Published : 24 Jul 2026, 11:37 AM
খুলনার পাইকগাছায় এক ভোজ আয়োজনে রান্নার সময় গরুর মাংসের রং বদলে সবুজ হওয়ার ঘটনায় কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সেজন্য কাঁচা ও রান্না করা-দুই ধরনের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “মাংসের নমুনা পরীক্ষার জন্য রোববার ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হবে।
“তবে কোন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এর আগে বুধবার পাইকগাছা পৌরসভার মডার্ন বেকারির কর্মচারীরা কর্মস্থলে একসঙ্গে ভোজের আয়োজন করেন। সেজন্য বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে আনেন তারা। তবে রান্নার সময় গরুর মাংসের রং বদলে সবুজ হয়ে যেতে শুরু করে।
এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে স্থানীয় থানায় হাজির হন রান্নার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
বেকারির কর্মচারীদের ভাষ্য, তেল-মশলা দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে রান্না শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং বদলে নীলচে-সবুজ হতে থাকে। যতই নাড়াচাড়া করা হচ্ছিল, পরিবর্তিত রং ততই গাঢ় হচ্ছিল। বিষয়টি দেখে তারা চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে অন্যদের ডাকেন।
পরে রান্না করা মাংসসহ কড়াই নিয়ে প্রথমে যান তারা মাংস বিক্রেতার দোকানে। তিনিও এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হন। পরে তারা মাংসসহ কড়াই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। সেখান তাদের থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে কড়াইসহ তারা থানায় যান।
বেকারির কর্মচারী বিল্লাল হোসেন বলেন, বেকারির ২৫ জন কর্মচারীর ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। তাই সকালে বেকারির কর্মচারী লিটন হোসেনসহ তিনজন পাইকগাছা বাজারের মাংস ব্যবসায়ী ইসমাইলের দোকানে যান।
তখন মাংস বিক্রেতা ইসমাইল তাদের জানান, সেদিন জবাই করা গরুর সব মাংস বিক্রি হয়ে গেছে। তবে আগের দিনের কিছু মাংস ফ্রিজে সংরক্ষিত রয়েছে। সেখান থেকে ৪ কেজি মাংস কিনে তারা বেকারিতে এসে রান্না শুরু করেন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবুজ মাংসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয় আলোচনা।
সাধারণত কাঁচা গরুর মাংসের রং লালচে বা গাঢ় লাল হয়ে থাকে। রান্নার সময় তাপের প্রভাবে মাংসের রং পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সবুজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে মেলে না।
কেউ বলছেন, মাংসে ভেজাল থাকতে পারে, কেউ আবার মনে করছেন, রান্নার সময় কোনো রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে এমন হতে পারে। এমনকি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও এ ঘটনা দেখে রীতিমতো বিস্মিত।
এ বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (স্যানিটারি ইন্সপেক্টর) উদয় কুমার মণ্ডল বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে মাংস ফেলে দেওয়ার আগেই তিনি রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে মাংস বিক্রেতার দোকানের ফ্রিজে থাকা প্রায় ৬০০ গ্রাম কাঁচা মাংসও জব্দ করা হয়।
কাঁচা ও রান্না করা-দুই ধরনের নমুনা খুলনার জেলা নিরাপদ খাদ্য কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “এ ঘটনা নিয়ে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। এআই, গুগল কোথাও কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি। নষ্ট মাংস রান্না করলেও তো সবুজ হয় না। রান্নার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো গণ্ডগোল থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “লক্ষ্য করার বিষয় হলো, শুধু মাংসের রং পরিবর্তিত হয়েছে, ঝোলের রং কিন্তু সবুজ হয়নি। বেকারিতে রান্নার সময় যে কড়াই ব্যবহার হয়েছে, সেখানে কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না, তা জানা যাচ্ছে না। বেকারিতে যে ধরনের কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করেন, সেগুলোর সংস্পর্শে কোনো বিক্রিয়া ঘটেছে কি না, সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে।”
নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা বলেন, “২১ তারিখে গরু জবাই হয়েছে। ২২ তারিখে বেকারির কর্মচারীরা চার কেজি মাংস কিনেছেন। বেকারির কর্মচারীরা ছাড়া আরও স্থানীয় কয়েকজন ওই গরুর মাংস কিনেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে অন্যরকম কিছু জানা যায়নি।”
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কর্মকর্তা ওয়ালিদ বিন হাবিব বলেন, “মাংস এভাবে সবুজ হওয়ার কোনো উদাহরণ নেই। নষ্ট মাংস রান্না করলেও সবুজ হবে না। এরকম কোনো দৃষ্টান্ত আগে দেখাও যায়নি। আমার মনে হয় বেকারির কোনো রং বা কেমিক্যাল রান্নার সময়ে মাংসের মধ্যে পড়তে পারে।”
তবে মাংসের রং পরিবর্তন মানেই তাতে ভেজাল বা বিষাক্ত কোনো পদার্থ মেশানো হয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে সরাসরি পৌঁছানো যায় না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে ওয়ালিদ বিন হাবিব বলেন, “মাংসের অবস্থা, সংরক্ষণ, রান্নার পাত্র, রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং জীবাণুর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্যের চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে।”
পাইকগাছা থানার ওসি জুলফিকার আলী বলেন, “বুধবার বিকেলে বেকারির কর্মচারীরা রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে থানায় এসেছিলেন। তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু তারা অভিযোগ দেননি। সবুজ হয়ে যাওয়া মাংস দেখিয়ে কড়াই নিয়ে চলে যান।”