১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শতবর্ষী নৌকার হাটে এখনও বেচাবিক্রি জমেনি

শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় এই হাট বসে।

বিডিনিউজ২৪

কে এম রায়হান কবীর. শরীয়তপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Jul 2026, 09:05 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:43 PM

বর্ষা মৌসুমে নদ-নদী ও খাল-বিলের পানি বাড়তে থাকলে শরীয়তপুরের শতবর্ষী নৌকা বিক্রির বুড়িরহাটেও বেচাকেনা জমে ওঠে। তবে এবার এখনও সেভাবে জমেনি এই হাটের বেচা-বিক্রি। তবু, হাটের দিন অর্ধশতের মত নতুন ও পুরনো নৌকা বিক্রি করতে পারেন মিস্ত্রিরা।  

তারা বলছেন, এখনও বাজার পুরোপুরি প্রাণ ফিরে পায়নি। তাদের আশা, টানা বৃষ্টি ও কীর্তিনাশা, পদ্মা, মেঘনা নদীর পানি বাড়লে নৌকার চাহিদা আরও বাড়বে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই হাট বসে। জেলার ছয় উপজেলার বিভিন্ন বাজারে নৌকা বিক্রি হলেও এই হাটটি ঐতিহ্যবাহী। 

সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় এই হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ব্যবসায়ীরা নৌকা নিয়ে আসছেন। ক্রেতারাও ভিড় করছেন। দামাদামি করে পছন্দমত নৌকা কিনে নিয়ে যাচ্ছে ক্রেতারা। 

বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শম্ভুনাথ পোদ্দার বলেন, ১৯৪৬ সালে বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকেই বিদ্যালয়ের মাঠে নৌকার হাট বসছে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্তত ৪০ বছর আগেই এখানে নৌকার হাটের প্রচলন হয়েছিল। 

নৌকার ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিদ্যালয় কোনো ধরনের খাজনা আদায় করে না বলেও জানান প্রধান শিক্ষক।

প্রতিবছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাটে নৌকা বিক্রি হয়। এখানে বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা বিক্রি হয়। নতুন নৌকার দাম ১০ থেকে ১৮ হাজার এবং পুরনো নৌকার দাম চার থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।

সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর, রুদ্রকর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর, পাপরাইল, ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর, ধানকাঠি এলাকার মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করে থাকেন। 

মঙ্গলবার হাটে মরণ মাল, বাসুদেব পোদ্দার, ক্ষিতীশ শীলসহ কয়েকজন মিস্ত্রি নৌকা নিয়ে বসেছিলেন। কথা হলে তারা জানান, একজন মিস্ত্রি সপ্তাহে ছোট আকারের দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। একটি নৌকা বিক্রি করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা লাভ তাদের থাকে। 

তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে কাঠ মিস্ত্রিদের কাজ কমে যায়। তখন তারা বাড়িতে নৌকা তৈরি করে থাকেন। আগে এলাকার বেশির ভাগ কাঠমিস্ত্রি নৌকা তৈরি করতেন। এখন লাভ কম হওয়ায় অনেকে নৌকা তৈরির কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

সদর উপজেলার চাঁদসার গ্রামের বাসিন্দা বিমল শীল বলেন, ১৫ বছর বয়সে তিনি তার বাবার হাত ধরে কাঠমিস্ত্রির পেশায় আসেন। বাবার কাছেই নৌকা তৈরি কাজ শিখেন। মঙ্গলবার বুড়িরহাটে তিনি দুটি নৌকা বিত্রিু করেছেন।

আরেক কাঠমিস্ত্রী অনিল মাল বলেন, “আমার বাপ-দাদা বুড়িরহাটে নৌকা বিক্রি করতেন। সেই আয়েই সংসার চলত। ৫৫ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করছি। প্রতিবছর মে থেকে নৌকা তৈরি শুরু করি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ চলে। 

কাঁঠাল, মেহগনি, গোয়ারা ও উড়িয়া জাতের আমগাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হয়। বছরের অন্য সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালান।

বুড়িরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল গণি বলেন, নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় এখনও পানি আসেনি। ফলে বাজারে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা সমাগম হয়নি। 

তবে বর্ষা তীব্র হলে বিক্রি আরও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।

হাটে আসা ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার কৃষক সাঈদ হোসেন বলেন, “পুরনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এসেছি। এলাকার চারদিকে নদী। বর্ষা মৌসুমে কৃষিজমিতেও পানি থাকে। তখন নৌকা ছাড়া চলাচল করা যায় না। চাষাবাদের কাজেও নৌকার দরকার হয়।”