Published : 29 Jul 2025, 02:24 PM
“কি কবো বাজান? দেখতেছেন তো। কবের (বলার) আর কি আছে? ভাঙতেছে কয়দিন ধরে মেলা ভাঙতেছে। এহন আল্লাহ যে আমাগে কনে নিবি আর কোন জাগা যে আশ্রয় পাবো….আর উপায় নাই।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে বার বার গলা ধরে আসছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকার হাতেম সরদারের।
পদ্মার পানি বাড়ায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা, দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত তিন কিলোমিটার এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। ভাঙন অব্যহত থাকায় ফসলসহ জমি হারাচ্ছেন পদ্মা পাড়ের বহু কৃষক।

গত কয়েকদিনের ভাঙনে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ বিঘা কৃষি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
হঠাৎ ভাঙনের খবরে জমির মালিকরা ছুটে আসছেন ভাঙন এলাকায়। এরইমধ্যে অনেক কৃষকের পাট, পটল ও ধানসহ ফসলি জমি নদীর পেটে চলে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল, মসজিদ, ফসলি জমিসহ শতাধিক ঘরবাড়ি।
মুন্সিবাজার এলাকার বাসিন্দা বেলাল মোল্লা বলেন, “কয়েকদিন ধরে নদী ভাঙতেছে। অনেকের ধান, পাট, পটল ক্ষেত বিলিন হয়ে গেছে। এসব মানুষের হাহাকার লেগে গেছে। সরকারের লোকজনের কাছে বলা হয় কিন্তু কেউ নদী শাসনের জন্য আসে না “

বেলালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাশেম খান বলছিলেন, “এক সপ্তাহের ভাঙনে ফসলসহ ৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। অবস্থা খুবই খারাপ। খুব ভাঙতেছে এবার।
“গত বছর কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছিল বলে ভাঙে নাই। কিছু জিও ব্যাগ ফেললে হয়তো ভাঙন থামতো। দ্রুত যদি কোন পদক্ষেপ না নেয় তাহলে বাজার, মসজিদ, স্কুল কিছুই থাকবে না।”
ভাঙনের কারণে কাঁচা পাট কেটে ফেলেছেন ছোটভাকলা ইউনিয়নের বাসিন্দা আমজাদ প্রামাণিক। এখন ফলন নিয়ে দুশি্চন্তায় পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, “কাঁচা পাট কেটে ফেলায় ফলন তো কম হবে। কিন্তু কি করার আছে? না কাটলি তো সব নদীতে চলে যাবি।”

দৌলতদিয়া সাত্তার মেম্বার পাড়া এলাকার বাসিন্দা ছমেলা খাতুন বলেন, “পদ্মার ভাঙন অনেকেই বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। প্রশাসনের কেউ এখনও ভাঙন ঠেকাতে আসলো না।”
একই এলাকার কুদ্দুস ব্যাপারি বলেন, “চার বার বাড়ি ভাঙনের পর এখানে এসে বাড়ি করিছিলাম। এবারের ভাঙনে যদি এটুকুও ভেঙে যায় তাহলে কোথায় যাবো সেটা জানি না।”
আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “প্রতিবছরই নদী ভাঙে, আর কিছু বালুর বস্তা ফেলায় তারপর সারাবছর কোনো খবর থাকে না। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি বালুর বস্তা না ফেলা হলে কয়েকশ বাড়ি থাকবে না।”

ছোটভকলা ইউনিয়নের অন্তরমোড় এলাকার হুমায়ন শেখ বলেন, “এক সপ্তাহ ১০ দিন হলে নদী ভাঙতেছে। পাট, পটল আর সবজিসহ বিভিন্ন ক্ষেত পদ্মায় ভেঙে যাচ্ছে। প্রশাসনের লোকজন ঘুরে গেলেও ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়নি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদুর রহমান বলেন, “ভাঙনের তীব্রতা দেখে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাঙন রোধে মুন্সিবাজার এলাকার জন্য প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার জিওব্যাগ ফেলানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য এলাকাতেও জিও ব্যাগ ফেলানো হবে।”

রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “পদ্মার পানি বাড়ায় গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা, দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা এরইমধ্যে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি এবং পরিস্থিতি ঊদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
সোমবার থেকে দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্য এলাকাতেও ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে।”