Published : 03 May 2026, 01:35 AM
সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণার অধিকাংশ হাওরই এখন পানিতে থৈ থৈ করছে; তার নিচে রয়েছে এ দুই এলাকার কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। এপ্রিলের শুরুতে হাওর কিছুটা জলমগ্ন হলেও মাসের তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কৃষকের স্বপ্ন একেবারে ডুবে গেছে।
দুই জেলার হাওর ও বিল এলাকা ঘুরে ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কোথাও কৃষক কিছু ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় সেসব ধান শুকাতে বেগ পেতে হয়েছে। অনেক ধান চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের খলায়। ক্ষতি কমাতে কোনো কোনো জায়গায় কৃষক কাঁচা ধানই সিদ্ধ করছেন।
ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলার প্রায় সব হাওর তীরবর্তী গ্রামের কৃষকের অভিজ্ঞতা কমবেশি প্রায় একই রকম। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায়। সেখানে এখনও কৃষক ধান ঘরে তোলার আশা করছেন।
আবার নেত্রকোণার সমতল ও গারো পাহাড়ি এলাকায় বিলের বাইরের জমির ধান এখনও কৃষকের অনুকূলে রয়েছে। তবে বিল ও হাওর এলাকায় ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে তারা বলছেন। যদিও সুনামগঞ্জের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি নেত্রকোণায় কম। কারণ, এখানে হাওরাঞ্চল কম।
হাওর বিস্তৃত সাত জেলা নিয়ে। বিশাল তার সীমানা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলা অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক ধারণার কথা বলেছে। তাতে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে কৃষকদের কথা ও অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাকও দেখা যাচ্ছে।
কৃষকের ভাষ্য হচ্ছে, সরকারি হিসাবের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি জায়গাভেদে অনেক বেশি।
তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কৃষি বিভাগ কোন হিসেবে এখনও জলে ডুবে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারের আশা করছে তা নিয়ে। পানির নিচে চার-পাঁচ দিন ধরে থাকা ধান কতটা ওঠানো যাবে, পানি আদৌ কমবে কিনা, কাটতে পারলেও পানির নিচে থাকা কাঁচা-পাকা ধান মানুষের খাদ্য উপযোগী থাকবে কিনা এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন তারা।
ধান তো দূরের কথা; এ বছর গরুর খাবারের খড় জোগাড় করাই কষ্টকর হবে, আশঙ্কা তাদের।
এই অবস্থার মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সবশেষ ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের ভিতরে সৃষ্ট মেঘমালার কারণে ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় ভারি বর্ষণ হতে পারে। সোম, মঙ্গল ও বুধবার বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। বৃহস্পতিবার থেকে বৃষ্টি কমে আসতে পারে।
কৃষি বিভাগের ক্ষতির চিত্র
শনিবার বিকালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন হাওরের চার জেলার ক্ষয়ক্ষতির একটি চিত্র দিয়েছেন।
তার দেওয়া তথ্য মতে, বিভাগের চার জেলায় ৩০ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় ১৯ হাজার ৩২৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে আট হাজার ৬৫৩, সিলেটে ৩২৭ এবং মোলভীবাজারে দুই হাজার ৫৯৯ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ধানের জমি নয়, কৃষি ফসলও রয়েছে।
একদিন আগে শুক্রবার একই কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছিল, চার জেলায় জলমগ্ন জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৩৭০ হেক্টর। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ ১৫ হাজার ৬৮২, হবিগঞ্জ আট হাজার ২৮৪, মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৯২ এবং সিলেটে ৩১২ হেক্টর।
এর দুদিন আগে বুধবার বিকালে মোশাররফ হোসেন জানিয়েছিলেন, ২০ হাজার ১০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে; সেখানে ১৩ হাজার ৪২২ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবেছে। হবিগঞ্জে এর পরিমাণ ৪ হাজার ৪৬০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ১ হাজার ৯৪১ এবং সিলেট জেলায় ১৮৭ হেক্টর।
