Published : 08 Jun 2026, 02:24 PM
ময়মনসিংহে হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে এতে সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকরা।
গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা ৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৯৬০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; যার মধ্যে বর্তমানে ১১২ জন চিকিৎসাধীন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা বলছেন, “টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।”
অভিভাবকদের উদাসীনতার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। গুরুত্বসহকারে শিশুদের টিকা দেওয়া হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেও মনে করেন এই চিকিৎসক।
অনেক শিশু শারীরিকভাবে দুর্বল থাকায় দ্বিতীয়বারও আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ‘বেশি’ শিশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসক গোলাম মাওলা বলেন, “টিকা নেওয়ার পরেও যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা শারীরিক ভাবে খুবই দুর্বল।
“এসব শিশুরা মায়ের দুধ ঠিতমত খায়নি। তবে শিশুদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।”

হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ময়মনসিংহ জেলায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ ডোজ এবং সিটি করপোরেশনে ৫৮ হাজার ৬৬৮ ডোজ।
জেলায় ১০১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশনে ১০৬ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জেলা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা.ফয়সাল আহমেদ এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.এইচকে দেবনাথ জানিয়েছেন।
এরপরও হামের সংক্রমণ কমছে না। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিন গড়ে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২৫ থেকে ৩০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে।
ভর্তি শিশুদের ৯৫ শতাংশই টিকা নেয়নি বলে হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা তথ্য দিয়েছেন।
সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার মধ্যে সদর, ত্রিশাল, ফুলপুর ও মুক্তাগাছা উপজেলাকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত তিন মাসে সদরে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৪১৬ জন শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। ত্রিশালে আক্রান্ত হয়েছে ১৩৯ জন শিশু ও মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। ফুলপুরে আক্রান্ত হয়েছে ৭৩ জন শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। মুক্তাগাছায় আক্রান্ত হয়েছে ৮৩ জন শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের।
তিনি বলছেন, “বাকি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশন এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।”
এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে।
মৃত শিশু ৬ বছর বয়সী ওই শিশু শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার বাসিন্দা। শনিবার দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার তার মৃত্যু হয় বলে হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা.ঝন্টু সরকার জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “গত ১৭ মার্চ থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৯৬০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ হাজার ৮০০ শিশু।
“গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৯ শিশু। এই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭ শিশু। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ১১২ শিশু।”
শনিবার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে ১১০ জন শিশু ও বেশ কয়েকজন বয়স্ক হামের উপসর্গে ভর্তি রয়েছেন; গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। ওষুধ সংকটের পাশাপাশি নানা দুর্ভোগের কথা জানান তারা।
হামের উপসর্গে চার বছরের ছেলে নির্বাককে নিয়ে ভর্তি রীতা ভৌমিক। সদর উপজেলার চরভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা এ নারী বলেন, “হামের টিকা দেওয়ার বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি। তাই ছেলেকে টিকা দেয়া হয়নি।

“হামে আক্রান্ত হওয়ায় গত চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। টিকা দিতে পারলে হয়তো সে আক্রান্ত হতো না।”
হামে আক্রান্ত সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামের দেড় বছরের শিশু আব্দুল্লাহ ঈদে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১ জুন ফের হামে আক্রান্ত হয়। তখন থেকে সে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি।
তার বড় চাচা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “টিকা দেওয়ার পরে সে বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এখন একটু সুস্থ রয়েছে।
“সেবা নিতে এসে ভোগান্তি কোনো ভাবেই কমছে না। এখান থেকে কিছু ওষুধ দেয়া হলেও বাহির থেকে সবগুলো কিনতে হচ্ছে।”
৫ মাসের শিশুকে নিয়ে গত চারদিন ধরে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন শেরপুরের সাজিদা আক্তার।
তিনি বলেন, “ছয় মাস না হওয়ায় শিশুকে টিকা দিতে গিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে। এখন সে হামে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
টিকা কর্মসূচিতে সাফল্যের দাবি থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দুর্বল প্রচারণার কারণে বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ।
তিনি বলেন, “গ্রামাঞ্চলে জোড়ালো প্রচার চালানোর দরকার ছিল। তা না হওয়ায় অনেকে টিকা দিতে পারেনি।
“এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এবং সিভিল সার্জন অফিসের যেমন দায় রয়েছে ঠিক তেমনি অভিভাবকরাও দায়ী।”
তবে টিকাদানে সফলতার দাবি করে সমস্যার জন্য অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ।
তিনি বলেন, “হামের টিকাপ্রদানে আমরা শতভাগ সফল। সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া ছিল। এখনও মানুষ টিকা তাদের সন্তানকে দিচ্ছে।
“তবে যারা একটু অসচেতন তাদেরই ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়েছে। এই দায় আমাদের দিলে হবে না।”
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.এইচকে দেবনাথ বলেন, “নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রার বেশি দিয়েছি।
“সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও টিকা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের প্রচারে কোনো ঘাটতি ছিল না।”