Published : 07 Oct 2025, 10:22 AM
তিন বছর পর পর্যটক আর স্থানীয় দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে ‘কেওক্রাডং’।
নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘ তিন বছর বন্ধ ছিল বান্দরবারে রুমা উপজেলার ‘কেওক্রাডং’ পাহাড়চূড়া। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে এ পাহাড়ে পর্যটকদের যাতায়াত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন।
এর পর থেকে কেবল বগালেক পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি ছিল। সম্প্রতি দুর্গা পূজা ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব ঘিরে টানা চার দিনের সরকারি ছুটি পান চাকরিজীবীরা। ছুটির এ মৌসুম ঘিরে পর্যটন ব্যবসায়ী এবং দর্শনার্থীদের পক্ষ থেকে ‘কেওক্রাডং’ খুলে দেওয়ার দাবি ছিল।
অবশেষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ১ অক্টোবর থেকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ‘কেওক্রাডং’ পাহাড়। প্রথম দিনই ৮০০ জনের বেশি পর্যটক সেখানে বেড়াতে যান বলে জানিয়েছেন রুমা উপজেলার পর্যটক গাইডরা।

‘কেওক্রাডং’ পাহাড়ের অবস্থান রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নে পড়েছে। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব ৭৬ কিলোমিটার এবং রুমা উপজেলার সদর থেকে ২৮ কিলোমিটার। ‘কেওক্রাডং’ পাহাড়ের উচ্চতা নিয়ে একেক জায়গায় একেক রকম তথ্য পাওয়া যায়।
তবে জাতীয় তথ্য বাতায়নে জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যে ‘কেওক্রাডং’ চূড়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার ৩৩০ ফুট বলা হয়েছে। সে হিসাবে এটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া। শীর্ষে আছে থানচি উপজেলার ‘তাজিংডং’ চূড়া।
২ অক্টোবর ‘কেওক্রাডং’ এলাকায় যাওয়ার সময় দেখা যায়, পূজা উপলক্ষে ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকে পথে পথে রয়েছে পাহাড় চূড়ায় বেড়াতে যাওয়া পর্যটকের দল। এক জায়গায় কেউ লাইন ধরে পর্যটক নিবন্ধন ফরম পূরণ করছেন। কেউ গাইড ঠিক করছেন।
বেশিরভাগ ছিল বাইকারের দল। কোনো দলে ১০ জন, কোনো দলে ২০ জন করে। এমনকি ৫০-৬০ জনের বাইকারের দলও বেড়াতে এসেছেন। পরিবারসহ আসা পর্যটক ও অন্যরা খোলা জিপ, ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িতে করে ‘কেওক্রাডং’ এ চলে যাচ্ছেন।
রুমা থেকে ‘কেওক্রাডং’ যাওয়ার পথে দুপাশে পাহাড়গুলো মনোমুগ্ধকর। চারপাশে দৃশ্যগুলো চিরসবুজ। একটু পর পর দেখা যায়, সোনালি রঙের পাকা ধানের জুম ক্ষেত। আর বম সম্প্রদায়ের পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পাড়াগ্রামগুলো।

‘কেওক্রাডং’ চূড়ায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে যেন ভূস্বর্গ। অপরূপ প্রকৃতি। চূড়ার পাশে অন্য পাহাড়গুলে যেন মনে হয় একেকটা সবুজঘেরা খেলার মাঠ। কোনো কোনো পাহাড়কে দূর থেকে ছোট পাহাড়ের মত মনে হয়। দূরে দেখা যায় বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের সীমানায় ঢেউ খেলানো পাহাড়সারি।
আরেকপাশে ঘন মেঘের মিতালি। চূড়ায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না। মুর্হুমুর্হু বাতাস গা ভিজিয়ে দেয়। কাঁপুনি ধরে ঠান্ডায়। তবু উচ্ছ্বসিত পর্যটকদের কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়ার সুন্দর মুহূর্তকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
উচ্ছ্বসিত পর্যটকরা
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা রাফিদ খান নামের এক পর্যটক বলেন, ‘কেওক্রাডং’ চূড়ায় তিনি এ পর্যন্ত তিনবার বেড়াতে এসেছেন। প্রথমবার ২০১৮ সাল এবং দ্বিতীয়বার ২০২২ সালে। প্রতিবারই এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য একইরকম ভাল লাগে। চারপাশের পরিবেশ সুন্দর। অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে। তবে ২০১৮ সালে প্রথমবার আসার সময় ট্র্যাকিং করে উঠতে হয়েছিল। এগুলো তার জীবনে বিশেষ মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী তৌসিফ খান মজলিশ জানান, তিনি প্রথমবার পাহাড়ে বেড়াতে এসেছেন। তাও বান্দরবানে ‘কেওক্রাডং’ এর মত দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ একটা চূড়ায়। এরকম পাহাড় ও মেঘ এভাবে কখনও সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। অন্যরকম একটা ভাল লাগার অনুভূতি কাজ করে। যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
নাসরিন খান মজলিশ নামে আরেক পর্যটক বলেন, “২০২০ সালে বন্ধুদের সঙ্গে ‘কেওক্রাডং’ প্রথমবার আসা। এবার পরিবারকে নিয়ে এসেছি। বেশ ভাললাগার মত জায়গা। একেবারে ‘কেওক্রাডং’ চূড়া পর্যন্ত গাড়িতে করে আসতে পারায় ভ্রমণ আরামদায়ক হয়েছে।
“তবে এখানে থাকার সুযোগ হবে না। থাকার ব্যবস্থা নেই। শহরে গিয়ে থাকব। পরিবেশ ভাল লেগেছে। আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। আশা করি, আরও উন্নতি হবে। তবে প্রথমবার ট্র্যাকিং করে আসাটা ভোলার মত নয়।”

নাসরিন খান মজলিশ আরও বলেন, “যদিও ‘কেওক্রাডং’ একেবারেই প্রাকৃতিক এলাকা। এখানে কিছু রিসোর্ট বাড়ানো যেতে পারে। মানুষ এসে থাকতে পারবে। যেহেতু চাহিদা আছে থাকা-খাওয়ার সুবিধাও কিছু বাড়ানো দরকার। বগালেকেও রিসোর্ট সংখ্যা বাড়ানো হোক। সেখানে পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভাল করলে পর্যটকদের আরও সুবিধা হবে। আরও বেড়াতে আসবে। তবে পর্যটন মৌসুমে আসলে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। ঠিকমত গাড়ি পাওয়া যায় না।”
আগে থেকে ‘কেওক্রাডং’ পর্বত চূড়া পর্যটক এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে ভ্রমণ ও অভিযানপ্রিয় পর্যটকদের। সেই সময় বগালেক থেকে ‘কেওক্রাডং’ চূড়া পর্যন্ত হেঁটে যেতেন তারা। হাঁটার পথে একদিকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অন্যদিকে অভিযানপ্রিয় ভ্রমণকারীদের শারীরিক সক্ষমতা তৈরি করে। তখন হেঁটে যেতে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
তবে ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকদের ট্র্যাকিং করে যাওয়ার সেই সুযোগ আর নেই। এখন ‘কেওক্রাডং’ চূড়া পর্যন্ত অনায়াসে গাড়িতে করে যাওয়া যায়। খুব সকালে যেতে পারলে বান্দরবান শহর থেকে দিনে গিয়ে দিনে আসা যায়। যাদের পক্ষে সকাল সকাল যাওয়া সম্ভব না তারা ‘কেওক্রাডং’ থেকে ফিরে বগালেক পাড়ায় রাতযাপন করতে পারবেন।
পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
‘কেওক্রাডং’ বেড়াতে আসা পর্যটকদের কেউ কেউ পর্বতের চূড়ায় ভবন নির্মাণে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তারা বলছেন, ‘কেওক্রাডং’ এর মত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গায় ইট-কংক্রিট একেবারে বেমানান। এরকম অপার সৌন্দর্যের আধার দেশের আরও কোথাও পাওয়া যাবে না। এটা খুব সংবেদনশীল জায়গা হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখা দরকার।
এ বিষয়ে সৈয়দ রিজবান ও আব্দুল্লাহ আজিজ নামে দুই পর্যটক বলেন, ‘কেওক্রাডং’ পাহাড় চূড়ায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয়। এটা পাহাড়ে সৌন্দর্যকে নষ্ট করে। এরই মধ্যে একটা চারতলা ভবন নির্মাণ করে ফেলা হয়েছে। এটা প্রকৃতিপ্রেমীদের আহত করেছে। কেউ চায় না, এটা নগর হোক। মানুষ নগর ছেড়ে পাহাড় দেখতে আসে। পাহাড়ে যে প্রাকৃতিক পরিবেশ সেটার সঙ্গে এ ধরনের অবকাঠামো একেবারেই বেমানান।

তারা আরও বলেন, পাহাড়কে পাহাড়ের মত রাখতে হবে। ‘কেওক্রাডং’ পাহাড় হল খুব সংবেনশীল জায়গা। এখানকার একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ আছে সেটা বজায় থাকুক। দূর থেকে যারা বেড়াতে আসবেন তারা একদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবে, অন্যদিকে এখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতাকেও জানবে। তাহলে ভ্রমণের সার্থকতা আসবে।
এ বিষয়ে জানতে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আদনান চৌধুরীর মোবাইলে একাধিক ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
ট্যুরিস্ট পুলিশের বান্দরবান জোনের পরিদর্শক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ১ অক্টোবর থেকে ‘কেওক্রাডং’ পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অসংখ্য পর্যটক আগমন ঘটছে। তবে একটা বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়েছে, সেখানে অসংখ্য বাইকার যাচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টা বিবেচনায় রাখেন।
“বিশেষ করে তারা যেন দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল না চালান এবং প্রত্যেকের যেন হেলমেট থাকে। নিয়মনীতি মেনেই যেন পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করেন। তাছাড়া সরকারি অনুমোদিত এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও যেন না যায়। এর বাইরে শহরকেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো ট্যুরিস্ট পুলিশের দুটি টিম মোতায়েন করা আছে।”
‘কেওক্রাডং’ ভ্রমণের যত নিয়ম
রুমা উপজেলার পর্যটক গাইড কল্যাণ সমিতির ব্যবস্থাপক লাল রও কোয়াল বমের দেওয়া তথ্য মতে, সদর উপজেলা পৌঁছার আগে গ্যারিসন এলাকার সেনা চেক পোস্টে সব পর্যটককে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হয়। বিশেষ করে ফরমে পর্যটকের নাম, ঠিকানা, বয়স, পেশা এবং মোবাইল নম্বর উল্লেখ করতে হবে। ফরম পূরণ করা হলে পাঁচ কপির মত ফটোকপি করতে হবে। ফরম জমা দেওয়ার সময় জনপ্রতি পর্যটকদের ৫০ টাকা করে জমা দিতে হয়।

এরপর রুমা বাজারে এসে পর্যটক গাইড সমিতি থেকে একজন করে গাইড নিতে হবে। গাইড নেওয়ার পর সিরিয়াল অনুযায়ী গাড়ি ঠিক করবেন তিনি। পর্যটকদের ভ্রমণ সংক্রান্ত পূরণ করা ফরম রুমা থানায়, গাইড সমিতি, বগালেক ও কেওক্রাডং সেনা ক্যাম্পে এক কপি করে জমা দিতে হবে।
প্রশাসনের নিয়ম রয়েছে, ছয়জন বাইকারের বিপরীতে একজন গাইড এবং ১৪ জন সাধারণ পর্যটককে বিপরীতে একজন করে গাইড নিতে হবে। রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত একজন গাইডকে দৈনিক ৭০০ টাকা এবং ‘কেওক্রাডং’ পর্যন্ত হলে এক হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক দিতে হয়। গাইডের থাকা-খাওয়ার খরচ পর্যটকদের পক্ষ থেকে বহন করতে হয়।
গাড়ি ভাড়া কত
উপজেলা জিপ মালিক সমবায় সমিতি ভ্রমণের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করেছে। খোলা জিপ (চাঁন্দের গাড়ি), বি-৭০, ফাইভ ডোর (ছোট জিপ) এবং মোটরসাইকেল করে যাওয়া যায়। তবে যাওয়ার পথে রাস্তা উঁচু-নিচু ও কোথাও খাড়া পাহাড় হওয়ায় ভাল গাড়ি ও অভিজ্ঞ চালক নিয়ে যাওয়া দরকার। রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত একবার যাওয়ার ভাড়া দুই হাজার ৭০০ টাকা আর আসা-যাওয়া তিন হাজার ৭০০ টাকা।
রুমা থেকে ‘কেওক্রাডং’ একবার যাওয়ার ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা আর আসা-যাওয়া সাত হাজার টাকা। মোটরসাইকেল হলে রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত আসা-যাওয়া এক হাজার টাকা এবং ‘কেওক্রাডং’ পর্যন্ত হলে আসা-যাওয়া দুই হাজার টাকা।