চার দিনের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, যত সময় যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে। চার দিনের ব্যবধানে তা প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের বেশি বেড়েছে।
এদিকে নেত্রকোণা হাওর জেলা হলেও এখানে সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চল রয়েছে। ফলে উপজেলা ও জায়গাভেদে ক্ষতির পরিমাণও ভিন্ন।

এখানকার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে হাওর ও বিলে থাকা অপেক্ষকৃত নিচু জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। এ নাগাদ হাওরসহ জেলায় কৃষকের ১৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়েছে।
নেত্রকোণার চেয়ে কিশোরগঞ্জে হাওরাঞ্চল বেশি হলেও সেখানকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আবার কম ক্ষতির তথ্য দিচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুর রহমান শনিবার বিকালে বলেন, জেলায় নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় ডুবেছে ২ হাজার হেক্টর। এতে ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওর এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। শুধু ইটনায় ডুবেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি।
কৃষকের আফসোস: ‘দেখার হাওর’
শুক্রবার বিকালে সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত ‘দেখার হাওরের’ শিয়ালমারা, লাখাই, সাপেরদাইড় ও উথারিয়া ঘুরে দেখা গেছে, পুরো হাওরই জলে থৈথৈ। ডুবে যাওয়া পাকা ধান আর দেখা যাচ্ছে না। সেখানে শুধু ঢেউ খেলা করছে।
এমনকি হাওরের তীরের পাকা ধানও ডুবে গেছে। সড়কে কাটা ধান শুকানো, স্তূপ করে রাখা এবং খড় শুকাচ্ছেন কৃষক। তবে কাটা ধানও ভিজে অঙ্কুর গজিয়ে প্রায় ছয় আনা নষ্ট হয়েছে বলে জানান কৃষকরা।
এ হাওরের লাখাই অংশের কৃষক ও হালুয়ারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রইছ মিয়া বলেন, “আমি ১৮ কিয়ার (৩০ শতাংশে এক কিয়ার) জমিতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে বর্গায় বোরো আবাদ করেছিলাম। এর মধ্যে মাত্র তিন কিয়ার জমির ধান কেটেছি। বাকি পাকা ধান ডুবে গেছে। এখন আর দেখা যাচ্ছে না। তাই ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছি।”

শিয়ালমারা অংশের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মো. আশরাফুল ইসলাম ছয় কিয়ার জমিতে ধান বুনেছিলেন করেছিলেন। এজন্য নিজের পোলট্রি ফার্ম থেকে টাকা বের করতে হয়েছে। ভেবেছিলেন, ধান উঠলে পোলট্রি খামার আবার সচল করবেন। কিন্তু তার আগেই সর্বনাশ হয়েছে।
আফসোস করে আশরাফুল বলেন, “ধান আর দেখা যাচ্ছে না। জমিতে এখন সাঁতার কাটার অবস্থা। যে দুই কিয়ার জমিনের ধান কেটেছিলেন রোদের অভাবে তাও নষ্ট হওয়ার পথে।”
মা, তিন বোন, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করবেন সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন আশরাফুল।
এই হাওরের একই গ্রামের আমিনা আক্তার ডুবে যাওয়া হাওরের থৈ থৈ জল দেখিয়ে বলেন, “দুই-তিন দিনের দিনের মেঘে পাকা ধান তলে মূলে নিয়া গেছে।”
এই বর্গাচাষি ১০ কিয়ারের মধ্যে পাঁচ কিয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছেন। এখন কাটা ধান ও মাড়াই করা ধান এবং খড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, দেখার হাওরে ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর জমি আবাদ হয়। এ থেকে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার ৪৪১ টন খাদ্য উৎপাদন হওয়ার কথা।
এবারের বানে এ হাওরে কী পরিমাণ জমির ক্ষতি হয়েছে তার তথ্য নেই কৃষি বিভাগের হাতে। তবে উপজেলাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদরে এক হাজার ২২৫ হেক্টর, শান্তিগঞ্জে ৭৭৫, ছাতকে ৪৫ এবং দোয়ারাবাজারে ৮১ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।
চেনার উপায় নেই ‘ছায়ার হাওর’
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর জেলার অন্যতম বড় হাওর। শাল্লা, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এলাকায়ও বিস্তৃত হাওরটি। এই হাওরে পাউবোর মতে, আবাদি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৫০৯ হেক্টর।
এ হাওরের কোয়ার অংশের কৃষক তৌফিকুল আলম বলেন, “ছায়ার হাওর এখন আর চেনার উপায় নেই। সাগরে রূপ নিয়েছে। পাকা ধানগগুলোও দুই ফুট পানির নিচে চলে গেছে। এই ধান কাটার আর কোনো সুযোগ নাই।
