Published : 24 May 2026, 06:37 PM
কোরবানির ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৪টি স্থানকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী অংশের প্রায় দুইশ কিলোমিটারের মধ্যে এসব স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
যদিও সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং হাইওয়ে পুলিশ বলছে, তাদের চেষ্টায় এসব এলাকা যানজটমুক্ত থাকবে, ঈদযাত্রা হবে স্বস্তির।
গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়ক যানজট মুক্ত রাখতে নজরদারি ও টহল বাড়িয়েছে হাইওয়ে পুলিশ; সংস্কার ও মেরামতে প্রয়োজনীয় কাজ করছে সড়ক বিভাগ।
দেশের অর্থনীতির প্রধান ‘লাইফলাইন’ খ্যাত এই মহাসড়কটি ঢাকা থেকে শুরু করে চারটি জেলা অতিক্রম করে চট্গ্রামে পৌঁছেছে। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলে আওতায় রয়েছে এই মহাসড়কটির প্রায় ২০০ কিলোমিটার, যা মুন্সীগঞ্জের মেঘনা টোলপ্লাজা থেকে শুরু হয়ে কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ড বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।

২৮ মে কোরবানি ঈদ সামনে রেখে সড়কপথে বৃহস্পতিবার থেকে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। রেলপথে শুরু হয়েছে শনিবার। ঈদে সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে সোমবার থেকে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশে যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ২৪টি স্থানকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করে করণীয়ও নির্ধারণ করার কথা বলেছেন কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান।
তিনি বলেন, শুরুতেই মুন্সীগঞ্জের টোলপ্লাজাকে যানজটের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সেখানে টোল আদায়ে ধীর গতি হতে পারে।
পরে কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর, আমিরাবাদ, চান্দিনা, মাধাইয়া বাজার এলাকায় মহাসড়কের পাশে বাজার ও বাসস্ট্যান্ড থাকায় সে স্থানগুলোকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আলেখারচর পর্যন্ত মহাসড়ক মেরামতে কাজ চলমান থাকায় সেখানেও যানজটের সম্ভাবনা রয়েছে।
পদুয়ার বাজা এলাকায় পার্শ্বরাস্তা ও ইউটার্ন, মিয়াবাজারে মহাসড়কের উভয় পাশে দোকান ও বাসস্ট্যান্ড, চৌদ্দগ্রাম বাজারেও ঢাকামুখী লেনের উভয় পাশে দোকান ও বাসস্টপেজ যানজটের কারণ হবে।
এছাড়া ফেনীর মহিপালে বেসিক মোড়, কসকা বাজার, সমিতি বাজার বারইয়ার হাট, মীরসরাই এলাকায় পার্শ্বরাস্তা এবং বাসস্টপেজের কারণ যানজটের শঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বাজার, বড় দারোগার হাট ওজন স্কেল, ফুটলিংক, ছোট কুমিরা, কেডিএস বাজার, ভাটিয়ারী ও বাড়বকুণ্ড বাজার এলাকাতেও গাড়ির জট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান বলেছেন।
এই মহাসড়কে চলাচলকারীদের কয়েকজন বলেছেন, মহাসড়কের পাশে যেন পশুর হাট না বসে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়, এই বিষয়ে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
ছিনতাই, মলমপার্টি, ডাকাতদল প্রতিরোধের আহ্বান
ঈদের যানজট ও ভিড়কে কেন্দ্র করে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, মলমপার্টি ও ডাকাতদল সক্রিয় হয়। তাদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধেও পুলিশকে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানিয়েছেন যাত্রী ও চালকরা।
ঢাকাগামী বাসযাত্রী মাহফুজ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণত ঈদে রাস্তায় তিন চারগুণ চাপ বেড়ে যায়। সে সুযোগে বিভিন্ন অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই এসময় পুলিশ ও প্রশাসনকেও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কেউ আইন ভাঙলে প্রয়োজনে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজধানীগামী লরি চালক আমিনুলের সঙ্গে কথা হয় পদুয়ার বাজার এলাকায়।
