রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যা: মা-মেয়েকে ধর্ষণের ‘আলামত পাননি’ ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক
চার খুনের ঘটনার ময়নাতদন্তের ব্যাপারে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের এক ডোমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
তবে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার কোনো আলামত পাননি বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস।
বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “মরদেহ পরীক্ষায় যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ল্যাবরেটরিতে পাঠানো নমুনাতেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।”
গণপতি পরিবারের চারজনের ময়নাতদন্তের ব্যাপারে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের এক ডোমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেখানে ডোমকে দাবি করতে শোনা যায়, দুই মৃত নারীর শরীরে শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং তা সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস সেই দাবি নাকচ করে বলেছেন, “ওখান থেকে যে সোয়াবগুলো আমরা মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠিয়েছিলাম, সেখানে এ ধরনের কোনো আলামতের কথা বলেনি। সুতরাং সেই অর্থে আমরা বলতে পারি, এখানে ধর্ষণের বিষয়টি আমরা বাদ দিতে পারি।”
তাহলে কেন ডোম এ ধরনের কথা বললেন–সেই প্রশ্নে চিকিৎসক বলেন, “ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেওয়ার সময় তার মনে হয়ে থাকতে পারে যে, পরীক্ষায় রেজাল্ট আসতে পারে। হয়ত সে কারণেই সে এমন কথা বলেছে। কিন্তু পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।”
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি আগে রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।
সেই বাড়ির দোতলায় প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেনে গণপতি চক্রবর্তী। তবে নিচতলার কাজ এখনো শেষ হয়নি। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।
শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
লাশের সুরতহাল করার পর পুলিশ চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলেছিল। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, “আমরা যখন মরদেহ পেয়েছি, তখন সেগুলো ফুলে গেছে, পোকায় ধরেছে। স্বাভাবিক ছবিতে যেমন দেখা যায়, আসলে সেগুলো তেমন ছিল না। প্রচুর গন্ধ ছিল। মাথায় ও বুকে তাদের কাউকে কাউকে আঘাত করা হয়েছে। তবে সবার গলায় দাগ রয়েছে। তার মানে, সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, চারটি মরদেহের কারও গায়ে কোনো কাঁটাছেঁড়ার দাগ পাওয়া যায়নি। সব আঘাতের ধরণ হচ্ছে ফোলা।
চারজনের মুখে পোড়া দাগ ছিল বলে সোশাল মিডিয়ায় যে দাবি করা হচ্ছে, তাও ঠিক নয় বলে এই চিকিৎসকের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে সময় যত যেতে থাকে, তখন শরীরের চামড়ার পরিবর্তন আসে। চামড়া তো আর জীবিতের মত থাকে না। এক্ষেত্রে চামড়া কালো হয়ে গেছে। মুখ-শরীর কালো দেখায়। এটা কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে না। স্বাভাবিক কারণেই হয়েছে।”
চারজনকে হত্যার এ ঘটনায় রোববার নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
ওই দিন ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাতেই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।
মঙ্গলবার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। পুলিশ দাবি করেছে, এই তিনজন ঘটনার রাতে একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
মামলাটির তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দেওয়া হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।
আরও পড়ুন:
