্গলেই থাকে। তাকে পোষ মানানো তো দূরের কথা; মানুষের শব্দ পেলেই ঝোপের আড়ালে চলে যায়।

হ্লাসুইঅং মারমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত পাঁচ বছরে দেড়শটির মত বন মুরগি হয়েছে। বর্তমানে ডিম দেওয়ার সম্ভাব্য ২২টি মুরগি, ১৩টি পরিপক্ব মোরগ, দুইটি শিকারি মোরগ এবং তিনটি মুরগির ১৭টি বাচ্চা এবং অপর একটি মুরগি নয়টি ডিম নিয়ে তা’য়ে রয়েছে।”

বন মুরগি পালনের ঝুঁকির বিষয়ে এই খামারি বলেন, বন বিড়াল ও শিয়ালের জন্য একটু ঝুঁকি রয়েছে। অনেক সময় বন বিড়াল এসে আক্রমণ করতে চায়। কিন্তু মুরগিগুলো স্বভাবজাতভাবে বনের হওয়ায় সহজে ফাঁকি দিতে পারে বলে জানান তিনি।

দামের বিষয়ে হ্লাসুইঅং মারমা বলেন, ঘরে পালন করা বন মুরগি বিক্রি হয় ভালো দামে। একটি বন মোরগ তিন হাজার এবং একটি মুরগির এক থেকে দেড় হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়।

ওজন দেশি মুরগির মত নয়। একটি পরিপক্ব মোরগের ওজন সর্বোচ্চ ৭০০-৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। আর মুরগির ওজন হয় ৬০০-৭০০ গ্রামের মত।

এই মুরগির চাহিদা সম্পর্কে তিনি বলেন, “এলাকায় বন মোরগের চাহিদা বেড়েছে। অনেক অর্ডার আছে। তবে ছোট অবস্থায় বিক্রি করি না। কেবল পরিপক্ব হলেই বিক্রি করি।

লালন-পালনের বিষয়ে হ্লাসুইঅং মারমা বলেন, তারা নরম কোনো খাবার ও ধানের ভুসি খেতে পারে না। নরম খাবার খেলে পাতলা পায়খানা হয়। দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ কারণে খাবার হিসেবে শক্ত দানা খাবার, ধান অথবা পোকামাকড় দিতে হয়।

শুরুর দিকে না জেনে নরম খাবার ভুষি দেওয়ায় অসুস্থ হয়ে পাঁচ-ছয়টার মত মুরগি মারা গেছে বলে জানন তিনি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি বন থেকে বন্যপ্রাণী ধরে নিয়ে এসে বাসায় রাখলে অথবা পোষ মানানোর চেষ্টা করলে সেটা বন্যপ্রাণী নিধন আইনে অপরাধ হবে।

“আর বন মুরগির ডিমকে দেশি মুরগির তা’য়ে ফুটিয়ে ঘরে পালন করার পর সে আর বনের থাকে না। এখন গৃহপালিত হয়ে গেছে। সে তার মত করে ঘরে পালন করছে, করুক।”

কেউ গৃহপালিতভাবে ঘরে পালন করতে পারলে অসুবিধা নেই। এতে দেশি মুরগি উৎপাদন বাড়বে বলে জানান তিনি।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিষয়ক কর্মকর্তা পলাশ কান্তি চাকমা জানান, “যে কোনো বন মুরগি ঘরে নিয়ে পালন করলে পোষ মানানো যায় না। তবে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে তবেই লালন-পালন করা যায়। এ ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।

তবে খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাবার বা পোকামাকড় দিতে হয়। না হলে অসুস্থ হয়ে মারাও যেতে পারে। তবে গৃহপালিত অন্যান্য পশুপাখি থেকে বন মোরগের কম রোগ হয়ে থাকে বলে জানান এই প্রাণিসম্পদ বিষয়ক কর্মকর্তা।