Published : 08 Feb 2026, 10:11 AM
‘হাতি বাঁচলে, বাঁচবে গারো পাহাড়’- এমন প্রতিপাদ্য নিয়ে বন্যহাতি সুরক্ষায় শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় মতবিনিময় সভা হয়েছে।
সভায় হাতি উপদ্রুত বালিজুরি এলাকায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিজ্ঞতা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এবং ক্ষতি কমিয়ে আনতে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটি শনিবার দুপুরে উপজেলার সীমান্তবর্তী বালিজুরি গ্রামের খাড়ামোড়া এলাকার কোচপল্লীতে এ মতবিনিময় করে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইইডি, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি এবং শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব এ সভা আয়োজনে সহযোগিতা করেছে।
জনউদ্যোগ আহ্বায়ক শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর পক্ষে সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল হক, কৃষক আবুল হোসেন, কৃষাণী পপি রানী কোচ, ইআরটি সদস্য (এলিফেন্ট রেসপন্স টিম মেম্বার) লংকেশ্বর কোচ বক্তব্য রাখেন।
তারা বলেন, ফসলের মৌসুমে এবং আম-কাঠালের সময়ে বা পাহাড়ে খাবারের সংকটে হাতির দল পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে। তারা ফসলের ক্ষেত ও ঘরবাড়ীতে হানা দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করে থাকে। অনেক পরিবার এই হাতির কারণে ভিটেবাড়ী, ফসলি জমি ফেলে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
তারা আরও বলেন, প্রতিবছর হাতি তাড়াতে গিয়ে আহত হওয়া এবং প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। কয়েকদিন আগেও বালিজুড়ি এলাকায় হাতির আক্রমণে একজন নিহত হয়েছে এবং দুটি বাড়ির চারটি ঘর ভাঙচুর এবং চাল-ডাল সহ ঘরে মজুদ করা বিভিন্ন খাবারের জিনিস খেয়ে ফেলেছে হাতি।
এখনও বালিজুড়ি পাহাড়ে হাতি অবস্থান করছে জানিয়ে এলাকাবাসী হাতি তাড়ানোর জন্য উচ্চ ক্ষমতার টর্চলাইট এবং মশাল জ্বালানোর জন্য বিনামুল্যে কেরোসিন তেলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
পরে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ে অভিজ্ঞজনরা হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসন ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে করণীয় বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
এ সময় বক্তব্য রাখেন- জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদির, উপদেষ্টা দেবদাস চন্দ বাবু, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুজ্জামান, শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান রুপম, জনউদ্যোগ সংগঠক মো. সোলায়মান আহম্মেদ, হাতির খবর ও সচেতনতা দলের সংগঠক মো. লিয়াকত আলী, সাংবাদিক হাকিম বাবুল।
এসময় বক্তারা বলেন, বন্যহাতিকে উত্যক্ত করা যাবে না। পাহাড়ে হাতির বাস্তুসংস্থান ও খাবারের উপযোগী বৃক্ষের বাগান তৈরি করতে হবে। পানির আধার তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।
এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে তারা বলেন, লোকালয়ে বন্যহাতি আসা কমাতে হলে সীমান্ত জনপদে ধানসহ যেসব ফসল হাতির পছন্দের খাবার সেগুলোর আবাদ কমিয়ে মরিচসহ হাতির অপছন্দের খাবার ফলানোর দিকে নজর দিতে হবে। মৌমাছি চাষ করেও বিকল্প আয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
এছাড়া হাতির চলাচলের পথ ছেড়ে দিতে হবে, সেসব স্থানে ছোট ছোট পুকুর কিংবা পানি ধারনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যুতে ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা বন্ধ করে হাতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
বনবিভাগের তথ্যমতে, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি জনপদে গত ১৬ বছরে (২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত) হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৪৬ জনের। এছাড়া ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে।
একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৩৪টি। যেসব বন্যহাতি মারা গেছে, তাদের বেশীর ভাগই হয় গুলিবিদ্ধ হয়ে, নয়তো ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কিংবা বিদ্যুতের পাতা ফাঁদে মারা গেছে।
সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি শ্রীবরদীর বালিজুড়ি পাহাড়ের নেওয়াটিলা এলাকায় লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে বন্যহাতির আক্রমণে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। অপরদিকে, ২০২৫ সালের ৫ জুলাই নালিতাবাড়ীর কাটাবাড়ি পাহাড় এলাকায় বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে মৃত্যু হওয়া ১৫/১৬ বছরের একটি মাদি হাতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।