“আমার ১৮ কিয়ার জমির মধ্যে ১৫ কিয়ার জমিই পানির তলে চলে গেছে। তিন কিয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছিলাম। তবে শুকানোর অভাবে সেই ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

একই গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ৩০ কিয়ার জমি আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ২০ কিয়ার ডুবে গেছে। ১০ কিয়ারের ধান কাটতে পারলেও ভিজে নষ্ট হওয়ার কারণে কাটা ধানেরও ক্ষতি হবে।
একই গ্রামের কৃষক মমিন আলম ২০ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কাটতে পেরেছেন তিন কিয়ার।
তিনি বলেন, “আমাদের ডুবে যাওয়া ক্ষেত এখন আর চেনার উপায় নেই। সেখানে এখন সাঁতার কাটতেও ভয় করে।”
কাটা ধানও রক্ষা করা যাচ্ছে না ‘মাটিয়ান হাওরে’
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরে জমির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৮২৫ হেক্টর। এ হাওরের ১৬ আনার মধ্যে ৬ আনা জমির ধান তলিয়ে গেছে। বাকি যা কাটছেন শুকানোর অভাবে ভিজে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাটা ধানেরও অর্ধেক নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।
এ হাওরের শ্রীপুর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “আমি সাত কিয়ার জমি বর্গা দিয়েছিলাম। এর মধ্যে দুই কিয়ার তলিয়ে গেছে। পাঁচ কিয়ার কাটলেও এখন পচে ধান অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
পাঠাবুকা গ্রামের রিপছান হাবীব বলেন, “মাটিয়ান হাওরে থাকা আমার সাত কিয়ার জমি গত দুই দিনের বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া কাটা ধানে রোদ না থাকায় চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
“বর্তমানে একজন শ্রমিক একদিনে ১৬০০ টাকা নিচ্ছেনে। এত টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। পাউবোর বাঁধ অনেক জায়গাতে দেবে গেছে, এসব বাঁধে প্রচুর দুর্নীতি হয়েছে। গোখাদ্যের ব্যাপক সংকট পড়বে। আমাদের এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। আমাদের ধান নাই, হাওরে মাছ নেই। এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে, বিকল্প কর্মসংস্থান দরকার আমাদের।”
টাঙ্গুয়া ও শনির হাওরে চাষ কম তবুও ক্ষতি
সুনামগঞ্জের আরেকটি বড় হাওর টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি সংরক্ষিত এলাকা হওয়ায় চাষাবাদের সুযোগ নেই। তারপরও স্থানীয় কৃষকরা কিছু জমিতে চাষ করেন। তবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই হাওরের অর্ধেক জমি তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
এখন যা আছে তা কাটা হলেও শুকাতে না পারায় অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে হতাশা প্রকাশ করলেন জয়পুর গ্রামের কৃষক আহমদ কবীর।
আরেকটি বড় হাওর শনির হাওর। সেখানে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও জমি ডুবে নষ্ট হয়েছে কম। এখন ধান কাটা হলেও কাটা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে।
ধান শুকানোর ব্যবস্থা থাকলে ক্ষতি কমত বলে জানান শনির হাওরের জয়নগর গ্রামের কৃষক শামসুজ্জামান।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বৃষ্টি চলছে। তখন কিছু কাঁচা ধান নষ্ট হয়েছিল। ২৫ এপ্রিলের পর বৃষ্টিতে প্রচুর পানি বেড়ে হাওর ডুবেছে। এতে নিচের অংশের ধান ডুবেছে।
ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তথ্য নিয়ে ক্ষতির প্রতিবেদন তৈরির দাবি করে তিনি বলেন, “শুধু ডুবে গেলেই ক্ষতি হয় না। নিমজ্জিত হওয়ার পরও আমরা কয়েকদিন দেখি। তারপর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করি।”
এখন পর্যন্ত ১৮ হাজারের হেক্টর বেশি ধান তলিয়ে নষ্ট হলেও এটা আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, “আমাদের হিসাবে হাওরের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পাকা জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে, যা থেকে আর ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাকি ৪০ ভাগ জমির ধান কাটা হলেও এখন পচে, অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
তার দাবি, “কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মনগড়া ও কৃষকদের সঙ্গে প্রহসন।”
গোবিন্দ্রশ্রী হাওর: ‘মনডা ডুকরাইয়া কাইন্দ্যা ওঠে’
