উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
Published : 05 Jun 2026, 09:25 AM
কেমন আছে দলের সবাই? এই প্রশ্নের উত্তর এতদিন দিতে গিয়ে দলের কোচিং স্টাফ বা কর্মকর্তাদের কণ্ঠে ফুটে উঠছিল হতাশা। কথাও বলতে চাননি অনেকে। কিন্তু নেপাল ম্যাচের পর বদলে গেছে দলের আবহ। নানা প্রতিকূলতা আর দুঃসবাদে যে গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল দলে, সেটাও অনেকটা গেছে কেটে। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলকে এখন সুখী পরিবার বলাই যায়!
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকে পিছু নিয়েছিল নানা অস্বস্তি। শুরুটা হয়েছিল আফঈদা খন্দকারের অধিনায়কত্ব হারানো নিয়ে। তরুণ এই ডিফেন্ডারের হাত ধরে প্রথমবার উইমেন’স এশিয়ান কাপ ও অনূর্ধ্ব-২০ উইমেন’স এশিয়ান কাপে খেলার ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। গত মার্চে তার নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপে খেলে দল। সেই আফঈদা অধিনায়কত্ব হারানোয় দলের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞ ও তরুণদের মধ্যে তৈরি করেছিল কিছুটা দুরত্বও।
ভারতের গোয়ায় উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মারিয়া মান্দার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের শুরুটা অবশ্য হয়েছিল হাসিমুখে। দলীয় পারফরম্যান্স সাদামাটা হলেও, মালদ্বীপের বিপক্ষে ৪-২ গোলে জিতেছিল দল। দলের মধ্যে ঐক্যের সুর না বাজলেও, ওই এক জয়ে সেমি-ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এরপর থেকেই মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা শুরু হলো।
বাজে খেলে ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। তাতে সাফের আঙিনায় দলের টানা ১০ ম্যাচের অজেয় যাত্রাও থামে। ওই ম্যাচে মারিয়া, মনিকাদের পারফরম্যান্সের তীর্যক সমালোচনা করেছিলেন কোচ পিটার জেমস বাটলার।
কোচের প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরম করার উপলক্ষ হয়ে এলো নেপালের বিপক্ষে সেমি-ফাইনাল। কিন্তু ম্যাচের আগের দিন ডিফেন্ডার শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুর খবর নাড়িয়ে দেয় পুরো দলকে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত দল কোনো অনুশীলন ছাড়াই নামে নেপালের বিপক্ষে। শুরুটাও হয় নড়বড়ে; কিন্তু শোককে শক্তিতে রুপান্তরের দুর্নিবার আকাঙ্খা শেষ পর্যন্ত জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয় বাংলাদেশকেই!
নেপালের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে পাওয়া ২-১ গোলের জয় যেন আমুল বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ দলকে। বৃহস্পতিবার ছিল রিকভারি। কোনো অফিসিয়াল মিডিয়া সেশনও ছিল না। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য দলের দরজা ছিল বন্ধ। কিন্তু খবর কী আর আটকে রাখা যায়?
দলীয় সুত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছে, গুমোট আঁধারটুকু কেটে গেছে দলের আকাশ থেকে। এখন বইছে স্বস্তির সুবাতাস। প্রিয়জন হারানোর শোক কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠেছেন শিউলি। না ফেরার দেশে পাড়ি জমানো তার মা’কে সতীর্থরা নেপাল ম্যাচের জয় উৎসর্গ করায় তিনি কৃতজ্ঞতার বাঁধনে বেঁধেছেন সতীর্থদের।
শোক যদিও এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি দল, তবে স্তব্ধতা এখন আর নেই আগের মতো। কিছুটা গল্পও হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। সেখানে ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে কথাও হচ্ছে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে। দল বেঁধে আইস বাথ নিতে গিয়ে কিংবা টিম মিটিংয়ের সময় সবাই অংশ নিয়েছেন হাসিমুখে।
কোচ বাটলারের মুখেও ফিরেছে হাসি। পেশাদার মানসিকতাকে সর্বাগ্রে রাখা এই ইংলশ কোচও আবেগাক্রান্ত হয়েছিলেন শিউলির মায়ের মৃত্যুর খবরে। দুটি সাফ জয়ী এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারকে গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচে খেলাননি বাটলার। এর কারণ ছিল শিউলির বুকে ব্যথা। নেপাল ম্যাচের আগের দুঃসংবাদে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত শিষ্যকে তিনি বসিয়ে রাখেন বেঞ্চে।
শেষের বাঁশি বাজার পর বেঞ্চ থেকে ছুটে গিয়ে আনন্দ অশ্রুতে জয়ী সতীর্থদের বরণ করে নিয়েছিলেন শিউলি। এই দৃশ্য নাড়িয়ে দিয়েছিল বাটলারকে। বিগত ম্যাচগুলোর বিবর্ণতা কাটিয়ে অধিনায়কত্ব হারানো আফঈদার স্বরূপে ফেরার ইঙ্গিতও কোচকে দিয়েছে স্বস্তি।
দলীয় সুত্রের খবর, মাঠের অনুশীলন না থাকায় এদিন খেলোয়াড়দের অনেকের সাথে আলাদা আলাদা কথা বলেছেন বাটলার। আগামী শনিবার ভারতের বিপক্ষে শিরোপা লড়াইয়ের জন্য দলকে তিনি তৈরি করছেন পেশাদার নির্দেশনা ও আবেগ মিশ্রিত পরামর্শের মিথস্ক্রিয়ায়।
হ্যাটট্রিক শিরোপা স্বপ্ন পূরণ থেকে যে এক ধাপ দূরে দল। মারিয়ার হাত ধরে, সেই চূড়ায় বাংলাদেশ পা রাখতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে স্বস্তির খবর, নানা প্রতিকূলতা আর বাধা এক ছাতার নিচে এনে দিয়েছে মারিয়া, আফঈদা, সাগরিকাদের। সবাই এখন উন্মুখ, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।