১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতের অটোরিকশা: ‘বিপদের ভরসাই’ যখন বিপজ্জনক

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে রাতের বেলায় অটোরিকশাগুলো মানুষের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠছে।

তানভীর দিপু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Oct 2026, 11:32 PM

Updated : 12 Oct 2026, 11:32 PM

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় একশ কিলোমিটার এলাকা পড়েছে কুমিল্লা জেলার মধ্যে। অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ খ্যাত এই মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টাই যানবাহনে যাত্রীদের আনাগোনা চলে।

কুমিল্লা অংশের মহাসড়কে অন্তত পাঁচটি জায়গা থেকে অধিক সংখ্যাক যাত্রী উঠানামা করেন। স্বাভাবিকভাবেই অধিক রাতে বাসের মত সাধারণ পরিবহন থাকে না। তখন যাত্রীদের গন্তব্যে যেতে অটোরিকশাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।

কিন্তু বিপদের সময়ের এই ভরসার যানবাহনই এখন ‘ভয়ানক বিপজ্জনক’ হয়ে উঠছে বলে যাত্রী, চালক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।

তাদের ভাষ্য, গভীর রাতে এক শ্রেণির ছিনতাইকারী এই অটোরিকশাকে ব্যবহার করে মানুষকে সর্বশান্ত করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অটোরিকশার চালকদের হাতে মানুষকে প্রাণও দিতে হচ্ছে। অটোরিকশাগুলো মানুষের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হচ্ছে।

তার সবশেষ নজির হচ্ছে, কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ১৫ বছরের স্কুলছাত্রী। সে বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় নেমে অটোরিকশায় করে নগরীর রেসকোর্সের বাসায় ফিরছিল। পর দিন বৃহস্পতিবার জগতপুরের একটি ধানক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, যে অটোরিকশায় করে ওই কিশোরী বাসায় ফিরছিল, সেই অটোরিকশার চালক সুমন তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পালিয়ে যায়। সুমন গ্রেপ্তার হয়েছে।

এ মর্মান্তিক ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর প্রায় ছয় মাস আগে ঠিক একই রকমভাবে অটোরিকশার চালক ও ছদ্মবেশী যাত্রীদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তরুণ রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীকে।

২৪ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী। বাসার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও হচ্ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, অটোরিকশায় উঠার পর বুলেট বৈরাগীকে ছদ্মবেশী ছিনতাইকারীরা সবকিছু লুটে নিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

রাতের অটোরিকশার এই বিপজ্জনক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন, “আমরা দ্রুত চেষ্টা করব অটোরিকশা ও চালকদেরকে ডাটাবেজের আওতায় আনতে। প্রত্যেকটি অটোরিকশার মালিক ও চালকের তথ্য সম্বলিত কার্ড রাখতে হবে।”

সবচেয়ে বিপজ্জনক পদুয়ার বাজার

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় বাইপাস হয়েছে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়ক ও কুমিল্লা শহরের সংযোগ সড়কে। এ ছাড়া পদুয়ার বাজার থেকে ময়নামতি সেনানিবাস পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি পয়েন্টে রাতের বেলায় যাত্রী ওঠানামা হয়।

পদুয়ার বাজার, কোটবাড়ি বিশ্বরোড, জাগুরঝুলি, আলেখারচর, ময়নামতি সেনানিবাস- এই এলাকাগুলোতে যাত্রী পরিবহনের জন্য রাতের বেলা অন্তত ২০০ অটোরিকশা থাকে। পাবলিক যানবাহন কম থাকায় যাত্রীরা বাধ্য হয়েই এসব অটোরিকশায় চড়েন।

অটোরিকশার চালকদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এখানকার অন্তত ৭০ শতাংশ চালকের কোনো নিবন্ধন নেই। অনেকে বাইরে থেকেও আসেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘বদলি চালকরা’ রাতের বেলায় এসব অটোরিকশা চালান।

পদুয়ার বাজার হোটেল নূর জাহানের সামনে কথা হয় স্থানীয় অটোরিকশা চালক আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমি ৩০ বছর অটোরিকশা চালাই। দিনে যারা চালায় তাদের সবাই সবাইরে মোটামুটি চিনি। কেউ নিজের গাড়ি, কেউবা ভাড়ায় চালায়। আর কাগজ না থাকলে কে ড্রাইভার, কে ঠেকবাজ- কেমনে চিনমু কন?”

