১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

উচ্চ আদালতের নির্দেশ, অভিযান সত্ত্বেও অবৈধ ইটভাটা চালু

এলাকাবাসী জানান, তাদের লিখিত অভিযোগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযানের এক ঘণ্টার মাথায় ফের ভাটাটিতে ইট উৎপাদন শুরু হয়।

বান্দরবান প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Nov 2023, 05:44 PM

Updated : 26 Nov 2023, 05:43 PM

অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ঘোষণা করে একপাশে খুঁটি দিয়ে টাঙানো আছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা। অন্যদিকে সমানভাবে চলছে ইট প্রস্ততকরণের সব আয়োজন। মাটি নিয়ে একের পর এক ঢুকছে ট্রাক। ট্রাকে করে নিয়ে আসা হচ্ছে বনের কাঠও। দেখে বুঝার কোনো উপায় নেই; একদিন আগেও অভিযান চালিয়ে ভাটাটি বন্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

বান্দরবান সদর উপজেলার ৮ কিলোমিটার দূরে কয়েকটি খিয়াং পাড়ার মাঝখানে ‘এবিসি’ নামে ইটভাটাটি স্থাপন করা হয়েছে। ভাটার কয়েক গজের ব্যবধানে আছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

জনস্বার্থে একজন আইনজীবীর দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম সাত দিনের মধ্যে বন্ধ করতে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত।

পরে তিন জেলার ইটভাটার মালিকরা রিট পিটিশন দায়ের করেন। তবে শুনানিতে উচ্চ আদালত এ বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

এ বছর অক্টোবরে গুংগুরু খিয়াংপাড়ার এবিসি ইটভাটাটি উচ্চ আদালতের রিট পিটিশন নম্বর ১২০৪/২০২২ নির্দেশনা মোতাবেক বন্ধ ঘোষণা করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু মালিক উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে ইটভাটা চালু রাখেন। পরে পাড়াবাসীর লিখিত অভিযোগ পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার দুপুরে অভিযান চালানো হয়।

অভিযানে ফায়ার সার্ভিস নিয়ে গিয়ে ভাটার আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার এক ঘণ্টার মাথায় ভাটাটি আবার চালু করা হয় বলে জানান গুংগুরু পাড়াবাসী।

শনিবার বিকালে ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, তখনও দেড় শতাধিক শ্রমিক এবিসি নামে এই ইটভাটায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সাংবাদিক আসছে বুঝতে পেরে সব শ্রমিক কাজ বন্ধ করে সরে যান। পাশের কয়েকটি দোকানে গিয়ে নিজেদের আড়াল করেন তারা।

পরে কয়েকজন শ্রমিকের পিছু নেওয়া হলে আলমগীর নামে এক শ্রমিক জানান, এখানকার অধিকাংশ শ্রমিক নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে কাজ করতে এসেছেন। আসার পর ১৫ দিন ধরে তারা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করে যাচ্ছিলেন।

গত শুক্রবারের অভিযান সম্পর্কে দোকানে থাকা কয়েকজন শ্রমিক জানান, ওইদিন দুপুরের দিকে একজন লোক আসছিলেন। যাকে তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুপুরে ১২টা-১টার দিকে ভাটাটি বন্ধ করে দেন। তবে এর ঘণ্টাখানের মাথায় আবার ভালোভাবে চালু করা গেছে বলে জানান শ্রমিকরা। এ ভাটায় ১৬০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের মধ্যে শুধু নোয়াখালী থেকেই নিয়ে আসা হয়েছে ১০০ জনকে।

আব্দুর রব নামে একজন শ্রমিক জানান, তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তাকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা দিয়ে কাজ করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এভাবে কাউকে এক লাখ আবার কাউকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম টাকা দিয়ে বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।

সুখেন্দু বড়ুয়া নামে আরেক শ্রমিক বলেন, তারা একজন মাঝির অধীনে ১২ জন শ্রমিক ১৫ দিন ধরে কাজ করছেন। তাদেরকেও অর্ধেক টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে।

ভাটায় ইট তৈরির কাজে কয়েকজন শিশু শ্রমিককেও দেখা গেছে।

আরাফাত ও ইউসুফ নামে দুই শিশু শ্রমিক জানায়, তাদের জানা মতে এই ইটভাটায় সাতজনের মত কম বয়সি শ্রমিক রয়েছে। তাদের কারও বয়স ১২ বছর, কারও ১৫ বছর হবে। 

এদিকে পাড়াবাসী জানিয়েছেন, ২০০৫ সালের দিকে এবিসি নামের এই ইটভাটা স্থাপন করা হয়। স্কুলসংলগ্ন ও পাড়ার মাঝখানে হওয়ায় শুরু থেকে ইটভাটা বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়ে আসছেন তারা। এমনকী শহরে গিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পর্যন্ত পালন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালান হলেও ভাটাটি কখনই বন্ধ করা যায়নি। বিভিন্ন সময় ইটভাটার মালিক উচ্চ আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে বছরের পর বছর ভাটাটি চালু রেখেছেন।

গুংগুরু পাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক মংহ্লাপ্রু খিয়াং অভিযোগ করে বলেন, “ভাটার কালো ধোঁয়া ও ট্রাক চলাচলের কারণে ধুলাবালিতে শ্রেণিকক্ষগুলো সবসময় ময়লা থাকে। শিশু শিক্ষার্থীদের শ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হয়। শিক্ষকদেরও পাঠদানের সমস্যা হয়। কত অভিযোগ করা হয়েছে। এখনও সমাধান মেলেনি।”

প্রশাসন অভিযান চালানোর এক ঘণ্টার মাথায় ফের চালুর বিষয়ে জানতে এবিসি ইটভাটার মালিক মোহাম্মদ ইসলাম কোম্পানির মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হয়।

তখন তিনি বলেন, “গাড়িতে করে শহরে ফিরছি। পনের মিনিট পর পৌঁছলে ফোন দেওয়া হবে।”

এরপর তিনি ফিরতি ফোন দেননি; চেষ্টা করে তার ফোনের সংযোগও পাওয়া যায়নি।

এদিকে, গত শুক্রবারের অভিযানের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বান্দরবান সদর উপজেলার ইউএনও ও নির্বাহী হাকিম উম্মে হাবীবা মীরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার দুপুরেই অভিযান চালানো হয়েছে। ইট পোড়ানোর চুল্লির আগুন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরের দিন আবারও ভাটা চালু করা আমাদের অবজ্ঞা করার সামিল। খবর নিয়ে আবারও অভিযান চালানো হবে।”

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গুংগুরু খিয়াং পাড়ার ইটভাটায় গত শুক্রবার প্রথম অভিযান চালানো হয়েছে। এবার আমরা দ্বিতীয় অভিযানে যাব। তবে অভিযান চালাতে গেলে আমাদের কয়েকটা অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করতে হয়।”

ফখর উদ্দিনের দাবি, “আমাদের তালিকায় মোট ৬৭টি ইটভটা রয়েছে। তবে সবগুলো ইটভাটা চালু আছে কিনা আমরা নিশ্চিত নই। গত বছর চলছে ৬০টি ভাটা। সেহেতু আমরা ধরে নিচ্ছি ৬০টি ইটভাটাই রয়েছে। এগুলো সবই বন্ধ। একটাতেও আগুন দিতে দেওয়া হয়নি। একটা আগুন দিতে চেষ্টা করেছিল। আমরা খবর পেয়ে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে আসছি। আলীকদমেও একটা চালু করার চেষ্টা করেছিল। সেটাতেও অভিযান চালানো হয়েছে। নাইক্ষ্যছড়িতেও একটা ইটভাটা ভাঙা হয়েছে। অপর তিনটি ইটভাটা চালু করেনি। তাও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

“এ ছাড়া যতটুকু তথ্য পেয়েছি, লামা ফাইতংয়ে এ বছর ইটভাটা চালু করবে না। তারা কোর্ট থেকে রায় পেলে চালু করবে, তার আগে করবে না। বান্দরবান সদরেও তারা রায় পেলে করবে। যতটুক শুনেছি, তারা একটার জন্য কোর্টের রায় পেয়েছে। যেহেতু রায়ের কপি আমরা এখনও পাইনি; অ্যাকশনে আছি।’’