নেত্রকোণার এখানকার কৃষক তাদের ক্ষতির ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিশেষ করে মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি হাওরের দিকে ধানের ক্ষতি বেশি হয়েছে। আবার কলমাকান্দা, আটপাড়া উপজেলার সমতলের বিল এলাকা ও পাহাড়ি এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক।
মদন উপজেলায় অধিকাংশ হাওর হলেও তুলনামূলক কম নিচু জমিতে যারা ফসল বুনেছিলেন তাদের কেউ কেউ কিছু ফসল ভালোভাবেই তুলতে পেরেছেন, বাকি যেটুকু আছে সেটুকুও তারা তোলার আশাবাদী।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নেত্রকোণায় এবার বোরো ধান আবাদ হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমি। বাকি জমি আবাদ হয় জেলার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে।
তবে অন্যান্য জায়গার মত এখানকার কৃষকও নিজেদের ক্ষতি নিয়ে বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য অনেকাংশে কম দেখানো হচ্ছে।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের প্রান্তিক চাষি দীন ইসলাম গোবিন্দশ্রী হাওরে ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ধান কোনোমতে মাঠ থেকে কেটে ঘরে তুলেন। বাকি ধান পানির নিচে।
“আমি অন্যের ক্ষেত এক বছরের লাইগ্যা টাকা দিয়া আবাদ করছিলাম। এই জমির অর্ধেকটা কাইট্যা আনছি। বাকি আর পারি না। পানিতে তলায় গেছে। তলায় যাওয়া জমিতে ধান পাকছিল না।
“অহন সারাডা বছর কিবায় চলাম। আমরার হাওরে আমার মত চাষ করা প্রায় সবারই কমবেশি ক্ষেত পানিতে ডুবছে। হাওরডার দিকে তাহাইলে মনডা ডুকরাইয়া কাইন্দ্যা ওঠে।”
গোবিন্দ্রশ্রী হাওরে বোরো আবাদ করেছেন খালিয়াজুরী উপজেলার রসুলপুর গ্রামের মজিবুর মিয়া। তিনি সেখানে ১৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। তারও প্রায় সাত বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এই হাওরে খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর, বোয়ালি, মদনের গোবিন্দশ্রী, কদমশ্রী, পদেরকোণা, মাঘানসহ অন্তত ১৫ গ্রামের ১০ থেকে ১২ হাজার কৃষক এবার অন্তত ১৫ হাজার একর বোরো আবাদ করেন। সবারই কমবেশি জমির ধান বৃষ্টির পানির জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে। এরকম মদন ও খালিয়াজুরীর হাওরের পর হাওরে থাকা জমির বোরো ধান এ বছর বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় ডুবেছে।
চাকুয়া হাওর: ‘আমরার দুর্দশা চরমে’
খালিয়াজুরী উপজেলায় বেশ কয়েকটি হাওর আছে। এর মধ্যে চাকুয়া হাওর বেশ বড়। এখানে ফরিদপুর, চাকুয়া, রাণীচাপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের দেশ হাজারের বেশি কৃষক অন্তত ২০ হাজার একর জমিতে তাদের ফসল ফলান। সেখানকার কৃষকরাও বলছেন, তাদের অন্তত অর্ধেক ধান পানির নিচে চলে গেছে।
চাকুয়া গ্রামের দেবদাস রায় চাকুয়া হাওরে প্রায় ২০ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। তার পুরো জমিই পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলছিলেন, “আমার পুরা জমির ধানই পানি লইয়া গেছেগা। এহনও পানির নিচেই। তবু যদি শ্রমিক পাইতাম তাইলে হয়তো কিছু কাইট্যা আনলে ছয় মাস হলেও ঘরের খাওনডা চলতো। কিন্তু অহন আর কিছুই করার নাই। সবই শেষ অইয়া গেছে।”
তার গ্রামের আরেক কৃষক মলয় রায় বোরো আবাদ করেছিলেন ১৬ কাঠা জমিতে। তারও পুরো জমিই পানিতে তলিয়েছে।

তিনি বলেন, “এই হাওরের বড়জোর ৪০ পার্সেন্ট ধান কৃষকরা আনতে পারছেন। বাকি ধানের মধ্যে কিছু পানির ওপরে শীষ ভেসে আছে আর কিছু পানির নিচে আছে। এই অবস্থায় আমরার দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে।”
সমতলের বিলেও জলাবদ্ধতা
গারো পাহাড়ের পাদদেশের উপজেলা কলমাকান্দায় মেদি, চিকনমিাটিয়া, চকপাড়া, নাগডড়া ও হরিণধরা বিল অন্যতম। এসব বিলের পাশে পাঁচ থেকে সাত গ্রামের কৃষকের জমি। সবগুলো বিলেই থাকা জমির বোরো ধান কমবেশি জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে।
কলমাকান্দার স্থানীয় সাংবাদিক রীণা হায়াত বলেন, উপজেলার সব বিলেই এবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে টানা বৃষ্টির পানিতে। সব বিলেই বোরো আবাদি জমির কমবেশি তরিয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের পরে এসব এলাকার জমির ধান পাকা অবস্থায় যায়। যে কারণে বিলগুলোতে প্রায় পুরো জমিই রয়ে গেছিল। বৃষ্টির পানিতে এসব বিলের জমি তলিয়ে গেছে। কিছু কিছু পানির ওপর ভাসছে। সেগুলোও শ্রমিক সংকটে কৃষক তার ফসল ঘরে তুলতে বেগ পাচ্ছেন।
