১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এবারও শঙ্কায় আলু চাষি, সরকারিভাবে সংগ্রহের দাবি

এ বছর কুমিল্লায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে আলু চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে।

এবারও শঙ্কায় আলু চাষি, সরকারিভাবে সংগ্রহের দাবি
ক্ষেত থেকে আলু তুলে বস্তায় রাখছেন কুমিল্লার চাষিরা।

বিডিনিউজ২৪

তানভীর দিপু. কুমিল্লা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Mar 2026, 09:37 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:05 PM

কুমিল্লায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম আলুর চাষ হলে বিগত বছরের মত বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে এতে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটার কথা বদলে দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে কপালে। 

কৃষকদের শঙ্কা, ফলন ভালো হলে সংরক্ষণের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। হয়ত বিক্রি করতে না পারায় বিগত বছরগুলোর মত মাঠে-উঠোনে পচবে আলু, আবারো লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।  

তবে সরকার চাইলে কৃষকের উৎপাদিত আলু কিনে সংরক্ষণ করে পরে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে। এতে চাষিরা যেমন দাম পাবেন, তেমনি সঙ্কটকালে টিসিবির মাধ্যমে কম দামে আলু পেতে পারে সাধারণ মানুষ। 

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, এ বছর আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে আলু চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। এবার ফলন বাম্পার হয়েছে। কয়েক জাতের আলু উৎপাদন সন্তোষজনক। 

তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ’ করা নিয়ে কৃষকদের দাবির বিষয়টি উপকারী। এমন উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা তা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব।  

এবার কুমিল্লার প্রায় সব উপজেলাতে আলুর ভালো ফলন হয়েছে। লালমাই উপজেলার বরল এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই মাঠ থেকে আলু উত্তোলন করছেন কৃষকরা। 

কৃষক রুস্তম আলী বলেন, “গতবার অনেক কম দামে আলু বিক্রি করলেও এবার আবারও আলু চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এলাকার সব কৃষক খুশি। কিন্তু সমস্যা হল শুরুর দিকে বেপারীদের আলুর চাহিদা থাকে দাম বেশি পাওয়া যায়, যাদের আলু তুলতে দেরি হয় তারাই মনমত দাম পায় না।” 

তিনি বলেন, “মৌসুমের শুরুতে সংগ্রহ করা আলু দিয়ে বেপারীরা কোল্ড স্টোরেজ ভরতি করে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষক যাদের আলু আগে বিক্রি হয় না, তারাই পড়ে বিপদে। তারা কোল্ড স্টোরেজেও জায়গা পায় না, আবার বেপারীদের কাছেও দাম পায় না।”

“তাই কৃষকরা এখন চায় ন্যায্য দামে আলু বিক্রির নিশ্চয়তা, সরকার চাইলে কৃষক বাঁচাতে পারে”, বলেন এই কৃষক। 

আরেক আলু চাষি সাহাব উদ্দিন বলেন, “আমি গত বছর তিন ভাগের দুই ভাগ আলু বিক্রি করেছি লাভে, বাকি এক ভাগ লোকসানে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেছি। কিন্তু খুচরা বাজার থেকে আমাকেই ২৮-৩০ টাকা কেজি আলু কিনে খেতে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তবে সরকার আলু সংগ্রহ করলে প্রান্তিক চাষি ও উদ্যোক্তা চাষি বেঁচে যাবে। মজুতদার থেকে মানুষও বাঁচবে। আড়তদারের কাছে আলু বিক্রির পরও যদি আলু থাকে তা যদি সরকার নির্ধারিত মূল্যে কিনে রাখে তাহলে সেটি নষ্ট হবে না।”

বগুড়া থেকে কুমিল্লার নিমসার বাজারে আসা আলুর আড়তদার মো. আইয়ুব বলেন, “শুরুতে বেপারীরা মোটমুটি দামে আলু কিনে মজুদ করে ফেলে। এরপর যখন বাজারে আলুর দাম কমে যায় তখন তারা বেচা বন্ধ করে দেয়। 

“কৃষক তখন আলু পচে যাওয়ার ভয়ে কম দামে বিক্রি করতে থাকে। আবার যখন সঙ্কট দেখা দেয় তখন মজুতদাররা আবার বাজারে আলু বেশি দামে ছাড়তে শুরু করে।”

আলুর বর্তমান দাম নিয়ে আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন, “৪২ কেজির বস্তা ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে কেজি হয় ১২ টাকা। আর কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয় কেজি ৯-১০ টাকা দরে।” 

বিগত বছর দেখা গিয়েছিল, আলু নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছিল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কৃষকরা। তাদের উৎপাদিত আলুর দাম কম যাওয়ায় এবং সংরক্ষণের জন্য জায়গা না পাওয়াই অনেককেই দেখা গেছে মাঠেঘাটে আলু ফেলে রাখতে। কারো কারো আলু পচে গিয়েছে, কেউ আবার একেবারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে বাজারে। 

তারপরও এ বছর উপজেলার কৃষকরা আবারও আলু উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে এবং বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসা. আফরিনা আক্তার। 

তিনি বলেন, “বুড়িচং উপজেলায় রপ্তানিযোগ্য ভ্যালেন্সিয়া এবং বারি-৯০ জাতের আলুর ভালো ফলন হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষকরা কার্ডিনাল, ডায়মন্ড ও সানশাইন জাতের দেশীয় আলু চাষ করেছেন। কিন্তু দাম এবারো কম। সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মণ ধরে আলু বিক্রি হচ্ছে। এই দামে বিক্রি হলে এবারো কৃষকের লোকসানই হবে।”

কুমিল্লার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান বলেন, “আলু একসময় ওএমএসে বিক্রি হয়েছে। আলুর দাম পেতে হলে আলু দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানিযোগ্য আলু চাষে আগ্রহী হতে হবে কৃষকদের এবং সরকার উদ্যোগ নিলে আলুও রপ্তানি সম্ভব।”

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান বলেন, “আলু চাষে কুমিল্লা কৃষকরা আগ্রহী। উৎপাদনও ভালো। কিন্তু মৌসুমে আলু বিক্রি নিয়ে কৃষকরা যে সমস্যায় পড়েন তা থেকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।”

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, “কৃষিমন্ত্রী কুমিল্লার সন্তান। তিনি কুমিল্লার পাশাপাশি সারাদেশের কৃষকদের কথাই ভাববেন। সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায় কি না- আমরা বিষয়টি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে জানাব।”