‘সুবর্ণচরে ধর্ষণে দণ্ডিতরা রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে’

“আমার ছেলে-মেয়ে আছে। আমি আসামি ১৬ জনের ভেতরেই থাকি। চারপাশে আসামি, আমি নিরাপত্তা চাই,” বলেন ভুক্তভোগী।

নোয়াখালী প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Feb 2024, 05:51 PM
Updated : 5 Feb 2024, 05:51 PM

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রাতে দলবদ্ধ ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা কেবল সেই নারীর ক্ষতি করেনি, বরং রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছে আদালত।

এ ধরনের অপরাধীদের ছাড় দিলে বিচারক ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয় বলেও মন্তব্য করেন বিচারক।

সোমবার রায়ের পর্যবেক্ষণে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ফাতেমা ফেরদৌস বলেন, “আসামিরা শুধু ভিকটিমের ক্ষতি করেনি বরং রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে এবং এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেলে, বিচারে আসামিরা যদি খালাস পায়- তাতে বিচারক ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়।

“তাই আসামিরা বিচারকের কোনো ক্ষমা অথবা করুণা পেতে পারে না; বরং তারা তাদের প্রকৃত অপরাধের সাজা পেলেই ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনও ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করা কিংবা এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতা করা থেকে সম্পুর্ণ বিরত থাকবে।”

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন রাতে উপজেলার মধ্যবাগ্যা গ্রামে চল্লিশোর্ধ ওই নারীর ঘরে ঢুকে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে রেখে তাকে দলবেঁধে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়।

ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনসহ ১০ জনকে এদিন মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত।

এ রায়কে দৃষ্টান্তমূলক বর্ণনা করে বিচারক বলেন, “মামলার আসামিরা এবং এজাহারকারীরা ও ভিকটিম র্পূব পরিচিত। এজাহারকারী ও ভুক্তভোগী স্বামী হিসেবে তাদের বসতঘরে এজাহারে বর্ণিত তারিখে থাকা অবস্থায় ১৬ জন আসামি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ৪০ বছর বয়ষ্ক গৃহবধূকে জোরপূর্বক দলবদ্ধ ধর্ষণ ও মারধর করে অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ করেছে।”

আট আসামির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সাক্ষ্য, এজাহার, জব্দ তালিকা, আলামত, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্য, দালিলিক সাক্ষ্য, ভুক্তভোগীর জবানবন্দি, ডাক্তারি সনদপত্র ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিচারক বলেন, আসামি রুহুল আমিন ও হাসান আরিফ বুলুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও তাদের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও মারধর করা হয়।

আইনের ধারা উল্লেখ করে বিচারক ফাতেমা ফেরদৌস বলেন, “যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশু আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।”

চার সন্তানের ওই জননীর অভিযোগ ছিল, ভোটকেন্দ্রে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে ওই ঘটনা ঘটানো হয়। সে সময় ওই ঘটনা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নামে বিভিন্ন সংগঠন।

পরদিন ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে চর জব্বার থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

আসামিদের মধ্যে মো. রুহুল আমিন, মো. হাসান আলী বুলু, মো. সোহেল, স্বপন, ইব্রাহিম খলিল, আবুল হোসেন আবু, মো. সালাউদ্দিন, মো. জসিম উদ্দিন, মো. মুরাদ ও মো. জামাল ওরফে হেঞ্জু মাঝির সর্বোচ্চ সাজার রায় হয়েছে।

আর মো. হানিফ, মো. চৌধুরী, মো. বাদশা আলম বসু, মোশারফ এবং মো. মিন্টু ওরফে হেলালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

কাঠগড়ায় আসামিদের বিরূপ মন্তব্য

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কাঠগড়া থেকে বিচারককে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন আসামিরা।

এসময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রুহুল আমিন চিৎকার করে বলেন, “আল্লাহরে তুই স্বাক্ষীরে, আমি কিছু করি নাই। আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে বিচার চাই। আমি নির্দোষ।”

পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আপনারা আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন।”

এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসামিদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সেখানে মৃদু হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের দ্রুত কাঠগড়া থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়।

আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বেলা ১১টায় আদালতের এজলাসে ওঠেন বিচারক। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা তিনি রায় পাঠ করেন। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণ জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। রায় ঘোষণার পরপরই কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিরা কান্না শুরু করেন। আসামিদের স্বজনরা রায়ের খবর পেয়ে আদালত প্রাঙ্গণে কান্নাকাটি ও আহাজারি শুরু করেন।

এরপর আদালত থেকে বের হয়ে তারা রায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কোর্ট সড়কে মিছিল করতে থাকেন। দুপুর ১টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায়ে খুশি হলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভুক্তভোগী দম্পতি

রায় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন ভুক্তভোগী নারী ও মামলার বাদী তার স্বামী।

পাঁচ বছর এক মাস প্রতীক্ষার পর রায় শুনতে স্বামী সন্তানদের নিয়ে আদালতে হাজির হন ভুক্তভোগী নারী; কাঠগড়ার পাশে অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

বেলা পৌনে ১টার দিকে রায় ঘোষণা শেষ হলে আইনজীবীদের সঙ্গে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এই দম্পতি।

ভুক্তভোগী নারী বলেন, “আজকের রায়ে আমি খুশি, এলাকাবাসীও খুশি হয়েছে। যে রায় দিয়েছে সরকার যেন তা দ্রুত কার্যকর করে।

“আমার ছেলে-মেয়ে আছে। আমি আসামি ১৬ জনের ভেতরেই থাকি। চারপাশে আসামি, আমি নিরাপত্তা চাই।”

তার স্বামী বলেন, “ন্যায় বিচার হইবো এটা বিশ্বাস ছিলো। আমি খুবই আনন্দিত। কিন্তু আমার কোনো নিরাপত্তা নাই, আমি এটাই চাই।”

আইনজীরা যা বলছেন

বাদীপক্ষের আইনজীবী মোল্লা হাবিবুর রাছুল মামুন বলেন, “এ মামলার রায়ে বিজ্ঞ আদালত পর্য়বেক্ষণ দিয়েছেন যে, মামলাটি কেবল কোন ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটা রাষ্ট্র এবং মানবিকতার ক্ষতি এবং এ জাতীয় ঘটনার সাথে জড়িতদের যদি বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রে পরবর্তীতে একই ধরনের অপরাধ সংগঠিত হবে।

“সুতরাং এ ধরনের অপরাধ আর যেন সংগঠিত না হয়, সেক্ষেত্রে এ রায় একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে এ রায়ে সম্পুন্ন সন্তুষ্ট।”

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছালেহ আহম্মদ সোহেল খান বলেন, “এ মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত আদর্শিক এবং আন্তরিক ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপিত ২৩ জন স্বাক্ষী এবং আসামিপক্ষ উপস্থাপিত পাঁচজন স্বাক্ষী এবং জেরা বিশ্লেষণ করে মাননীয় আদালত আজকে রায় ঘোষণা করেন। আমরা এ রায়ে খুশি।”

রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী হারুনুর রশিদ হাওলাদার বলেন, মামলার বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮ জন ছিলেন সরকারি সাক্ষী। বাকি ১৫ জনের মধ্যে ছয়জন বাদী, ভিকটিম, তাদের ছেলেমেয়ে, মা এবং ভাই। তাদের সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে এ সাজা দেওয়া হয়েছে।

“রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পরে আমরা উচ্চ আদালতে যাবে। আমরা আশাবাদী, উচ্চ আদালতে এ সাজা ঠিকবে না।”