পথের আলাপন
Published : 22 Jul 2026, 02:25 PM
সবার মনে যেন আনন্দের দোলা লেগেছে। একদিন পরেই পয়লা বৈশাখ। লোকেরা ছুটছে বাজারের দিকে। সাজসজ্জার সামগ্রী আর কাপড়ের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। প্রিয়জনের জন্য উপহার কিনছে সবাই। মাইকে ঘোষণা চলছে নানা অনুষ্ঠানের আগাম খবরের।
কাঁচাবাজারেও দেখি মানুষের জটলা। দু-একটা ইলিশ হাতে ঝুলিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে কেউ কেউ। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান- সব ধর্মের লোকই ব্যস্ত বৈশাখ নিয়ে। কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো মতভেদ। সবার কাছে বৈশাখ মানেই আনন্দ। বৈশাখ কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়; বৈশাখ হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব।
দিনাজপুর শহরেও বৈশাখের তোড়জোড় চলছে। “পান্তা, ইলিশ, নাগরদোলা/ বটের ছায়ায় বৈশাখী মেলা/ রাতভর কবিগান/ বাউলেরা গেয়ে যায়- মানুষেরই জয়গান।” আদিবাসীদের বৈশাখ দেখব, সে পরিকল্পনা নিয়েই এসেছি দিনাজপুরে। বন্ধু কাজিম উদ্দিনের বাড়ি দিনাজপুর শহরে। কাছাকাছি আদিবাসী পাড়াগুলো তার চেনা। তার সঙ্গে পরিকল্পনা সেরে নিই আগের দিন রাতেই।
খুব ভোরে কাজিমের মোটরসাইকেলে চেপে আমরাও রওনা হই কালিয়াগঞ্জ আর বহবলদীঘির দিকে। বৈশাখের প্রথম প্রহরে রাস্তার পাশে নানা সাজ-পোশাকে বাঙালিদের ভিড়। কোথাও কোথাও লেগেছে বৈশাখী মেলা। সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা চলে আসি বহবলদীঘিতে।
এখানকার ভুনজার পাড়ায় কোনো বৈশাখী আয়োজন চোখে পড়ল না। বিশটির মতো ভুনজার সম্প্রদায়ের আদিবাসী পরিবার আছে বহবলদীঘিতে। এদের বাড়িগুলোর অবয়বই বলে দেয় ভুনজারদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা। একটি বাড়িতে ঢুকে দেখি তুলসী গাছের পাশে মাটিতে বেশ কয়েকটি সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া। বেশকিছু ফুলও পড়ে আছে সেখানে। বোঝা যায়, একদিন আগেই এখানে পূজার আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে।
মহৎ বা গোত্র প্রধানের খোঁজ করতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন জানালাবিহীন একটি ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এক বৃদ্ধ। বয়স ষাটের মতো। হাসিমুখে পিঁড়ি টেনে আমাদের বসতে দেন তিনি।
নাম তার বাতাসু ভুনজার। বহবলদীঘির ভুনজার গোত্রের মহৎ তিনি। এখানে আছেন পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই। বৈশাখে কি ভুনজারদের কোনো উৎসব হয় না? প্রশ্ন করতেই বাতাসুর হ্যাঁ-সূচক উত্তর। তিনি জানালেন, বৈশাখ উদযাপনের অংশ হিসেবেই গোত্রের সবাই আজ দলবেঁধে বেরিয়েছে শিকারে। বাতাসুর কথায় আমরা খানিকটা অবাক হই। কিছুটা থেমে থেমে বাতাসু বলতে থাকেন ভুনজারদের বৈশাখের কথা।
আদিবাসী ভুনজাররা পূর্বপুরুষদের রীতি অনুসারে চৈত্র মাসের শেষ দিন আর বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে বিশেষ পূজা আর আচারের মাধ্যমে পালন করে আসছে। ভুনজারদের ভাষায় এটি ‘চৈতবিসিমা’ উৎসব। এ উৎসবের অংশ হিসেবে চৈত্র মাসের শেষ দিন এরা বাসন্তী পূজা করে থাকে। কেন এই পূজা? প্রশ্ন করতেই বাতাসুর উত্তর, “বাপ-দাদারা পূজেছে, তাই পূজি।”
বাসন্তী পূজা নিয়ে ভুনজারদের মধ্যে আজও প্রচলিত আছে কিছু আদি বিশ্বাস। একসময় যখন রোগ নিরাময়ের জন্য কোনো চিকিৎসক ছিল না, তখন ডায়রিয়া আর বসন্তে মারা যেত শত শত আদিবাসী। এই দুটি রোগ থেকে মুক্তি পেতেই ভুনজাররা চৈত্রের শেষ সন্ধ্যায় ঠাকুরের কাছে পূজা করে। বাতাসু জানালেন, বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির জন্য এই পূজা করা হতো বলেই এর নামকরণ হয়েছে বাসন্তী পূজা।
এ পূজায় একটি মাটির ঘটিতে আমপাতা, কলা, নারকেল, ধূপ আর চার ফোঁটা সিঁদুর দিয়ে ঠাকুরের উদ্দেশে পূজা দেওয়া হয়। কেউ কেউ এই দিনেই বলি দেয় মানতের হাঁস, মুরগি কিংবা পাঁঠা। এর আগে চৈত্রের শেষ শুক্রবার এরা উপোস থাকে। উদ্দেশ্য- ঠাকুরের সন্তুষ্টি ও রুজি বৃদ্ধি। বিনা লবণে আতপ চালের ভাত খেয়ে উপোস শুরু হয়। উপোস অবস্থায় খাওয়া যায় শুধুই ফলমূল আর দুধ।
বাসন্তী পূজা শেষে ভুনজাররা সবাই কালাইসহ নানা ধরনের ছাতু-গুড় খেয়ে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। বাতাসু জানালেন, সে কারণেই গত রাতে চলেছে খ্যামটা নাচ আর হাঁড়িয়া খাওয়া। বাতাসু ভুনজারের বিশ্বাস, প্রতি চৈত্রে এই পূজার কারণেই তাদের গোত্রে এখন আর ডায়রিয়া কিংবা বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হয় না।
কথায় কথায় পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রবি ভুনজার। বাতাসুর ছেলে সে। কথা বলছে বেশ চেঁচিয়ে। আমাদের দেখে খানিকটা লজ্জিত হয়। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তার কথা খানিকটা জড়িয়ে যাচ্ছিল। গত রাতের বাসন্তী পূজার হাঁড়িয়ার নেশা তার তখনও কাটেনি। “কেমন মজা করলেন?” বলতেই সে ভুনজারদের খট্টা ভাষায় গেয়ে ওঠে খেমটা নাচের একটি গান: “কেলা গাছে আয়না টাঙ্গাবে রে/ কালো তরী মনো না ভুলারে/ হে হাগলে হাগলে...।”
রবির গান থামতেই বাতাসু আবার কথা শুরু করেন। বাঙালিদের মতো বৈশাখে আদিবাসীরা তাদের প্রিয়জনকে নতুন কিছু উপহার না দিলেও বৈশাখের সকালে তারা সবাই মিলে ‘পোনতা’ (পান্তা ভাত) খায়। তবে পান্তার সঙ্গে মেলে না কোনো ইলিশের টুকরো। পূর্বপুরুষের আমল থেকেই চৈতবিসিমার অংশ হিসেবে ভুনজাররা বৈশাখের সকালে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে সেরে নেয় পান্তা খাওয়া। এদের বিশ্বাস, বৈশাখের প্রথমে পান্তা খেলে সারা বছর গায়ে রোদ লাগলেও তারা কষ্ট পায় না। তাছাড়া পান্তার পানি তাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
বৈশাখের প্রথম দিন ভুনজাররা কাজে না গেলেও তীর-ধনুক আর কোদাল নিয়ে তারা দলবেঁধে শিকারে বের হয়। সন্ধ্যা অবধি শিকার করে নিয়ে আসে ধুরা, কুচিয়া আর ইঁদুর। সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে শিকারগুলো দিয়ে রান্না হয় ‘খিচরি’ (খিচুড়ি)। রাতভর চলে আনন্দ-ফুর্তি আর হাঁড়িয়া খাওয়া। বাঙালির বৈশাখের আয়োজনকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি গ্রাস করলেও আদিবাসী সংস্কৃতিতে খেমটা আর ঝুমুর নাচ এখনও আদি ও অকৃত্রিম।
দুপুরের দিকে আমরা ভুনজার পাড়া থেকে বের হয়ে কালিয়াগঞ্জের পথ ধরি। রবি ভুনজার তখনও থেমে থেমে গান গাইছে। চলতে চলতে কানে বাজে আদিবাসী সে গানের সুরটি: “পানের ডেলা পানে রইলো/ সুপারিতে ঘুনো লাগি গেল, মা/ সুপারিতে ঘুনো লাগি গেল/ হে সেবেল, সেবেল, ওয়াহাগলে, ওহাগলে, হে...।”
আঁকাবাঁকা মেঠোপথ পার হতেই বিশাল শালবন চোখে পড়ে। লাল মাটির পথ পেরিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ক্যাম্পকে পেছনে ফেলে আমরা চলে আসি শালবনের একেবারে ভেতরে। চারপাশে গা-ছমছমে পরিবেশ। খুব কাছেই সীমান্ত। খানিকটা ভয় ভয়ও লাগছিল; পাছে ফেলানির মতো অবস্থা হয় আমাদের!
