Published : 14 Jun 2025, 09:55 AM
প্রায় শত বছর আগে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে গড়ে ওঠে ব্রোঞ্জের গয়না তৈরির পল্লী। চাহিদা বাড়ায় শিল্পটি ছড়িয়ে পড়ে জলিরপাড় ইউনিয়নের ঘরে ঘরে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগায় ধীরে ধীরে বাজার হারাচ্ছে জেলার জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই শিল্প।
চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের চকচকে ও আধুনিক কারুকাজ খচিত গয়না বাংলাদেশের বাজারের দখল করে নিতে শুরু করলেও সংশ্লিষ্টদের আশা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের ফের পুনর্জাগরণ ঘটবে।
আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে পুরানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন ব্রোঞ্জের কারিগররা। এতে কারিগরদের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়তার পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল হবে।

এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ব্রোঞ্জ শিল্পের উন্নয়নে সহযোগিতা করার জন্য আমরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি করতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও বিসিকের মাধ্যমে মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জানা যায়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের জলিরপাড়ের ব্রোঞ্জের তৈরি গয়না বিভিন্ন বয়সের নারীর কাছে সমাদৃত হওয়ায় সারা দেশে ব্যাপ্তি লাভ করে। এক পর্যায়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এটি বিদেশের বাজারও দখল করে নেয়।
বর্তমানে জৌলুস কিছুটা কমলেও ব্রোঞ্জের গয়না তৈরি শিল্পটি সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে জলিরপাড়ের শতাধিক পরিবার।

এ পল্লীকে ঘিরে সরকারের করে দেওয়া ব্রোঞ্জ মার্কেটে এখনো ৪৫টি দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে ব্রোঞ্জের গয়না কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হচ্ছে।
জলিরপাড় ব্রোঞ্জ কারখানার সত্ত্বাধিকারী নীলকন্ঠ মণ্ডল (৫৬) বলেন, ব্রোঞ্জ একটি সংকর ধাতু। তামা, দস্তা ও পিতলের সঙ্গে লোহা বা অন্য ধাতু মিলিয়ে গয়না তৈরি করা হয়। আমাদের কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
পণ্যের দরদাম নিয়ে তিনি বলেন, “নারীদের হাতের গহনা বয়লা প্রতি জোড়া ছোট-বড় প্রকার ভেদে ১৫ টাকা থেকে ১০০ টাকা দরে কারখানা থেকে বিক্রি করি।

এখানে প্রস্তুতকৃত সিটিগোল্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার কানের দুল ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা জোড়া দরে বিক্রি হয়। গলার হার বিক্রি করা হয় ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০০টাকা দরে। রুলি (চুড়ি) প্রতি জোড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে আসছে। পাথরে বাধানো আংটি প্রতিটি ৫০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
এছাড়া তামা লোহা ও দস্তার তৈরি তাবিজ আমরা ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে থাকি।
জলিরপাড় ব্রোঞ্জ মার্কেটের ব্যবসায়ী সজল বালা (৪৫) বলেন, “ইন্ডিয়ান সিটি গোল্ডের অনেক অলংকার আমরা বিক্রি করি। এরমধ্যে কারুকাজ খচিত গহনার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এসব গহনার সেট ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। বিয়ে কিংবা যে কোনো উৎসবে এসব গহনার চাহিদা বেশি থাকে।
এ বিক্রেতা আরও বলেন, সারাদেশের মধ্যে এখানেই হাতের বয়লা, তাবিজ, দুল, রুলি, আংটি, গলার হার তৈরি হয়। এগুলোর দাম ভারত ও চীনের গহনার তুলনায় বেশ কম। তাই সারাদেশে জলিরপাড়ে উৎপাদিত ব্রোঞ্জ গহনার চাহিদা রয়েছে। সারাদেশ থেকে ক্রেতারা এসে এসব গহনা কিনে নিয়ে যান।

ব্রোঞ্জের গয়না প্রস্তুতকারক জলিরপাড় গ্রামের জগদীশ কর্মকার বলেন, “ব্রোঞ্জের গয়না তৈরির তামা, দস্তা ও পিতলের দাম বেড়েছে। সহজপ্রাপ্যতা কমেছে। তার মধ্যে চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের ব্রোঞ্জ গয়নার রং খুব চকচকে। আমাদের গয়নার রং তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।
“দৃষ্টিনন্দন, কারুকাজ খচিত অভিজাত ও শৌখিন গয়নার বাজার ভারত ও চীনের দখলে চলে গেছে। কিন্তু আমাদের এখনো মানসম্পন্ন কারিগর রয়েছেন। আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে তাঁদের কাজে লাগিয়ে আমরাও কারুকাজ খচিত ব্রোঞ্জের গয়না তৈরি করতে পারি।”

তিনি বলেন, “সরকার আমাদের পাশে দাঁড়ালে ব্রোঞ্জ শিল্প ফের ঘুরে দাঁড়াবে। সরকার এ শিল্পকে আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও সব ধরনের সহযোগিতা করলে আমরা শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারব। যা দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করবে।”
জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেল গোপালগঞ্জের ব্রোঞ্জের গয়না
ব্রোঞ্জের গয়না প্রস্তুতকারক আকাশ কীর্ত্তনীয়া বলেন, “আমাদের ব্রোঞ্জের গয়না কেমিকেল দিয়ে পালিশ করলে তামার কালার আসে। স্বর্ণের মতো চকচকে ইমিটেশন কালার হয় না।
“ভারত, চীনের ব্রোঞ্জের গয়নার কালার স্বর্ণের মতো জ্বলজ্বল করে। তাই ভারত, চীনের ব্রোঞ্জের গয়না সব শ্রেণির নারীর কাছে সমাদৃত। আমাদের গয়না প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।”

“তবে শিল্পের কাঁচামাল, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, কালার ও অত্যাধুনিক মেশিনসহ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা ফের এ শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটাতে পারব। এখানে অন্তত ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
জলিড়পাড় ব্রোঞ্জ মার্কেটের ব্যবসায়ী সুভাস বৈদ্য বলেন, “সারাদেশে অন্তত ১০ হাজার মানুষ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। সরকার জলিরপাড়ের ব্রোঞ্জ মার্কেটের উন্নয়ন করেছে। এখন ব্রোঞ্জ শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে হবে। তাহলে এ শিল্পে উৎপাদিত গয়না আবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশের বিভিন্ন দেশের বাজার দখল করতে পারবে।”

এদিকে গোপালগঞ্জ জেলার দ্বিতীয় পণ্য হিসেবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি সনদ পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী জলিরপাড়ের ব্রোঞ্জের গয়না। এর আগে গোপালগঞ্জের রসগোল্লা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছিল।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান জানান, গত বছরের ১২ মার্চ মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড়ের ব্রোঞ্জের গয়নার জিআই পণ্যের স্বীকৃতি চেয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট শিল্প মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে আবেদন করা হয়।
পরে যাচাই-বাছাই করে ওই বছরের ১০ জুলাই জিআই পণ্য হিসেবে ব্রোঞ্জের গয়না নিবন্ধনের জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩–এর ধারা ১২ অনুসারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর কর্তৃক জার্নালে প্রকাশিত হয়।

এর পর গত ৩০ এপ্রিল ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্রোঞ্জ গয়নার জিআই সনদ তুলে দেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী।
এ অর্জনে জেলা প্রশাসন ও মুকসুদপুর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, “গোপালগঞ্জের ব্রান্ডিং পণ্য হিসেবে এ শিল্পে উৎপাদিত গয়না বিপণনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ পণ্যের আউটলেট স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে এ শিল্পকে যুগোপযোগী করা হবে।”