আটপাড়ার রনধলীপুরী বিল ৪০ একর জমি। সেখানেও অর্ধেকের বেশি জমির ধান পাকার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, বিলের জমির ধান এবার আর ঘরে তোলার কোনো অবস্থা নাই।
জনউদ্যোগের ফেলো জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামলেন্দু পাল বলেন, “কৃষি বিভাগ জেলায় যে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে বলছে, আসলে এর পরিমাণ আরো বেশি হবে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন হাওর, বিল পরিদর্শন করে যা দেখেছি, তাতে ২০ হাজার হেক্টরের বেশি পানিতে তলিয়েছে।
“এবার যা হয়েছে তা পুরোটাই বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা। নদীর পানি বাড়লেও তার প্রভাব পড়েনি। মূলত খাল, বিল, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। ১০ মের মধ্যে হাওরের পুরো ফসল কাটার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। হাওরসহ জেলায় এ নাগাদ মোট ২৫ শতাংশ জমির বোরো ফসল কাটা হয়েছে আর হাওরে কাটা হয়েছে ৬৭ শতাংশ।
দ্রুত বদলে যায় দৃশ্যপট
টানা বৃষ্টির কারণে কিশোরগঞ্জের মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনু, বৌলাই, মগরা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী, করাতিয়া কলকলিয়া, বৈঠাখালী, কলমারবাকসহ প্রতিটি নদীর পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। এসব নদ-নদী উপচে পানি হাওরে ঢুকছে। পানির তোড়ে একের পর এক হাওরের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।
দিন দশেক আগেও বোরো ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল হাওর এলাকার কৃষক। কিন্তু ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে দ্রুত বদলে যায় দৃশ্যপট। বর্ষণে হাওড় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় বাড়তি মজুরি দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্ষেতেই পাকা ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, এ মৌসুমে জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। জেলায় এরই মধ্যে ৫৯ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
তিন মাসের সহায়তা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় অধিশাখা) সেখ ফরিদ আহমেদ শনিবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ওই সাত জেলার (বন্যা কবলিত) জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আপনি হয়তো জানেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদেও বলেছেন তাদের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে। আগামী তিন মাস তাদের মানবিক সহায়তা বা খাদ্য সহায়তা যেখানে যা প্রয়োজন, সেটা দেওয়ার জন্য।”
তিনি বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসকদের কাছে যে বরাদ্দ ছিল, তার অতিরিক্ত কিছু বরাদ্দ দিয়েছি সিলেট ও ময়মনসিংহে। আর বাকিদের যেটা লোকালি (স্থানীয়ভাবে) ছিল, সেটা দিয়েই তারা সহায়তা দিচ্ছে।
“একটা তথ্য বিবরণী ফর্ম তাদের কাছে পাঠিয়েছি। সেটা দিয়ে তারা কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার তথ্য পাঠাবেন। এখন পর্যন্ত পেয়েছি নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে।”
তিনি বলেন, “বাকিরাও আজকের মধ্যে দিয়ে দেওয়ার কথা। হয়তো পথে আছে বা দিয়ে দিচ্ছে। কালকে (রোববার) সকালের মধ্যে সব পেয়ে যাব। পেয়ে গেলে তখন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারব যে কীভাবে কী করা যায়। আমাদেরও প্রস্তুতি আছে যে আগামী তিন মাস তাদের প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করব।”
[এই প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মাছুম কামাল, সিলেট জেলা প্রতিনিধি বাপ্পা মৈত্র, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি মারুফ আহমেদ]
আরও পড়ুন
হাওরে ফসলডুবি: যত্রতত্র বাঁধ এখন গলার কাঁটা
'খোরাকি'র আশায় কাঁচা ধানই সিদ্ধ করছে হাওরের কৃষক
'আউরে আমার সব ধান ডুবি গ্যাছে, খোরাকির বুঝও নাই'
'আউরে আমার সব ধান ডুবি গ্যাছে, খোরাকির বুঝও নাই'
'ডোবরায়' ডুবছে পাকা ধান, 'নয়নভাগাতেও' মিলছে না শ্রমিক