Published : 01 Jun 2026, 06:56 PM
যারা বাংলাদেশকে পেছনে নিয়ে যেতে চায়, অন্ধকারে নিতে চায়, এই দেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র বানাতে চায়- তারাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেসের’ প্রদর্শনী হতে দেননি বলে অভিযোগ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি গোষ্ঠীর বাধার মুখে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনী দুটি জায়গায় বন্ধের প্রতিবাদে সোমবার আয়োজিত মানববন্ধনে যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে মহাসড়কের পাশে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু বৃহস্পতি ও শুক্রবার জেলার কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সিনেমাটি প্রদর্শন না করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে প্রচার চালানো হয়। এ নিয়ে অনলাইনে চলে আলোচনা-সমালোচনা।
এর পর শুক্রবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার দপ্তরে জেলা কওমী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে জেলার শীর্ষ আলেমদের নির্দেশে একটি জরুরি সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কওমী ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা ও জেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আলী আযম কাসেমী।
সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, একটি কুচক্রী মহল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইসলামবিদ্বেষী ও অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। এই প্রদর্শনী প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর রোববার ব্যক্তিগত উদ্যোগে একজন কসবা উপজেলায় একটি স্কুলের মাঠে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসন গিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই প্রতিবাদে সোমবার আয়োজিত মানবন্ধনে যোগ দেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা বলেন, “বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে ‘সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর সঙ্গীতাঙ্গন’ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা হল নাই, এখানে কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে… যারা বাংলাদেশকে পেছনে নিয়ে যেতে চায়, অন্ধকারে নিতে চায়, যারা এই দেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র বানাতে চায় তারা।
“একটা সিনেমা, যেটা একেবারে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখার মত… বনলতা এক্সপ্রেস তার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। গতকালকে আমি এই সিনেমাটি দেখেছি, এটি চমৎকার একটি সিনেমা। সেই সিনেমাটি কেন বন্ধ করে দেওয়া হল? আমি যদি প্রশ্ন করি যেই রাষ্ট্র ছয় বছরের শিশুদের ধর্ষণ ও বলাৎকারের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না, যেই রাষ্ট্রে প্রতিদিন দুজনের ওপরে মানুষ খুন হয়, যেই রাষ্ট্রে দুর্নীতি, দুঃশাসন, টাকাপাচার, ব্যাংক লুট, খুন কোন রকম কোনো অন্যায় বন্ধ করতে পারে নাই। সেই রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধের মদদ দেয়?”
গত দুই বছরে দেশে ‘ডানপন্থি উগ্রপন্থার’ উত্থান ঘটেছে দাবি করে রুমিন বলেন, “আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে। কবর থেকে তুলে নিয়ে লাশ পোড়ানো হয়েছে, আমরা দেখেছি ‘দক্ষিণপন্থা বা ডানপন্থার উগ্রবাদের’ উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মাটি তো এমন ছিল না। এই দেশের মাটিতে আমরা যেমন আযানের সুমধুর ধ্বনি শুনেছি, আমরা বাউল গানও শুনেছি। সকালবেলা যেমন কোরআন তেলাওয়াত শুনেছি, আবার বিকেলে হারমোনিয়াম নিয়ে ছোট ছোট শিশুদের গান শেখার বিষয়টাও দেখেছি। তাহলে কারা এই বাংলাদেশকে মৌলবাদের ভূমি বানাতে চায়?

“যেই রাষ্ট্রে ধর্মচর্চার পাশাপাশি সব রকমের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলেছে; সেই রাষ্ট্র সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার মদদ দিচ্ছে। আমি দাবি জানাব, অবিলম্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সবরকমের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেন নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে চলতে পারে সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। প্রশাসনের কাছে আমার আবেদন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ এই পরিচয় আপনারা কোনো গোষ্ঠীকে মুছে ফেলতে দেবেন না।”
রুমিন বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের নয়, বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষের জনযুদ্ধ ছিল। একইভাবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বলেন বা আন্দোলন বলেন সেটিতেও দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। যারা কোনো গণআন্দোলনকে, জনতার আন্দোলনকে কুক্ষিগত করতে চায়, তার পরিণতি অতীতেও ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও ভালো হবে না।”
বিগত নির্বাচনে রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া- ২ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে বিজয়ী হন। তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জুনায়েদ আল হাবীবকে ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।