Published : 19 Oct 2025, 10:28 PM
শ্যামা পূজা ও ‘বুড়ির মেলা’ ঘিরে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর সীমান্ত বসেছিল দুই বাংলার মিলনমেলা। ২০০৮ সালের পর সীমান্তে এমন আয়োজনে দুই বাংলা মানুষের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস।
রোববার সকাল থেকেই ধরলা নদীর পাড়ের ৯২৭ নম্বর সীমান্ত পিলার ঘেঁষে হাজারো মানুষের ঢল নামে। এ দিন সীমান্তের বেড়া অতিক্রম করে ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ অবাধে মিলিত হয়েছেন একে অপরের সঙ্গে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী জড়ো হয়েছিলেন সীমান্তের মন্দির প্রাঙ্গণে। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া দুই দেশের মানুষ যোগ দেন ‘বুড়ির মেলা’ মেলায়। মেলা এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।
এর মধ্যে আবেগঘন দৃশ্য ছিল দুই বোনের পুনর্মিলন। প্রায় ২৪ বছর পর আদিতমারীর দেওডোবা গ্রামের শুসিলা রানী (৫৮) আর ভারতের কোচবিহারের নিয়তি রানীর (৫৬) দেখা হয়। একে অপরকে আলিঙ্গন করে তারা কেঁদে ফেলেন। দুই বোনের অঝোর অশ্রুতে ভিজে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।

শুসিলা রানী বোনের জন্য নিয়ে যান ইলিশ মাছ, মিষ্টি ও টাঙ্গাইলের শাড়ি। আর নিয়তি রানী এনেছিলেন জামদানি শাড়ি, মশলা ও মিষ্টি। উপহার বিনিময়ের সময়ও চোখের জল থামেনি তাদের।
স্থানীয় ভক্ত আসলাম (৪৩) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মেলায় দেখলাম দুই বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। পুরো মেলা মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল।”
মেলার বিশেষত্ব ছিল পুরোহিত বাংলাদেশ থেকে, আর পূজারি ভারতের। বাংলাদেশি পুরোহিত বিকাশ চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, “প্রতি বছর হাজারো ভক্ত আসেন। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা হয়। দুই দেশের মানুষ মিলেই এই মন্দির চালায়।”
ভারতের পূজারি জ্যোতিষ চন্দ্র রায় বলেন, “পুরোহিত বাংলাদেশে, পূজারি ভারতের, এটাই সম্প্রীতির প্রতীক।”

মন্দির প্রাঙ্গণে বসেছে, খাবার, খেলনা, শাড়ি ও গয়নার দোকান। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে পূজা, প্রসাদ বিতরণ ও মিলনমেলা। ভক্তদের ভিড় সামলাতে বিজিবি ও বিএসএফকে টহল দিতে দেখা গেছে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এই মেলা ঘিরে শুধু লালমনিরহাট নয়, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসেছিলেন। শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, মুসলিম ও খ্রিস্টানরাও অংশ নেন এই উৎসবে।
ভারতের ভেটাগুড়ি থেকে আসা ধীরেন্দ্র নাথ বর্মণ বলেন, “অনেক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আলিঙ্গন আর কান্নাই বলে দেয়, সীমান্তে কাঁটাতার থাকলেও মানুষের হৃদয়ে কোনো সীমারেখা নেই।”
স্বাধীনতার আগে থেকে দুই দেশের সীমান্তে এ মেলা বসত। মাঝখানে দীর্ঘ বিরতির পর আবার উন্মুক্ত হওয়ায় দুই দেশের মানুষের জন্য রূপ নিয়েছে মিলন ও সম্প্রীতির উৎসবে।