তার অভিযোগ, “কোথাও যানবাহনের জটলা তৈরি হলে-সাথে সাথে তা নিরসনের চেষ্টা করা হয় না। অবৈধ পার্কিং কিংবা দুর্ঘটনার কারণে যদি যানবাহন আটকে যায়, হাইওয়ে পুলিশ যদি সাথে সাথে তা নিরসন করে তাহলে যানজট কখনোই দীর্ঘ হবে না।”
কুমিল্লার চান্দিনার মসলা ব্যবসায়ী আবিতুর রহমান বলেন, “আমি চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন এলাকায় মসলা পাঠাই। ঈদের সময় হল ভরা মৌসুম, এই সময় কোথাও ট্রাক এক মিনিট থেমে থাকা মানে হাজার টাকা লোকসান। সভা সেমিনারে পুলিশ ও প্রশাসনকে জানাই-এবার ঈদে কি হবে দেখি।”

চান্দিনা এলাকায় কথা হয় ঢাকা-চট্রগ্রাম চলাচলকারী বাসের চালক আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এক নিমসার ও চান্দিনায় বারবার উচ্ছেদ করেও সড়কের আশেপাশের জটলা ও স্থাপনা সরানো গেল না। আর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যে মেরামত কাজ গত পাঁচ মাস ধরে চলছে, তা শেষই হয় না।
“এসব কারণেই মানুষের যানজটের ভোগান্তি বাড়ে। এখন আবার প্রচণ্ড রোদ আবার প্রচণ্ড বৃষ্টি, যানজটে মানুষের কষ্টের শেষ নাই।”
টোলপ্লাজায় ভাংতি রাখা ও দেওয়ার আহ্বান
মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে মূলত এই সমস্যা তৈরি হলেও টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীর গতিকেও যানজটের কারণ বলছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।
সংগঠনটির দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঈদের আগে সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যবাহী যানবাহন রাজধানীমুখী থাকে, এ সময় টোল আদায়ের পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু ভাংতি টাকার অজুহাতে টোলপ্লাজায় আটটি বুথের মধ্যে মাঝে মাঝে চারটিও বন্ধ থাকে। এটা জরুরি সময়ে একেবারে অনুচিত।
তিনি বলেন, “টোলপ্লাজায় একটি বুথ বন্ধ হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যানজট গৌরীপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেখানে চৌরাস্তা হওয়ায় যানজটের ব্যাপকতা আরো বেশি বাড়ে। টোলপ্লাজায় নজর দিতে হবে প্রশাসনকে।”
দাউদকান্দি টোলপ্লাজার দায়িত্বে থাকা নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, “টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীরগতির বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। আমরা টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে বলেছি তারা যেন পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা রাখেন, যাত্রী-চালকরাও যেন টোলের সমপরিমাণ টাকা জমা দেন। বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে দেখা হবে।”
কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান বলেন, “আমরা ঈদের আগেই সকল মেরামত কাজ বন্ধ রাখবো। বরং যেখানে যেখানে ভাঙ্গাচুরা আছে সেগুলো দ্রুত সারিয়ে তুলছি। আর অবৈধ স্থাপনা আমরা উচ্ছেদ করি, কিন্তু আবার সেগুলো বসে যায়- এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে আমাদের একার পক্ষে সম্ভব না।”
এদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বস্তির হয় এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা বলেছেন হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহীনুর আলম খান।
তিনি বলেন, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত ৭২৯ কিলোমিটার মহাসড়ক যানজটমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য কাজ করবে। এর মধ্যে নিয়মিত সদস্যের ২৫০ জন অতিরিক্ত সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
পুলিশ সুপার বলেন, মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি রোধে রাতে পুলিশ বেশি তৎপর থাকবে-এ ব্যাপারে জেলা পুলিশের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া সড়ক ও মহাসড়কের পাশে যেন পশুর হাট না বসে সেজন্য নজরদারি করা হচ্ছে। আশা করি ঈদ যাত্রা স্বস্তির হবে।