১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায়’ রংপুরে শিক্ষক পরিবারে চার খুন: পুলিশ

এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

রংপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Aug 2026, 06:56 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।  

রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

এর আগে শনিবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুজনকে আটকের খবর জানায় পুলিশ। তাদের বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকায়। 

সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, “মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে হত্যা করা হয় তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে।”

পুলিশের এ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, “হত্যার পর তারা দুজন গণপতির বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। পরে ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন। এরপর বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে সেগুলো একটি পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখেন।”

মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে আটকের পর তাদের দেখানো স্থান থেকে এসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে পুলিশ।

দোতলা বাড়িটির ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ, সিঁড়ি থেকে তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ এবং শোবার ঘরে খাটের নিচ থেকে ছেলে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার হয়। পরে ভোর ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর বাড়িতেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। আর ছেলে প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পুলিশ বলছে, লাশ উদ্ধারের সময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া আসবাবপত্র ও টাকা-পয়সা এবং স্বর্ণালংকার রাখার স্থানগুলো ভাঙা পাওয়া গেছে। দুই থেকে তিন দিন আগে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা তাদের। 

তদন্ত ভিন্ন দিকে নিতে বাড়ির মালামাল ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে ‘ডাকাতির মতো’ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

একই সঙ্গে আলামত নষ্টের উদ্দেশ্যে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “এ ঘটনায় আরও কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদসহ তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।” 

পুলিশ বলছে, মুগ্ধ দাসের মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন। আর মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কর্মরত ছিলেন।

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, “বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনে স্থানীয় সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

“সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে যান। এ সময় অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন।”

শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে গেলে সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে এ পুলিশ কর্মকর্তার দাবি।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামীকে হত্যায় ‘কয়েক মিনিট’ সময় লাগে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে গামছার পাশাপাশি তার গলা ও বুকে রশি পেঁচিয়ে টানা হয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায়। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনারের দাবি, স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়। পরে মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে স্বর্ণালংকার লুকিয়ে রাখে তারা। সেখান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে পুলিশ।

তিনি বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর সকাল হয়ে যাওয়ায় এলাকায় মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। ফলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় ওই সময় তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।”

“এ ঘটনায় রংপুর নগরীর কোতোয়ালি থানায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীতার বড় ভাই গোপনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন।”

পুরানো সংবাদ:

রংপুরে শিক্ষক-দম্পতি ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় আটক ২

রংপুরে ৪ খুনশিক্ষক পরিবারের লাশ পড়েছিল ছাদে-সিঁড়িতে-ঘরে