জিপিএ-৫ পাওয়ার পথে দিনমজুরি, হোটেল বয়ের কাজও করেছেন কৌশিক
এসএসসির মতো এইচএসসিতেও বিজ্ঞান বিভাগে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র কৌশিক।
ভূমিহীন পরিবার, অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব ঘোচাতে ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তাই টিউশনির পাশাপাশি দিনমজুরি, হোটেল বয়ের কাজও করেছেন বিশাল সরকার কৌশিক। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি।
এর ধারাবাহিকতায় এসএসসির মতো এবারের এইচএসসির ফলাফলেও বিজ্ঞান বিভাগে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের এ ছাত্র।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশেই ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘর, এক কোণায় খোলা রান্নাঘর।
সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। সুপারি বাগান ও বাঁশ ঝাড়ের পাশে আঙিনা জুড়ে দারিদ্র্যতা আর দুঃখের জীবনের ছাপ।
তার মাঝেও যেন বাড়ির ছেলে কৌশিকের সাফল্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে দের জীর্ণ কুটিরটি।
কৌশিক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তার এই ধারাবাহিক সাফল্যের পিছনে নিদারুণ কষ্ট আর সংগ্রামের কাহিনি।
কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া। সামান্য সম্মানি পান। বাবা সুকুমার সরকার নানা অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় টি-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।
সুকুমার সরকার বলেন, তার একটি ছোট টি-স্টল ছিল সড়কের ধারে সরকারি খাস জায়গায়। ২০২০ সালে উচ্ছেদের সময় ঘরবাড়িসহ দোকানও উচ্ছেদ হয়। এখন এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগান ও বাঁশ ঝাড়ের পাশে মাথা গুঁজে আছেন।
তিনি বলেন, তার তিন ছেলে-মেয়ে, তারা সবাই মেধাবী। বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়ে। টিউশনি করিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ সে নিজেই কোন রকমে জোগায়। আর অভাবের কারণে একমাত্র মেয়ে সূচনাকে এসএসসি পাশ করার পর বিয়ে দিয়েছেন।
ছোটবেলা থেকেই কৌশিক পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতেও সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছিল সে। পরে বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।
সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। পরে ভর্তি হয় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
কৌশিক বলেন, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণেই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রধান এখন বাধা চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের উপর ঋণের বোঝা।
তার মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম আর বেদনার নানা টুকরো গল্প তুলে ধরেন তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে।
তিনি বলেন, স্কুলে ভর্তির পরেই বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় তার শিক্ষা জীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়তে পারেননি অর্থাভাবে।
অটো ভাড়ার অভাবে অনেকদিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন অভুক্ত থেকেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “ক্ষুধার যে কি কষ্ট কেউ বুঝবে না।”
স্বল্প আয়ে তার বাবার পক্ষে পড়াশোনার খরচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না । তাই কখনো টিউশনি, কখনো দিনমজুরি, নিজেও হোটেল বয়ের কাজ করেও পড়াশোনার খরচ জুটিয়েছেন বললেন কৌশিক।
তবে এ সময় শিক্ষকসহ অনেকেই তার প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রবাসী এক ব্যক্তির সহায়তাসহ শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তার স্বপ্ন পূরনের যাত্রা অব্যাহত থাকে। এসএসসিতে কয়েকজন শিক্ষক তাকে ফ্রিতে পড়িয়েছেন। একইভাবে এবারেও এইচএসসিতে কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা ফিতে টিউশনি পড়ান এবং করেন অন্যান্য সহায়তা।
ঋণ-দেনার চাপে সাফল্যের আনন্দ ফিকে
কৌশিকদের সংসারের বোঝাটা আরও বড় হয়েছে দুটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের দায় থাকায়।
নিত্য অভাব আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন কৌশিকের মা কনা রাণী।
কিন্তু সেই কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় আরেক বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেয়ে ধার করেন আরও ৫০ হাজার।
এভাবেই একের পর এক ঋণের জালে জড়িয়ে ধুঁকছে সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি। এখন প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি জোগানোর চাপে সেরা ফলের আনন্দও ফিকে হয়ে আছে পরিবারে।
বড় ভাই কর্ণ বলেন, “চরম অভাব-অনটনের মাঝেও ছোটভাইয়ের সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ।”
মা কণা রানী জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না, তার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে পরবর্তী লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না।
তাই ছেলের স্বপ্ন পূরণে সরকার বা হৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এই মা।
