১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কুমিল্লা-৪: ধানের শীষ নেই, হতাশ বিএনপিকর্মীরা চড়ছেন ট্রাকে

এই আসনে এখন এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিনের প্রতিযোগিতা হবে বলে ভোটারদের ধারণা।

কুমিল্লা-৪: ধানের শীষ নেই, হতাশ বিএনপিকর্মীরা চড়ছেন ট্রাকে
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ট্রাক প্রতীককে সমর্থন দেন।

কুমিল্লা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Feb 2026, 11:56 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:52 PM

কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা হতাশার মধ্যে পড়েছেন। এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের মাঠে নিজেদের প্রার্থী না থাকায় অনেকটা ক্ষুব্ধ তারা। 

এ অবস্থায় কেন্দ্র থেকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য মৌখিক নির্দেশনা এসেছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। 

কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ এফ এম তারেক মুন্সী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ভোটে জসিম উদ্দিনের ‘ট্রাক প্রতীকের’ পক্ষে কাজ করতে নেতাকর্মীদের বলছেন।

বৃহস্পতিবার সকালে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ট্রাক প্রতীকের পক্ষে কাজ করতে।

এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা ট্রাক প্রতীকে সমর্থনের বিষয়টি এরই মধ্যে স্থানীয় নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন। 

কুমিল্লা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর করা অভিযোগে ‘ঋণ খেলাপির তথ্য গোপনের কারণে’ বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির মনোনয়নপত্র বাতিলের আদেশ দেয় আদালত। ফলে এ আসনে বর্তমানে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই।

নির্বাচনি প্রচারে এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ।

নির্বাচনি প্রচারে এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ।

এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৭ (শাহজাহানপুর-গাবতলী) আসনেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। ওই আসনটি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আসন। সেখান থেকে তিনি বার বার নির্বাচিত হয়েছেন। 

কিন্তু ২০১৮ সালে আদালতের সাজায় কারাগারে যেতে হলে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারেননি। তখন সেখানে প্রার্থী করা হয় গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুর্শেদ মিল্টনকে। কিন্তু মামলা সংক্রান্ত কারণে মুর্শেদ মিল্টনের প্রার্থিতাও বাতিল করে দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আপিল করেও আর সেবার ভোটের মাঠে ফিরতে পারেননি বিএনপি প্রার্থী। 

ফলে ‘দুর্গ’ হিসেবে খ্যাত ওই আসনে বিএনপি প্রার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। তখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্বল্প পরিচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিমকে সমর্থন দেয় বিএনপি। ভোটে রেজাউল করিম আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. মোস্তফা আলম নান্নুকে পরাজিত করে প্রথমবারের মত জাতীয় সংসদ সদস্য হন।   

এবার কুমিল্লা-৪ আসনেও প্রার্থীশূন্য হয়ে গেল বিএনপি। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীরা সেজন্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ‘অবহেলাকে’ও দুষছেন। তারা মনে করেন, এটা দলের জন্য ‘বড় ক্ষতি’।

এদিকে ভোটের দিন এগিয়ে আসায় দেবিদ্বারে অন্য প্রার্থীদের প্রচার বেশ জমে ওঠেছে। বিশেষ করে এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের ও জোটের নেতাকর্মীদের নিয়ে দিনরাত মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। 

ট্রাক প্রতীকে ভোট চাইছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন। 

ট্রাক প্রতীকে ভোট চাইছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন।

ভোটের এমন গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাকর সময়েও বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না তারা। তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। 

শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন এবং দুটি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আশা করেছিলেন, এবার তারা ধানের শীষের প্রার্থীর পেছনে মাঠ মাতাবেন; হারানো ‘দুর্গ’ পুনরুদ্ধার করবেন। কিন্তু তাদের হতাশ হতে হয়েছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতা তারেক মুন্সী বলছিলেন, “আমরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। দেবিদ্বার বিএনপির ঘাঁটি; তারপরও এই বড় দলের প্রার্থিতা না থাকায় আসনটিতে চরম হতাশা বিরাজ করছে। তবে আমরা চেষ্টা করব এই হতাশা থেকে শক্তি নিয়ে দলকে আরো সংঘটিত করার।” 

ঋণখেলাপীর কারণে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া বিএনপি নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।

ঋণখেলাপীর কারণে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া বিএনপি নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।

তিনি বলেন, “তিনি (মঞ্জুরুল মুন্সী) যে ঋণ খেলাপির তথ্য গোপন করায় বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, সে বিষয়টি তিনি আগে থেকেই খেয়াল করলে কিংবা যে আইনজীবীর মাধ্যমে করেছেন তিনি খেয়াল করলেই এই ক্ষতি হত না। অনেকেই এমন খেলাপির বিষয় সুরাহা করে প্রার্থিতা পেয়েছেন।”

উত্তর জেলা কৃষক দলের নেতা, দেবিদ্বারের বাসিন্দা এ এস এম মাসুদ রানা বলেন, “দেবিদ্বার পুরো চুপচাপ। বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশ। কে কী করবে এখনো জানে না। এতদিন মামলা-হামলা সহ্য করে কী লাভ হল?” 

এই আসন থেকে বর্তমানে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ও গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, “এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, দেবিদ্বারে ধানের শীষ প্রতীকে কেউ নির্বাচন করতে পারছে না। আমাদের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। 

ট্রাক প্রতীকে ভোট চাইছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন।

ট্রাক প্রতীকে ভোট চাইছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন।

“আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় বিএনপি যোগ্য মানুষকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী করতে পারেনি। যারা বিগত সময় জেল খেটেছেন, হামলার শিকার হয়েছেন- তাদের কান্না এখন আমাদের শুনতে হচ্ছে।”

কুমিল্লা উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি রেজাউল করিম শাহিন বলেন, “আমরা যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় ধানের শীষ বুকে ধারণ করে জেল খেটেছি। কিন্তু আমরা চার লাখ ভোটার কেন ধানের শীষ পেলাম না কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে জানতে চাই? বিগত ষোলো বছর নির্যাতিত হয়ে কী পেলাম?”

দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব কাজী মাসুদ হাসান বলছিলেন, “আমরা উপজেলা ও পৌর বিএনপি সব ইউনিটের সঙ্গে বসেছিলাম। আমরা নির্দেশনা পেয়েছি এবং জানিয়েছি আমরা ট্রাক মার্কার পক্ষে কাজ করব।” 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের কুমিল্লা জেলা সভাপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, তাদেরকেও কেন্দ্র থেকে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এখানে ট্রাক প্রতীকের পক্ষে কাজ করবেন। 

“আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা এরই মধ্যে কুমিল্লায় আসা শুরু করেছেন। আমরা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সবাই মিলে বসে নির্বাচনি প্রচার ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। আশা করি, বিকাল থেকে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের সবাই মিলে ট্রাকের পক্ষে প্রচার শুরু করতে পারব।”

কুমিল্লামঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ভোটের দুয়ার খুলল না

ঋণ খেলাপিরা আর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সাহস পাবে নাহাসনাত আবদুল্লাহ