অটোরিকশার চালক হুমায়ুন কবির বলেন, “আমরা শুনি, খুন-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব অটোর চালকরা করেন। এখন এক-দুইজনের জন্য সবাইর দোষ হয়। আমরাও চাই, লাইসেন্স হউক। ড্রাইভার পরিচয় দিয়ে চলুক।”

পদুয়ার বাজারেই কথা হয় কুমিল্লা শহরের ব্যবসায়ি শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “আমরা রাত-বিরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে আসা-যাওয়া করি। বেশিরভাগ সময় রাতেই করি। আগে ফিরতে ভয় লাগতো না। এখন পরিচিত অটোরিকশা শহর থেকে আনিয়ে পরে বাসায় ফিরি। অপরিচিত অটোরিকশায় উঠিই না।”

কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ থানার সাবেক এক কর্মকর্তার ভাষ্য, “সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ এলাকা পদুয়ার বাজার। ওখানেই ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টি সদস্যরা।”

“এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এই অপরাধের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চক্র জড়িত। তারা হয়ত এই জেলার না। কিন্তু অন্য জায়গা থেকে এসে এসব ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। যানবাহনের নিবন্ধন না থাকলে কিংবা ঠিকমত চেকপোস্ট না হলে তাদেরকে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

সবশেষ স্কুলছাত্রী ‘ধর্ষণের পর’ হত্যার ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লালমাই থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যায় গ্রেপ্তার অটোরিকশার চালক সুমন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশায় থাকতো। অনেকক্ষেত্রে অটোরিকশায় কোনো নম্বর প্লেটও থাকে না। তখন কোনো অপরাধ হলে অপরাধী শনাক্ত করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সুমনের অটোরিকশায় নম্বর প্লেট ছিল। তারপরও তাকে ধরতে আমাদেরকে বেগ পেতে হয়েছে।”

বিআরটিএর কাছে তথ্য নেই

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ কুমিল্লা কার্যালয় থেকে জানা গেছে, জেলায় নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ২২ হাজার ২৪৭টি।

তবে ওই কার্যালয়ের কর্মকর্তা, অটোরিকশার মালিক ও চালকদের ধারণা, জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। অটোরিকশার চালকদের মধ্যে কতজনের লাইসেন্স আছে কিংবা নিবন্ধিত অটোরিকশা কোনো ইউনিয়ন বা সংগঠনের সদস্য কিনা সেই বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আলম বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অটোরিকশার মালিকদেরকে নির্দেশনা দেব যে, চালকদের নিয়োগবিধি বা এ ধরনের প্রক্রিয়া থাকবে। এর বাইরে গেলে মালিককে আইনের মুখোমুখি করা হবে।”

তবে চট্টগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী আবু মুসা বলেন, “নিবন্ধন ছাড়া অটোরিকশা কিংবা লাইসেন্স ছাড়া চালকের হাতে কোনো অপরাধ সংগঠিত হলেও বিআরটিএ কিংবা হাইওয়ে পুলিশ কেউ দায় এড়াতে পারে না। ধর্ষণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ হয়ে গেলে তারপর অটোরিকশার মালিক বা চালক খুঁজে কী লাভ?”

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা বলেন, “আমার যে জনবল ও যানবাহন আছে, তা দিয়ে পর্যাপ্ত চেকপোস্ট কিংবা টহল চালনা খুবই কষ্টকর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আসলেও কুমিল্লা-নোয়াখালী কিংবা কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি। আমরা চেষ্টা করি।”

তিনি বলেন, “অটোরিকশা নিবন্ধনের কাজ বিআরটিএর। তারা চাইলে অভিযান পরিচালনাও করতে পারে। আমরা সহযোগিতা করব। নিবন্ধন কিংবা লাইসেন্স না থাকলে কাউকে শনাক্ত করা খুবই কষ্টসাধ্য। সে ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।”

অটোরিকশার চালকদের অপরাধ প্রবণতা বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, “এটি মহাসড়ক পুলিশের বিষয়। এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে জেলা পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে।”

রোববার কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির কার্যপত্র বিবরণী থেকে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় মোট ১৬টি খুনের মামলা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

কুমিল্লায় ‘ধর্ষণের পর’ স্কুলছাত্রী হত্যা: কক্সবাজারে তরুণ আটক

কুমিল্লায় ‘ধর্ষণের পর’ স্কুলছাত্রী হত্যায় সুমনের জবানবন্দি

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন অটোরিকশা চালক: পুলিশ

ক্ষেত জুড়ে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, বাবাকে লাইভ লোকেশনও পাঠিয়েছিল কিশোরী

কুমিল্লায় জমিতে কিশোরীর লাশ, পাশে অটোরিকশা

কুমিল্লায় কিশোরী হত্যায় ‘মূল আসামি’ চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার

পুরানো খবর:

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রীকে ‘ধর্ষণের পর’ হত্যা: ‘প্রতারণা করে তাকে কক্সবাজারে আনা হয়’