করতোয়ায় নৌকা ডুবি: ‘২৫ জনকে’ নিখোঁজ রেখে দ্বিতীয় দিনের অভিযান স্থগিত

সোমবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

মোঃ শাকিল আহমেদঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 Sept 2022, 03:29 PM
Updated : 26 Sept 2022, 03:29 PM

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে তীর্থযাত্রীদের নৌকা ডুবির ঘটনায় দ্বিতীয় দিনে আরও ২৬ জনের লাশ উদ্ধারের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৫১ জনে।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দীপঙ্কর রায় সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নৌকা ডুবির ঘটনায় রোববার ২৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর প্রথম দিনের অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়।  

“সোমবার ভোর থেকে আবার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও পুলিশ। দ্বিতীয় দিন আরও ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে মোট ৫১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে দিনাজপুরের আত্রাই নদী থেকে।”

এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান দীপঙ্কর আরও জানান,“সোমবার সন্ধ্যা নামার পর দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা করতোয়া নদীর পাড়েই থাকবেন। মঙ্গলবার ভোর থেকে আবার অভিযান শুরু হবে।”

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হতাহতদের তথ্য জানানোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সেখানে নিহতদের নামের পাশাপাশি নিখোঁজের নামও স্বজনদের কাছ থেকে রাখা হচ্ছে।

নিখোঁজের ব্যাপারে জানতে চাইলে দীপঙ্কর বলেন, “এখানে মানুষ এসে তাদের নিখোঁজ স্বজনদের নাম তালিকাবদ্ধ করছেন। সেই তালিকায় ৪৫-৪৬ জনের নাম আছে। তবে, আমরা দেখতে পারছি একজনের নাম একাধিকবারও আছে।”

“ফলে ধারণা করছি, নিখোঁজের সংখ্যাটি ২৫ থেকে ২৭ জনের মতো হতে পারে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন নিহত ৫০ জনের একটি নামের তালিকা সাংবাদিকদের কাছে দেন। এর মধ্যে নারী ২৫ জন, শিশু ১৩ জন ও পুরুষ ১২ জন। নিহতদের মধ্যে বোদা উপজেলার ২৯ জন, দেবীগঞ্জের ১৮ জন, আটোয়ারীর একজন, সদরের একজন এবং ঠাকুরগাঁও সদরের একজন।

এরপর আরও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। সবার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে প্রশাসন এরই মধ্যে সব মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে বলেও জানান তদন্ত কমিটি প্রধান।

রোববার মহালয়া উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বোদা উপজেলার বরদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন উৎসবে যোগ দিতে। দুপুরের দিকে মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় একটি নৌকা উল্টে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল। কিছু মানুষ সাঁতরে নদীর তীরে ফিরতে পারলেও অনেকে নিখোঁজ থাকেন। নৌকাডুবির পরপরই স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা নামেন তল্লাশিতে।

পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক শেখ মাহবুব ইসলাম জানান, রোববার ২৫ জনের লাশ উদ্ধারের পর রাতে নদীতে তল্লাশি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল, সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় নতুন করে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। রাজশাহী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দলও এখন অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।

সকালে করতোয়া এবং পাশের দিনাজপুরের আত্রাই নদীর বিভিন্ন স্থানে মরদেহ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়। পরে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা। 

সোমবার সারাদিনই শত শত মানুষ করতোয়া নদীর পাড়ে প্রিয়জনের লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের আহাজারিতে সেখানে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরেও লাশ না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বোদা থানার ওসি সুজয় কুমার রায় দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ধারণা করা হচ্ছে, স্রোতের টানে হয়তো অনেক লাশ আশপাশের নদীতে ভেসে গেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে। বোদা উপজেলার পাশেই দেবীগঞ্জ উপজেলা; তার পরেই দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা। আজ সেখান থেকে সাতটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।”

পুলিশ নিখোঁজদের উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলেও জানান ওসি। 

হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আসা করতোয়া নদী উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় এমনিতে খুব খরস্রোতা নয়; গভীরতাও খুব বেশি নয়। কিন্তু গত দুদিনের টানা বর্ষণের পর উজানের ঢলে নদীতে পানি বেড়েছে অনেকটা।

এর মধ্যে দুর্ঘটনায় পড়া নৌকায় ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠায় এবং মাঝ নদীতে নৌকাডুবির কারণে মৃত্যু এত বেশি হয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।

এ ছাড়া এই নদী থেকে অবাধে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হয়। ফলে নদীর স্থানে স্থানে বেশ বড় ধরনের গর্ত রয়েছে। সেখানে লাশ পড়ে বালুর নিচে আটকে যেতে পারেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।  

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নৌকাটি যখন ঘাট থেকে ছেড়ে যায় তখনও সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোকজন উপস্থিত ছিল। কিন্তু নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী উঠলেও তারা তাতে কোনো বাধা দেননি।

আরও পড়ুন:

করতোয়ায় নৌকা ডুবিতে নিহতদের নাম-পরিচয়
উৎসবের মুহূর্ত শোকে স্তব্ধ
করতোয়ার পাড়ে স্বজনদের আহাজারি, বাড়ি বাড়ি মাতম
‘অতিরিক্ত যাত্রীতে’ করতোয়ায় নৌকা ডুবি, ইঙ্গিত তদন্ত কমিটির
পঞ্চগড়ের নৌকা ডুবি তদন্তে কমিটি, খোলা হয়েছে তথ্যকেন্দ্র
পঞ্চগড়ে তীর্থযাত্রার নৌকা ডুবে মৃত্যু বেড়ে ৪৭
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক