Published : 27 Aug 2026, 04:20 PM
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নতুন তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করবেন তারা।
বৃহস্পতিবার নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই আসামি জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবন, বাসার ছাদে অবস্থান, শিক্ষককে হত্যার পর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন বলে আবদুল মাবুদের ভাষ্য।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মৃতদেহের ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, “চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তের বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং ডোপ টেস্ট করা হবে।”
তিনি বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি বিষয় নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখার কথা বলা হচ্ছে পুলিশের তরফে।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি আগে রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।
সেই বাড়ির দোতলায় প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেনে গণপতি চক্রবর্তী। তবে নিচতলার কাজ এখনো শেষ হয়নি। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।
শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
চারজনকে হত্যার এ ঘটনায় রোববার নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
ওই দিন ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাতেই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।
মঙ্গলবার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। পুলিশ দাবি করেছে, এই তিনজন ঘটনার রাতে একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
মামলাটির তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দেওয়া হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।
‘ছাদে ইয়াবা সেবন, ভোরে শিক্ষককে দেখতে পান’
আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রথমে সীমান্ত দাসের বাসায় যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের পর রাতের শেষভাগে আরও ইয়াবা সংগ্রহ করেন।
পরে রাস্তার কুকুর এড়িয়ে দেয়াল টপকে পাশের একটি বাড়িতে প্রবেশ করেন তারা। সেখানকার ছাদ থেকে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুট দূরত্বের গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে চলে যান। পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে করতে তারা কখন ভোর হয়ে যায়, তা খেয়াল করেননি।
এক পর্যায়ে সকালে ছাদে হাঁটতে গিয়ে গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলেন। তিনি ধমক দিলে তারা ভয় পান।
পুলিশ বলছে, গণপতি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে জানিয়ে দিতে পারেন–এই শঙ্কায় তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জবানবন্দিতে বলেছেন গ্রেপ্তার দুই তরুণ।
‘গামছা পেঁচিয়ে’ গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা
সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ জবানবন্দিতে বলেছেন, গণপতি চক্রবর্তীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন তারা। এক পর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, “ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে আসামিদের দেওয়া বর্ণনার মিল রয়েছে। শিক্ষকের মৃতদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
“তারা চিৎকার শুরু করলে দুজনকে আলাদাভাবে গলা চেপে ধরে হত্যা করা হয়। পরে রশি ব্যবহার করেও হত্যার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে জবানবন্দিতে।”
শিশুটি ‘চিনে ফেলেছিল’ সিদ্ধার্থকে
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা বাড়িতে কোনো সিসিটিভি আছে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে নিচতলায় যান। সেখানে একটি প্লায়ার্স পেয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
এরপর তারা আবার ওপরতলায় গিয়ে শিক্ষকের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা দেখতে পান, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে তার নাম ধরে ডাকে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের প্রথম দিকে শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তার ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে।
“আসামিদের আশঙ্কা ছিল, শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে। এ কারণে তাকেও হত্যা করা হয়।”
‘হত্যার পর গোসল, আবার ইয়াবা সেবন’
চারজনকে হত্যার পর আসামিরা বাড়িতেই গোসল করেন বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। এরপর তাদের কাছে থাকা আরও একটি ইয়াবা সেবন করেন।
পরে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়। ঘরের ড্রয়ার ও বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। বিভিন্ন অলংকার নিয়ে একটি ব্যাগে রাখা হয়। এ ছাড়া বাড়িতে পাওয়া ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, মুগ্ধের জবানবন্দিতে সেদিন নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। অন্যদিকে সিদ্ধার্থের বক্তব্যে আটটি ইয়াবা সেবনের কথা রয়েছে।
লুট করা স্বর্ণালংকার মাটিতে পুঁতে রাখার দাবি
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, সব সেরে দুজন বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। মুগ্ধ টাকা নিয়ে চলে যান। আর সিদ্ধার্থ স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে একটি গলিতে যান এবং পরে স্থানীয় একটি বাড়ির পেছনে মাটির নিচে সেগুলো রেখে আসেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, যাদের বাড়ির আশপাশে অলংকার রাখা হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে এসেছে, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
ইয়াবা ব্যবসায়ীকে ধরতে অভিযান
পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের জবানবন্দিতে শান্ত নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহের তথ্য পাওয়া গেছে।
ইয়াবা নেওয়ার সময় মোবাইল ফোন বন্ধক রাখার কথাও বলা হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
আরও পড়ুন:
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা মামলা ডিবিতে
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: ‘সিসিটিভি ক্যামেরার ভয়েই বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ’
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা মামলা ডিবিতে
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: মুগ্ধ-সিদ্ধার্থের গ্রেপ্তার নিয়ে বাবা
রংপুরে শিক্ষক পরিবারে ৪ খুন: আদালতে দুই আসামির 'স্বীকারোক্তি'
গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারকে হত্যার পর খুনিরা 'বাসায় গোসল করে খেজুর খায়'
'ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায়' রংপুরে শিক্ষক পরিবারে চার খুন: পুলিশ
গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের আর কেউ রইল না
'ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায়' রংপুরে শিক্ষক পরিবারে চার খুন: পুলিশ
ফোনে না পেয়ে বাসায় এসে বোনসহ চারজনের লাশ পেলেন পূজা চক্রবর্তী
রংপুরে ৪ খুন: শিক্ষক পরিবারের লাশ পড়েছিল ছাদে-সিঁড়িতে-ঘরে
রংপুরে শিক্ষক পরিবারকে হত্যা: 'এক ভয়াবহ বার্তা'
রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যা: মা-মেয়েকে ধর্ষণের ‘আলামত পাননি’ ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক