Published : 13 May 2025, 04:53 PM
তীব্র গরমে একটানা কাজ করতে পারছেন না যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিকরা। ফলে বন্দরে ট্রাকে পণ্য লোড-আনলোডে দেখা দিয়েছে ধীর গতি, দুর্ভোগের পাশাপাশি আয় কমে গেছে শ্রমিকদের।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আগে ২০ জন শ্রমিক তিন ঘণ্টায় একটি ট্রাকের পণ্য আনলোড করতেন, এখন সময় লাগছে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। গরমে অসুস্থও হয়ে পড়ছেন অনেকে।
যশোর মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটির আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, গত চার-পাঁচ দিন ধরে যশোরে গরমের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। টানা তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
মঙ্গলবার বেলা ২টা ৩০ মিনিটে জেলায় তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগে সোমবার ছিল ৩৯ দশমিক ২, রোববার তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবারও একই তাপমাত্রা ছিল। শুক্রবার ছিল ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি।
ফলে জেলায় তীব্র তাপদহ চলছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

বেনাপোল বন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক সর্দার আজগার আলি বলেন, “সপ্তাহখানেক ধরে প্রচণ্ড গরম। এই গরমে ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি একটানা কাজ করা যাচ্ছে না। গরমে দুপুরে কোনো কাজ করাই সম্ভব হচ্ছে না।”
শ্রমিকরা বলছেন, একদিকে বন্দরে কাজ কম। তারপরে প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না তারা। এই দুর্ভোগের প্রভাব পড়েছে তাদের আয়েও।
সুমন হোসেন নামের এক শ্রমিক বলেন, “অন্যান্য সময় সারাদিন কাজ করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করতাম। এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। একটানা কাজ করতে না পারায় আয় কমেছে।”
এই বন্দরের পণ্য বোঝাই করতে আসা একজন ট্রাক চালক অলিয়ার রহমান বলেন, “শ্রমিকরা একটানা আগের মত কাজ করতে না পারায় সময় মত ট্রাক লোড হচ্ছে না। তাই আমাদেরও সময় অপচয় হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্দরে বসে থাকতে হচ্ছে।”
বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানিকারক শহীদ লাল বলেন, “এখন ভারতীয় ট্রাক থেকে পণ্য খালাস করতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। ট্রাকে পণ্য লোড করতেও তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। এতে সময় মত পণ্য সরবরাহ করা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।”

বেনাপোল বন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশের (রেজিস্ট্রেশন নম্বর-৯২৫) লেবার সর্দার মুনছুর আলি বলেন, “গত বছরের চেয়ে এবার বেশি গরম পড়েছে। এতে পণ্য উঠানামায় (লোড-আনলোড) দেরি হচ্ছে, ব্যবসায়ীরাও বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু করার কিছু নেই।"
আরেক লেবার সর্দার আকতার হোসেন বলেন, “বেলা ১১টার পর থেকে মনে হচ্ছে আগুনের হল্কা এসে শরীরকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে। এই গরম উপেক্ষা করেও শ্রমিকরা কাজ করছেন। তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের আয়ও কমে গেছে।”
রাজু আহম্মেদ বলেন, “এক ট্রাক লোড দেওয়ার পর বিশ্রাম নিয়ে আবার আরেক ট্রাক লোড দিচ্ছেন। আগে প্রতিদিন যেখানে ২০ ট্রাক লোড হত। বর্তমানে গরমের কারণে শ্রমিকেরা ৮ থেকে ১০ ট্রাক লোড দিতে পারছেন।”
এদিকে বেনাপোল বন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়নের আরেক অংশের (রেজিস্ট্রেশন নম্বর-৮৯১) সভাপতি মাকসুদুর রহমান রিন্টু বলছেন, “বেশ কিছুদিন বৃষ্টির দেখা নেই, তাই প্রচণ্ড তাপদাহে হ্যান্ডেলিং শ্রমিকরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারছেন না। শ্রমিকরা যাতে অসুস্থ হয়ে না পড়ে এজন্য ইউনিয়ন থেকে খাবার পানি এবং স্যালাইন সরবরাহ করা আছে।”

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজি বলেন, “প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন বাড়ছে যশোরের তাপমাত্রা। এতে বিপাকে পড়েছেন বন্দর শ্রমিকরা। খেটে খাওয়া এই মানুষগুলো বেলা ১১টার পর থেকে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছে না।
“দুপুর থেকে আগুনের হলকা ছাড়ছে প্রকৃতি। এই অবস্থার মধ্যে হ্যান্ডেলিং শ্রমিকরা ট্রাকে পণ্য লোড-আনলোডে হিমশিম খাচ্ছে। পণ্য সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবির তরফদার বলেন, "প্রচণ্ড গরমে শ্রমিকরা বন্দরে অনেক কষ্ট করে কাজ করছে। তাদের কথা চিন্তা করে বন্দরের ভিতরে আলাদা বিশ্রাম নেয়ার ঘর করা আছে। আছে খাবার পানির ব্যবস্থা। শ্রমিকরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেখানে বিশ্রাম নিয়ে থাকে।"

এর মধ্যে বন্দরে পণ্যজট কমাতে দ্রুত পণ্য খালাসের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন আমদানি পণ্য নিয়ে ভারত থেকে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০টি ট্রাক বেনাপোলে আসে। এর মধ্যে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাক পণ্য খালাস করে ভারতে ফেরত যায়।
“আর প্রতিদিন গড়ে বাংলাদেশ থেকে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য নিয়ে ভারতে যায়। গরমের কারণে ট্রাক যাতায়াতের সংখ্যা কমে গেছে।”