অভাব ঠেলে যমজ দুই বোনের জিপিএ-৫, প্রতিবন্ধী বাবার দুঃখ ঘোচানোর স্বপ্ন
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উচ্চ মাধ্যমিকের ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারা দুজনই এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
শ্রবণ প্রতিবন্ধী বাবার বেকারত্ব, সংসারে অভাব-অনটন আর নানা সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে সাফল্য অর্জন করেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের যমজ দু বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই পেয়েছে জিপিএ-৫।
উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জি গ্রামের এই দুবোন রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী। তাদের কলেজ থেকে ১৪২ জন এবার এইচএসসিতে পাস করেছে। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে শুধুমাত্র তারা দুজনই।
শুধু তাই নয়, উপজেলার সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ উচ্চ মাধ্যমিকের মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারাই জিপিএ-৫ অর্জনকারী। তাদের এই অদম্য সাফল্যে আনন্দিত প্রতিবেশী, স্থানীয়রাও।
তাদের বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু ও মা নাসিমা বেগম। এ দম্পতির তিন মেয়ে। এর মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে।
মনির হোসেনের স্থায়ী কোনো কাজ নেই। অল্পকিছু কৃষি জমি আর অনিয়মিত কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজের আয় দিয়েই সংসার চালাতেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
তবে পড়াশোনায় দুই বোনের অদম্য আগ্রহে তারা কখনো বাধা দেননি।
মেয়েদের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম বলেছেন, “এতো খুশি জীবনে আর কখনো হইনি। ওদের মুখে আনন্দের হাসি দেখেই বুকটা ভরে যায়। কিন্তু এর পিছনে কষ্টের লড়াই দীর্ঘদিনের।
“আমার স্বামী কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগে মাস্টাররোলে টাইপিস্টের চাকরি করতেন। তবে ২০০২ সালে সে চাকরি থেকে বাদ পরে। এরপর থেকে বেকার। কেউ কাজে নেয় না।”
সংসার চালাতে সংগ্রাম করার চেষ্টার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “দুই বিঘা জমি। এক অংশে সুপারির বাগান, অন্য অংশে শাকসবজি চাষ করি। এছাড়া হাঁস, মুরগী লালন-পালন করি। স্বামী এসব দেখাশুনা করে। এই আয়েই খাওয়া-পরা, চিকিৎসা, আর সন্তানের লেখা পড়ার খরচ চালানো। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা “
অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছেন জানিয়ে তিনি যোগ করেন, “প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার দুই বোনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। কলেজের অধ্যক্ষ স্যার ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তারা উপবৃত্তিও পেয়েছে।
“অনেকের সাহায্য সহযোগিতা ছিল। সবার সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েদের পক্ষে এতো ভালো ফল করা সম্ভব হতো না।”
মা হিসাবে তিনি চান, দু’মেয়ে পড়ালেখা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক।
তিনি বলেন, “আমি চাই তারা চাকরি করে বিয়েশাদি করুক। কারোও উপর যেন নির্ভরশীল হতে না হয়। অভাব যেন না ছোঁয় তাদের। অভাবের যে কি কষ্ট তা আর কেউ বুঝবে না ভুক্তভোগী ছাড়া।”
বাবা মুনির হোসেন সরদার বলেন, তিনি চান তার দুই মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। আর লেখা পড়া শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বা কলেজের শিক্ষক হোক। এই তার চাওয়া।
নিজেদের পরিশ্রমের কথা জানিয়ে রহিমা ও রাবেয়া বলেন, বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও কমাতে এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে তারা ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়েই পড়াশোনা করেছেন।
তারা বলেন, কলেজে যাতায়াত ও খাওয়া-দাওয়ার সময়টুকু বাদে প্রায় সব সময়ই পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেন। ঘুমাতেনও খুব সীমিত।
জমজ এ দুবোন বলেন, এখন তাদের স্বপ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাবাকে স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ উপহার দিতে। এরপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তারা শিক্ষকতা পেশায় যেতে চান।
সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি কথা জানিয়ে তারা বলেন, বিভিন্নজনের সহযোগিতায় রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করছেন। সবার দোয়া আর সহযোগিতা চান তারা।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেছেন, "রাজারহাট উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে এই যমজ দুই বোনই মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের এ অসাধারণ সাফল্যে আমরা আনন্দিত।
তিনি আরও বলেন, নানা সংকটের মধ্যেও রহিমা ও রাবেয়ার এমন সাফল্য এলাকাবাসীকে গর্বিত করেছে। তাদের এই অর্জন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় মনোযোগী হতে এবং স্বপ্নপূরণে সাহস জোগাবে, এমনটাই আশা করি।”
কলেজের পক্ষ থেকেও দুজনকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এই শিক্ষক।