কচি কচি পাতা গজিয়েছে গোটা বনে। বন্ধু কাজিম জানাল, কয়েকদিন পরেই শালগাছে আসবে ফুল। আর তখন এ অঞ্চলের আদিবাসী নারীদের মনে আনন্দের ঢেউ লাগবে। শালফুলকে বরণ করবে সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসী। সাঁওতাল ভাষায় এটি ‘বাহাপরব’ উৎসব। বাহাপরবের আগে আদিবাসী নারীরা নাকি কোনো ফুলই ব্যবহার করে না।
বনের ভেতরেই একটি আদিবাসী পাড়ার সামনে আমরা থামি। পাড়াটি মুন্ডা পাহানদের। মাটি আর ছনের আদিবাসী ঘরগুলোর একপাশে গহিন শালবন, আর অন্যপাশের মাঠ পেরোলেই কালো কাঁটাতারের বেড়া। আমাদের দেখে এগিয়ে আসে সবুজ পাহান। তাকে নিয়ে আমরা পাড়াটি ঘুরে দেখি।
মুন্ডাদের দুপুরের খাওয়া শেষ হয়েছে তখন। সবুজ পাহান জানাল, বৈশাখের রীতি অনুসারে তারা ভাতের সঙ্গে খেয়েছে ১২ ভাজা, অর্থাৎ ১২ পদের তরকারি দিয়ে। আদিবাসী ভুনজারদের মতোই এরা সকালে খেয়েছে পান্তা ভাত। আর সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে চলবে নাচ-গানের আসর।
সবুজের দাদা শ্যামল পাহান। বয়স সত্তরের মতো। একটি বড় গাছের ছায়ায় বসে তার সঙ্গে কথা চলে আমাদের। “কেন পান্তা খান?” প্রশ্ন করতেই তিনি আদিবাসী সুরে গান ধরেন: “হামে লাগে প্রথমে আদিবাসীই/ পনতা ভাত ভালোবাসি...।” তার গানে আমরা বেশ মজে যাই। কথা চলে চৈত্র-বৈশাখের নানা উৎসব নিয়ে।
বৈশাখের মতো চৈত্রের শেষ দিনেও মুন্ডা পাহানরা আয়োজন করে নানা আচারের। ওই দিন এরা বাড়িঘর পরিষ্কার করে একে অপরের গায়ে কাদা আর রঙ ছেটায়। পূর্বপুরুষদের রীতি অনুসারে যার গায়ে কাদা বা রঙ দেওয়া হয়, তাকেই খেতে দিতে হয় হাঁড়িয়া। মুন্ডারা বিশ্বাস করে, এতে বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়। চৈত্রের শেষ দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিনের এ উৎসবকে মুন্ডারা বলে ‘সিরুয়া বিসুয়া’।
শ্যামল পাহান জানালেন, এ ছাড়াও এরা চন্দ্র হিসাবমতে চৈত্র মাসেই আয়োজন করে ‘চৈতালি পূজা’। রোগ থেকে মুক্তি পেতে ঠাকুরের কৃপা লাভই এ পূজার উদ্দেশ্য। এ পূজায় আগের রাতে উপোস থেকে পরের দিন দুপুরে পূজার প্রসাদ দিয়ে উপোস ভাঙাই নিয়ম। মনকাঁটা বা বেল গাছের নিচে মাটির উঁচু ঢিবি তৈরি করে, লাল নিশান আর ধূপকাঠি টাঙিয়ে; পান, সুপারি, দুধ, কলা, দূর্বাঘাস, বাতাসা, কদমফুল, সিঁদুর, হাঁড়িয়া দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে ঠাকুরকে পূজা দেওয়া হয় চৈতালি পূজায়। একইসঙ্গে বলি দেওয়া হয় মানতের কবুতর, হাঁস কিংবা পাঁঠা। পূজা শেষে চলে খিচুড়ি খাওয়া। রাতভর চলে হাঁড়িয়া খাওয়া আর নাচ-গান।
এরই মধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। হাঁড়িয়া খেতে খেতে মুন্ডারা শুরু করে নাচ-গানের পর্বটি। বৈশাখের আনন্দে বেজে ওঠে আদিবাসীদের মাদল আর ঢোলগুলো। পাশের শালবনের ভেতর ঝিঁঝি পোকার ডাক, মাঝে মাঝেই ডেকে উঠছে দু-একটা শেয়াল। এরই মাঝে আমরা ফিরছি। দূর থেকে ভেসে আসছে আদিবাসী গানের সুর। আমিও কান পেতে রই। হঠাৎ যেন হারিয়ে যায় সব সুর; আমরাও মিশে যাই লোকালয়ে।