Published : 23 Aug 2026, 06:23 PM
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুনের মধ্য দিয়ে হত্যাকারীরা গোটা পরিবারটিকেই শেষ করে দিয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা। তারা বলছেন, এই পরিবারটির আর কেউ বেঁচে নেই।
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন তার মাসী পূজা চক্রবর্তী। তারপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। পূজা চক্রবর্তীই শনিবার রাতে আবার তার বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাদের পরিবারের খোঁজ নিতে আসেন। আর তখনি তিনি জানতে পারেন পরিবারের সবাইকে খুন করা হয়েছে।
রাতে পূজা চক্রবর্তী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “আমার ভগ্নিপতি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেলল। কাউকে বাঁচিয়ে রাখল না। একটা পরিবারকে এভাবে শেষ করে দিল! আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক।”
রাতে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী। তিনি বলছিলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তার শ্বশুরের নাম হেমন্ত চক্রবর্তী। উনার চার ছেলের দুই ছেলে আগেই মারা যান। এক বছর আগে গণপতি চক্রবর্তী অবসরে যান।
তিনি বলছিলেন, তার নিজের দুই মেয়ে। গণপতিরও প্রথমে মেয়ে। পরে প্রীয়ম জন্ম নেয়। গোটা পরিবারে সেই একমাত্র ছেলেসন্তান ছিল।
গোপীনাথ চক্রবর্তীও বয়সের ভারে ন্যূজ্ব। তিনি হৃদরোগের রোগী। খুব একটা চলাফেরা করতে পারেন না। গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।
গণপতি চক্রবর্তী মির্জাপুর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে মির্জাপুর হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। মিঠাপুকুর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন সরকারি কারমাইকেল কলেজ থেকে। পরে তিনি রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন গাইবান্ধাতেও চাকরি করেন।
গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বাবার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চিনাই সিনাই ইউনিয়ন গ্রাম বানেশ্বর নীলকণ্ঠ (বকুলতলা) গ্রামে। প্রীতিলতারা তিন ভাই আর দুই বোন। তারা হলেন- জীবন চক্রবর্তী, গাণিতিক চক্রবর্তী, অভিনাথ চক্রবর্তী, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও পূজা চক্রবর্তী।
স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এসে ডাকাডাকি করেন। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ এসে ফটক বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। পরে একে একে চার লাশের খোঁজ মেলে।
রাতে পূজা চক্রবর্তীর ডাকাডাকি শুনে স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে এটা তো কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এভাবে একটা পরিবারের চারজন হারিয়ে গেছে- এটা ভাবা যায় না।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ি কাজ এখনও শেষ হয়নি। সেই বাড়ির দোতলায় সম্প্রতি পরিবার নিয়ে থাকা শুরু করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়ির নীচতলাটা ফাঁকাই। তারা নতুন এসেছেন বলে এখনও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠেনি।
পরিবার জানায়, গণপতি চক্রবর্তী তার চাকরি জীবনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া করে থেকেছেন। ২০১০ সালের দিকে মাছুয়াপাড়ায় এই জমিটি কিনেছিলেন। তবে নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন ২০২৩ সালের দিকে।
রোববার বিকালে গোপীনাথ চক্রবর্তী ও তার পরিবারের স্বজন-সদস্যরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে চারজনের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মরদেহ হস্তান্তর করলে রংপুরেই চারজনের সৎকার করা হবে।
তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, “আমার ভাইয়ের পরিবারটিকে শেষ করে দিল। কাউকে বাঁচতে দিল না।”
এদিকে দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলেন- মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। রোববার ভোরে তাদের আটক করা হয়।
তিনি দাবি করেন, “মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে হত্যা করা হয় তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে।”
আরও পড়ুন:
'ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায়' রংপুরে শিক্ষক পরিবারে চার খুন: পুলিশ
ফোনে না পেয়ে বাসায় এসে বোনসহ চারজনের লাশ পেলেন পূজা চক্রবর্তী