মাদারীপুরে ৪ বধ্যভূমি চিহ্নিত, একটি সংরক্ষণের কাজ শুরু

বাকি তিনটির জমি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিরসন করে নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

মাদারীপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 March 2024, 05:33 PM
Updated : 26 March 2024, 05:33 PM

মাদারীপুরে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে নিহতদের গণকবর বা বধ্যভূমি সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। 

গণপূর্ত প্রকৌশল অধিদপ্তর এরইমধ্যে জেলার চারটি বধ্যভূমিকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছে; যার কাজ শেষের পথে। 

আর বাকি তিনটির মধ্যে একটা শহরে, একটা সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নে এবং আরেকটি রাজৈর উপজেলা খালিয়া ইউনিয়নে। সেগুলোর কাজও দ্রুত শুরু হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। 

গণকবর রক্ষার কাজ শুরুর পর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা বলছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের এই বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগের জন্য নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। জেলায় আরও যেসব বধ্যভূমি রয়েছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা। 

মাদারীপুর গণপূর্ত প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম খান বলছেন, সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ‘খলিল বাহিনী’কে ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা আক্রমণ করে। এ সময় বাহিনীর হাতে এ গ্রামের ১৩৫ জন নিহত হয়। নিহতদের কলাগাছিয়া গ্রামের বর্তমান এবিসিকে সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সামনে (তখন ফাঁকা ছিল) গণকবর দেওয়া হয়। 

২০২৩ সালের জুলাই মাসে মাদারীপুর গণপূর্ত প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় প্রতিটি বধ্যভূমিতে ৭০ লাখ ৯০ হাজার টাকা করে খরচ দেয় ‘মেসার্স ফারদিন বিল্ডার্স’। পরে তারা মাটি ভরাটের মাধ্যমে বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু করে। 

কামরুল বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে জেলার চারটি বধ্যভূমিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে একটি বধ্যভূমির নির্মাণ কাজ শেষের পথে; দ্রুতই এই বধ্যভূমির লিখিত ইতিহাসসহ উদ্বোধন করা হবে। আর বাকি তিনটির জমি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত নিরসন করে নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। 

স্বাধীনতার এত বছর পর কেন এ উদ্যোগ নেওয়া হল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করা, জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। আমরা সেই কাজটি গুরুত্বের সঙ্গে করার চেষ্টা করছি। স্বাধীনতার ৫২ বছর পরে হলেও বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করায়, স্থানীয়রা এই গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। 

“এতে মুগ্ধ এই অঞ্চলের মানুষেরা। আশা করছি, সবগুলো বধ্যভূমিই খুব শিগগির জায়গাগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে সংরক্ষণ করে ফেলতে পারব।” 

এবিসিকে সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দ্বীপ মজুমদার বলেন, “কলাগাছিয়ায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গ্রামের প্রায় দেড়শ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এখানে বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি না হলে, বিষয়টি আমি জানতামই না।”   

দ্বীপের সহপাঠী তনয় অধিকারী বলেন, “আমাদের এই কলাগাছিয়ার বধ্যভূমিই শুধু নয়। পুরো মাদারীপুর জেলায় যতগুলো বধ্যভূমি রয়েছে। সবগুলোই সংরক্ষণের দাবি জানাই।” 

কেন্দুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মো. রায়হান কবীর বলেন, “মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়ার যেসব সাধারণ মানুষদের পাকিস্তানিরা হত্যা করে পুঁতে রেখেছিল, সেখানে নতুন প্রজন্মের জানার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। 

“এটা খুব ভাল উদ্যোগ। এখানকার স্থানীয় লোকজন এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। এই জন্য আমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।” 

মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুরের খলিল বাহিনীর থানা কমান্ডার খলিলুর রহমান খান বলেন, “বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে জেলার সবগুলো বধ্যভূমিকে সংরক্ষণ করা জরুরি। আসলে এটা করতেই হবে। তা না হলে মানুষের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নষ্ট হয়ে যাবে।” 

মাদারীপুরের বধ্যভূমির সংরক্ষণের যেসব জটিলতা রয়েছে, তা নিরসন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।