Published : 22 Jul 2026, 12:48 PM
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় রাস্তা থেকে এক বালু ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মারধর ও তার কান কামড়ে জখমের ঘটনার প্রধান আসামি ঘোড়াশাল পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন চিশতিয়া শতাধিক মানুষ নিয়ে প্রকাশ্যে সমাবেশ করেছেন।
গত সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ঘোড়াশাল পৌরসভার চরপাড়া এলাকায় রওশন জেনারেল হাসপাতাল ও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে ওই সমাবেশে তিনি পৌরসভাকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দেন।
এদিকে মামলা তুলে না দিলে প্রধান আসামি মহিউদ্দিন চিশতিয়া মামলার বাদী মিয়া মোহাম্মদ সজিবকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সজীব ‘মেসার্স সজীব ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী’।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মহিউদ্দিন চিশতিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
পলাশ থানার ওসি শাহেদ আল মামুনের ভাষ্য, “আসামি মহিউদ্দিন চিশতিয়া মাত্র পাঁচ মিনিট সমাবেশ করে দ্রুত চলে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।”
ওই সভায় মহিউদ্দিন চিশতিয়া বলেন, “আবদুল মঈন খান স্যারের আদর্শে রাজনীতি করার অর্থ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভয় পাই না।

“কারণ যে রাজনীতিতে সততা ও নীতির শিক্ষা দিয়েছেন মঈন খান স্যার, সেই আদর্শই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস নেই”
কোনো অন্যায় করেননি বলেও এ সময় দাবি করেছেন মহিউদ্দিন চিশতিয়া।
এর আগে গত ১৩ জুলাই বিকালে ঘোড়াশাল পৌর এলাকার ‘বাংলাদেশ জুট মিলের সামনে’ থেকে বালু ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে একদল লোক জোর করে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন চিশতিয়ার বাড়িতে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী ‘টিকে খান’-এর বালু, ইট ও রড সরবরাহের কাজ পেয়ে সজীব মিয়া বালু ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনকে ড্রেজার মেশিন ও পাইপ ভাড়াসহ কাজটি সম্পাদনের জন্য নিয়োগ করেছিলেন।
নির্যাতনের এক পর্যায়ে সাখাওয়াতের কানে কামড় দিয়ে জখম করেন মহিউদ্দিন। এমনকি গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়, তার কানে সেলাই লাগে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় পলাশ থানায় বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন চিশতিয়াকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরও ১৫ থেকে ২০ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ, মারধর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করা হয়। ভুক্তভোগীর ব্যবসায়িক অংশীদার ও জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি সজিব ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মামলার দায়েরের পরও গ্রেপ্তার না হয়ে মহিউদ্দিন চিশতিয়া বিশাল জনসভার আয়োজক ও প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেন। জনসভায় তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে পাঁচ মিনিট বক্তব্য রাখেন এবং তার সমর্থকরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এদিকে ওই সভার জনসমাগম ও তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গুরুতর ও আলোচিত মামলার প্রধান আসামি হওয়া সত্ত্বেও মহিউদ্দিনের এভাবে জনসমক্ষে উপস্থিতি ও নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয়রা বলছে, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজির মামলার প্রধান আসামি হয়েও তার প্রকাশ্যে মিছিল ও জনসভায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে বোধগম্য নয়।
মামলার বাদী ছাত্রদল নেতা মো. সজীব মিয়া ভুইয়ার অভিযোগ, অপহরণের পর ব্যবসায়ীর কানে কামড় ও হামলা মামলার প্রধান আসামি চিশতিয়া ও তার বাহিনী মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মামলার প্রধান আসামি সোমবার শত শত মানুষ নিয়ে সমাবেশ করলেও এখনও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
মহিউদ্দিন চিশতিয়ার বক্তব্যে প্রতিক্রিয়ায় সজীব মিয়া অভিযোগ করে বলেন বলেন, “মহিউদ্দিন চিশতিয়া মাদকমুক্ত ঘোষণা করবেন কি? তিনি নিজেই সন্ত্রাসী ও ঘোড়াশালে মাদকের জনক।
“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে খোঁজ নিয়ে দেখেন, তার বিরুদ্ধে আগে কতগুলো মামলা ছিল এবং সেসব কি ধরনের মামলা।”
মামলার বিষয়ে জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে মহিউদ্দিন চিশতিয়া বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি-না, সেটাই তো জানি না। থানায় অভিযোগ দিলে তদন্ত হবে, এরপর না হয় অভিযুক্ত হব।
“মামলার কোনো কাগজপত্র আমি পাইনি। এ বিষয়ে পুলিশও আমার সঙ্গে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।”
তিনি বলেন, “মামলার বাদী আহত ব্যক্তি নন, অন্য একজন। কেন তিনি বাদী হয়েছেন, সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।”
নরসিংদীতে ব্যবসায়ীর কান কামড়ে জখম, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা