মেয়র আইভীর মিছিলে হামলা: অস্ত্রের ধারা থেকে আসামিদের অব্যাহতি

আইভী জানিয়েছেন, তিনি অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন।

সৌরভ হোসেন সিয়াম, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2023, 01:17 PM
Updated : 13 Jan 2023, 01:17 PM

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তার অনুসারীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষের মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই।

অভিযোগপত্রে ১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, জখম, ভাঙচুর ও নাশকতার প্রমাণ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে অস্ত্র আইনের ধারা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

চার বছর আগের এই মামলার তদন্ত শেষে গত ২৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় বলে আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান জানান।

তবে বিষয়টি সম্প্রতি সামনে আসে। ৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিষয়টির অবতারণা করে এ অভিযোগপত্রে ‘অসন্তুষ্ট’ সেলিনা হায়াৎ আইভী জানিয়েছেন, তিনি এর বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন।

অভিযোগপত্রে যাদের নাম এসেছে তারা হলেন- মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ্ নিজাম, যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলাম খান, হকার নেতা রহিম মুন্সি, আসাদুল ইসলাম ওরফে আসাদ, সায়মন, ইকবাল হোসেন, মাসুদ পাটোয়ারী ওরফে শুক্কুর, তোফাজ্জল, পলাশ মিয়া, মহসীন বেপারী, সালাউদ্দিন ওরফে সালাউদ্দিন গাজী, সাদেকুল ইসলাম।

আসামিরা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের সমর্থক বলে শহরে পরিচিতি রয়েছে।

Also Read: নারায়ণগঞ্জের নাম ‘ওসমান নগরী’ দিলে ভালো হয়: মেয়র আইভী

যে ১২ জনের নাম অভিযোগপত্রে এসেছে তার মধ্যে কেবল শাহ্ নিজাম ও নিয়াজুল ইসলাম খান এজাহারভুক্ত আসামি; বাকিরা এজাহারবহির্ভূত। একইসঙ্গে মামলার নয় আসামির বাকি সাতজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পিবিআই।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পরিদর্শক আতাউর রহমান বলেন, “ঘটনার তদন্তে যতটুকু পাওয়া গেছে সেটাই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামি নিয়াজুল ইসলাম খানের কাছে থাকা অস্ত্রটির তার নামে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছিল। ঘটনার দিন ওই অস্ত্র দিয়ে কাউকে আঘাত করা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।“

“অন্যদিকে শাহ্ নিজামের অস্ত্রটি ভিডিওতে দেখা গেলেও সেটি উদ্ধার করা যায়নি বলে অস্ত্র আইনের ধারায় তাকেও সংযুক্ত করা যায়নি। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে হুমকি, হত্যাচেষ্টা, জখম, নাশকতা, ভাঙচুরসহ অরাজকতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।”

পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, “অস্ত্র মামলার ধারায় বলা আছে, অস্ত্র উদ্ধার মানে প্রদর্শনীয় থাকতে হবে। আমরা মামলার দায়িত্ব অনেক পরে পেয়েছি। ততক্ষণে আসামিরা জামিনে। এখন কোনো আসামি জামিনে থাকলে তাকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা তারপর অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব নয়।”

Also Read: সংঘর্ষ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শামীম-আইভীর

“মামলার আরেক আসামি নিয়াজুল ইসলামের বৈধ অস্ত্র। তার বৈধ অস্ত্র যদি অবৈধভাবে ব্যবহার হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এরই মধ্যে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তার অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলেও জেনেছি।”

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘাতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় সিটি মেয়র নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি অভিযোগ দিলে তা সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

ঘটনার ২২ মাস পর আদালতের নির্দেশে এটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ। ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফাহমিদা খাতুনের আদালত এজাহার গ্রহণ করে সেটিকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য সদর থানাকে নির্দেশ দেন।

আইভীর পক্ষে মামলার বাদী হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা জি এম সাত্তার। ওই মামলায় নয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৯০০ থেকে ১০০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।

মামলায় বাদী জি এম সাত্তার বলেন, “শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যেগের এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান হকারদের পক্ষে অবস্থান নেন। এদিকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে হকারদের ফুটপাত দখলমুক্ত করে দিতে নির্ধারিত সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

