Published : 10 Apr 2026, 01:20 PM
সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কালোজিরা চাষে নতুন আশার আলো দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনুকূল মাটি এবং কম খরচে অধিক লাভের সুযোগ থাকায় দিন দিন অনেকেই এ রবিশষ্য চাষে ঝুঁকছেন।
কালোজিরা কেবল একটি মসলা নয় এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঔষধি গুণসম্পন্ন। এর বীজ থেকে উৎপাদিত তেল চিকিৎসা ও প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কালোজিরা ফুলের মধু বিশ্বের অন্যতম সেরা মধু হিসেবে পরিচিত।
জেলা কৃষি অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যমুনা নদীবিধৌত চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে কালোজিরার চাষ হয়েছে।
এর মধ্যে সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের বোয়ালকান্দি ও বারবয়লাচর, স্থল ইউনিয়নের সন্তোষা, মালীপাড়া ও গোসাইবাড়ি চর, ঘোরজান ইউনিয়নের ফুলহারা, উমারপুর ইউনিয়নের দত্তকান্দি, খাসকাউলিয়া ইউনিয়নের জোতপাড়া এবং বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চল উল্লেখযোগ্য।

চৌহালী উপজেলার সন্তোষা ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুহুরাইয়া বলেন, “কালোজিরার জমি চাষ, বীজ বপণ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, আগাছা দমন, ফসল কাটা ও সংগ্রহ করতে প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকে।
“আর বীজ বপনের সর্বোচ্চ ১৩০ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে কৃষকরা এ ফসল ঘরে তুলতে পারেন। বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকরা ক্রমশ এ ফসল চাষে ঝুঁকছে।”
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কালোজিরা চাষ শুরু হয়। ফসল পরিপক্ব হওয়ার পর মার্চ মাসের শেষে দিকে জমি থেকে তা সংগ্রহ করা বা কেটে নেওয়া হয়।
স্থল ইউনিয়নের মালীপাড়ার কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, “এ বছর এক বিঘা জমিতে কালোজিরা চাল করেছিলাম। এতে ব্যয় হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

“চার মণ কালোজিরা উৎপাদন হয়েছে। প্রতি মণ কালোজিরা বিক্রি করে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।”
একই ইউনিয়নের গোসাইবাড়ি চরের কৃষক নুর আলম বলাছিলেন, “কালোজিরা চাষ একটি লাভজনক ফসল। এ বছর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পাওয়া রাসায়নিক সার ও বীজ দিয়ে কালোজিরা চাষ করেছিলাম। কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে কালোজিরার চাষ করায় ফলন ভাল হয়েছে।”
রবি মৌসুমে চৌহালী উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের ২৯ হেক্টর জমিতে কালোজিরার চাষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “যমুনা চরের মাটি পলিবাহিত হওয়ায় কালোজিরা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর কালোজিরার বাম্পার ফলন হয়েছে।”

কালোজিরা নিয়মিত সেবনে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক কৃষক কালোজিরা ক্ষেতের পাশে মৌ-বক্স স্থাপন করে বাড়তি আয় করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুরে মাওলা বলেন, “কালোজিরা আয়ুর্বেদীয়, ইউনানী, কবিরাজি ও লোকজ চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি ভেষজ উপাদান। মশলা জাতীয় এই ফসল পাঁচ ফোড়নের একটি উপাদান; খাওয়া যায় ভর্তা করেও। এর বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়।
“কালোজিরাতে ফসফেট, লৌহ ও ফসফরাস জাতীয় উপাদানসহ প্রায় শতাধিক পুষ্টি ও উপকারী উপাদান রয়েছে। এছাড়াও এতে রয়েছে ক্যানসার প্রতিরোধক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান এবং এটি অম্লরোগ বা গ্যাস্ট্রিকের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।"

তিনি বলেন, “কালোজিরা ফুলের মধু উৎকৃষ্ট মধু হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে কালোজিরার ফুল ফোটে, তখন মৌমাছিরা এর নেক্টার সংগ্রহ করে। এই মধুতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে।
“কালোজিরার তেল শরীরের জন্য অনেক উপকারী। বর্তমানে কালিজিরা ক্যাপসুলও বাজারে পাওয়া যায়।”
যমুনা নদীবেষ্টিত সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী এবং শাহজাদপুর উপজেলার চরাঞ্চলে কালোজিরা চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা মনজুরে মাওলা।
তিনি বলেন, সরকারি কৃষি প্রনোদনা পেলে এসব অঞ্চলে কালোজিরার চাষ আরো ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।