১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সিরাজগঞ্জে গরু চুরি ঠেকাতে ‘বাঁশকল পদ্ধতি’, রাতে পাহারায় পুলিশ-গ্রামবাসী

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে এবার জেলায় ছয় লাখের বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে; যার বাজার মূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।

ইসরাইল হোসেন বাবু

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 May 2026, 05:11 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:39 PM

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলার খামারি ও কৃষকরা গরুর পাশাপাশি অন্যান্য গবাদিপশু লালন-পালন করে থাকেন। তবে এবার ঈদের আগে বেড়েছে গরু চুরি ও ডাকাতির আতঙ্ক। এর মধ্যে অনেক বাড়িতে চুরির ঘটনাও ঘটেছে। 

গরু চুরি ঠেকাতে রাতে জেগে এলাকা এলাকায় পাহারা বসিয়েছেন গ্রামবাসী। এ কাজে এগিয়ে এসেছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও। এ ছাড়া রাতে সন্দেহজনক যানবাহন চলাচলে গ্রামের প্রবেশমুখ বা সংযোগস্থলে এবং ছোট-বড় বাজারে বাঁশকল বসিয়ে ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, গরু চুরি রোধে জেলার প্রতিটি উপজেলার গ্রামগঞ্জে পুলিশি পাহারা ও টহল জোরদার করা হয়েছে। রাতে যারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন তাদের সহায়তা করছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ঈদ উপলক্ষে এবার জেলায় ছয় লাখের বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে; যার বাজার মূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।

খামারি ও কৃষকরা জানান, জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখান থেকে বিপুল গবাদিপশু ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ঈদ আসার আগেই এসব গবাদিপশু চুরি করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোর ও ডাকাত চক্র। সম্প্রতি জেলা সদর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, শাহজাদপুর, কামারখন্দ ও উল্লাপাড়া উপজেলায় বেশ কিছু গরু চুরির খবর পাওয়া গেছে।

সবশেষ মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া এলাকার কৃষক হাসান শেখের গোয়ালঘর থেকে ছয়টি গরু চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কৃষক সদর থানায় মামলা করেছেন।

অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় ওসি রাকিবুল হাসান বলেন, চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারে অভিযান চলছে। 

ঈদকে সামনে রেখে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরু প্রস্তুত হয় দুগ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুর উপজেলায়। এ উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ছোট-বড় গো-খামার। এসব গরু ঈদের আগেই বিক্রি হয়ে থাকে।

উপজেলার গাড়দহ ইউনিয়নের টেকুয়াপাড়া গ্রামের মিলন সংঘ ক্লাবের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, সম্প্রতি দুটি বাড়িতে চেতনাশক স্প্রে ব্যবহার করে দুটি গরু ও প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে। 

“এর মধ্যে গ্রামের অন্তত ১৫টি বাড়িতে ‘রঘু ডাকাতের’ নামে রক্তমাখা চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে খামারিদের রাতে গো-খামারের দরজায় তালা না দিয়ে খোলা রাখতে বলা হয়েছে, অন্যথায় হত্যার হুমকি দিয়েছে ডাকাতরা”, বলেন তিনি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, এ অবস্থায় গ্রামবাসী রাত জেগে পাহারা বসিয়েছেন। খবর পেয়ে পুলিশ সুপার এলাকা পরিদর্শন করে লাঠি-বাঁশি ও টর্চলাইট দিয়েছেন। চোর চক্র রাতে যাতে গবাদিপশু চুরি করতে যানবাহন নিয়ে অবাধে গ্রামে প্রবেশ ও বের হতে না পারে সেজন্য প্রবেশ মুখে ‘বাঁশকল’ বসানো হয়েছে। সেইসঙ্গে পুলিশও রাতে টহল জোরদার করেছে।

কামারখন্দ থানার ওসি হাসমত আলী বলেন, এই উপজেলাটি অপরাধ প্রবণ হিসেবে পরিচিত। এই উপজেলার ওপর দিয়ে মহাসড়ক চলে যাওয়ায় ঈদের আগে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে থাকে।

“এসব অপরাধ ঠেকাতে গ্রামের প্রবেশপথ ও ছোট-বড় বাজারগুলোর রাস্তায় বাঁশকল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। রাতে গ্রাম পাহারায় স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি আনসার সদস্যরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আমরাও সড়কে টহল জোরদার করেছি”, বলেন তিনি।

গবাদিপশু রক্ষায় পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তাড়াশ থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গবাদিপশু। চুরি ঠেকাতে নৈশকালীন টহল ও চেকপোস্ট বসানোর পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার পাহারাদারদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সমন্বয় করা হচ্ছে।

“গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, গ্রামীণ রাস্তা এবং উপজেলার সীমানা এলাকাগুলোতে পুলিশের রাত্রিকালীন মোবাইল টিম ও মোটরসাইকেল টহল জোরদার করা হয়েছে। গভীর রাতে সন্দেহভাজন ট্রাক, নসিমন, করিমন বা পিকআপ তল্লাশিতে চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।”

এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে দায়িত্বরত বিট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সাধারণ কৃষক ও খামারিদের সচেতন করার কথা বলেছেন ওসি হাবিবুর।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, চলতি বছরে এ জেলায় গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ও দুম্বা মিলে ছয় লাখ ১৭ হাজার গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন খামারি ও কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে ২৭টি স্থায়ী ও ২০টি অস্থায়ী গবাদি পশুর হাট রয়েছে। 

তিনি বলেন, জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে দুই লাখ ৯৩ হাজার। বাকি গবাদি পশু ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে জেলার হাটগুলো গবাদিপশু কেনাকাটায় জমে উঠেছে। দাম ভাল থাকলে এবার জেলায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার গবাদিপশু বিক্রি হবে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে এই খাত অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে।

পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, গবাদিপশুর হাটগুলোতে নিরাপত্তায় সাদা পোশাকের পাশাপাশি হাটের পাশে পেট্রোল পুলিশ রাখা হয়েছে। জেলার বাইরে বিক্রির জন্য গবাদিপশু নেওয়ার সময় যানবাহনগুলো সড়ক-মহাসড়কে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, জেলার শাহজাদপুর উপজেলা থেকে সবচেয়ে বেশি কোরবানির গরু নৌ-পথে ঢাকায় নেওয়া হয়। এজন্য যমুনা নদীর নৌ-পথ নিরাপদ রাখতে নৌ-পুলিশের সঙ্গে সভা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।