“সময় পেরিয়ে গেলেও হকাররা ফুটপাত না ছাড়ায় মেয়র আইভী শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে চাষাঢ়ার সায়াম প্লাজার সামনে গেলে হামলার শিকার হন। এই সময় এক নম্বর আসামি নিয়াজুল ইসলাম খান ও দুই নম্বর আসামি শাহ্ নিজামসহ অন্য সন্ত্রাসী গুলি করে। এই সময় মেয়র আইভীকে মানবঢাল তৈরি করে রক্ষা করা হয়।”

অভিযোগপত্রে পিবিআই উল্লেখ করেছে, মামলাটি শুরুতে সদর মডেল থানা পুলিশ তদন্ত করে; পরে তারা দায়িত্ব পায়। তদন্তে যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলাম খান ও শাহ্ নিজামের হাতে ঘটনার দিন পৃথক দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিলো বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ঘটনার দিন ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেও আসামিদের হাতে পিস্তল দেখা যায়।

তবে তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়, নিয়াজুল ইসলাম খানের পিস্তলটির লাইসেন্স রয়েছে। ঘটনার দিন ওই পিস্তলটি গুলিসহ খোয়া যায় বলে তার ভাই রিপন থানায় একটি জিডিও করেছিলেন। পরবর্তীতে পিস্তলটি ঘটনাস্থলের অদূরে একটি ফুলের টবের ভেতর পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১০টি গুলিসহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পিস্তলটির প্রকৃত মালিক নিয়াজুল ইসলাম হওয়ায় তাকে অস্ত্র আইনের ১৯ (ক) ধারায় তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে পিবিআই।

এদিকে শাহ্ নিজামের হাতে থাকা পিস্তলটির বিষয়ে পিবিআই অভিযোগপত্রে বলছে, শাহ্ নিজামের নামে একটি বন্দুকের লাইসেন্স থাকলেও পিস্তলের লাইসেন্স নেই। ভিডিও ফুটেজে নিজামকে বিনা লাইসেন্সে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও পিস্তল জাতীয় আগ্নেয়াস্ত্র নিজ দখলে রাখতে দেখা গেলেও আসামি জামিনে থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি।

ফলে ওই অস্ত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি। তদন্তকালে অস্ত্রটি উদ্ধারও সম্ভব হয়নি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯ (ক) ধারায় অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি।

একইসাথে মেয়র আইভীকে হত্যার উদ্দেশে ওই দুই আসামি গুলি করেছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ থাকলেও তদন্তে এ সংক্রান্ত কোনো আলামত ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তীতেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানায় পিবিআই।

তবে মামলার বাদী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা জি এম সাত্তার বলেন, “অস্ত্রের বিষয়টি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অথচ অস্ত্র আইনের ধারা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমরা নারাজি দেব।”

আগামী ২৯ জানুয়ারি মামলার শুনানির তারিখ আছে। ওইদিন আদালতে তারা নারাজির আবেদন জানিয়ে মামলাটি পুনরায় সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন জানাবেন বলে জানান।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, “ভিডিও ফুটেজে অস্ত্র দেখা গেছে। এইসব ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সারা পৃথিবীর মানুষ তা দেখেছে। আসামিপক্ষের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে তদন্তকারী সংস্থা এমন অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে।”

এরপর ৮ জানুয়ারি রাতে নারায়ণগঞ্জে একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আবারও বিষয়টির অবতারণা করেন মেয়র। সেদিন তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জ হকারের নগরী। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারির কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। সেদিন অনেকেই আহত হয়েছিলেন। সেদিন গুলি করা হয়েছিল, মারা যেতে নিয়েছিলাম। আমার কিছু অকুতোভয় কর্মী মানবঢাল তৈরি করে বাঁচিয়েছিল।

“অথচ এই ঘটনায় পুলিশ অস্ত্রধারী শাহ্ নিজামকে মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে আমরা আদালতে নারাজি দেব।”

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, “ওইদিন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর সশস্ত্র হামলা করে শামীম ওসমানের অনুগত বাহিনী। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে অস্ত্রসহ হামলার সেসব ছবি ছাপা হয়ছে, সারাদেশের মানুষ তা দেখেছে। পুলিশের এমন অভিযোগপত্র পুলিশ এখনও ওসমান পরিবারের অনুগত বলেই প্রমাণ করে। তারা একটি পরিবারের হয়ে কাজ করে বলেই এমন প্রতিবেদন দিয়েছে।”

এদিকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাটিতে আসামিদের কাউকে শনাক্ত করা যায়নি উল্লেখ করে আগেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

একই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও আলোর মুখ দেখেনি সেই তদন্ত প্রতিবেদন।

তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারা পর্যায়ক্রমে জেলা থেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক