Published : 05 Jun 2026, 09:11 AM
চিলিতে ১৯৬২ সালের ৩০ মে থেকে ১৭ জুন বসে বিশ্বকাপের সপ্তম আসর। বাছাই পর্ব শুরু হয় দুই বছর আগে, অংশ নেয় ৫৭টি দল। সরাসরি খেলার সুযোগ পায় স্বাগতিক চিলি ও শিরোপাধারী ব্রাজিল। বাছাই পেরিয়ে আসে বাকি ১৪ দল।
চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখে ব্রাজিল। মাত্র দ্বিতীয় দেশ হিসেবে টানা দুটি আসরে শিরোপা জেতে তারা। ওই আসরের পর আর কোনো দেশ টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
চিলির আয়োজক হওয়া বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল। এক যুগ পর বিশ্বকাপ ফেরে লাতিন আমেরিকায়। আয়োজক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। তবে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতায় শেষ পর্যন্ত আয়োজনের সুযোগ পায় চিলি।
আফ্রিকা ও এশিয়ান কয়েকটি দেশ বাছাই পর্বে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্ব খেলে কেবল ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোই। ইউরোপের দেশগুলোর বিপক্ষে বাড়তি ম্যাচ খেলতে হওয়ায় পেরে ওঠেনি আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো।
১৯৭০ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারেনি আফ্রিকার কোনো দেশ। শেষ পর্যন্ত এই মহাদেশকে একটি স্থানের নিশ্চয়তা দেয় ফিফা, তাতে আফ্রিকার দেশ ফেরে বিশ্ব মঞ্চে।
নক আউট পর্বের ম্যাচে ড্র হলে রিপ্লে ম্যাচের যে নিয়ম ছিল, সেটি বাতিল হয় এই আসরে। সমান পয়েন্টের দলগুলোকে আলাদা করতে গোল পার্থক্যের নিয়ম চালু হয়।
কম গোল হজম করা দল এতে সুবিধা পায়। দলগুলোর রক্ষণাত্মক কৌশল নেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে নতুন এই নিয়ম। আসরে ম্যাচপ্রতি গোল হয় ২.৭৮টি। প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপে গোল গড় তিনের নিচে নামে। এরপর আর তিন স্পর্শ করেনি কোনো আসরে।
আটটি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে ১৯৬০ সালে ভালদিভায় ৯.৫ মাত্রার মারাত্মক ভূমিকম্পে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়েই শঙ্কা জাগে। শেষ পর্যন্ত খেলা হয় চারটি স্টেডিয়ামে।
বিশ্বকাপে ছিল ফাউলের ছড়াছড়ি। সেই সময়ের রেকর্ড ছয় জন দেখেন লাল কার্ড।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে সব দেশ-
ইউরোপ: বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পশ্চিম জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্পেন, ইতালি, হাঙ্গেরি, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও যুগোস্লাভিয়া
উত্তর আমেরিকা: মেক্সিকো
দক্ষিণ আমেরিকা: চিলি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, উরুগুয়ে
এই আসর দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক ঘটে কলম্বিয়া ও বুলগেরিয়ার
১৬ দল চারটি গ্রুপে খেলে। গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ১: সোভিয়েত ইউনিয়ন, উরুগুয়ে, যুগোস্লাভিয়া, কলম্বিয়া
গ্রুপ ২: পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, চিলি, সুইজারল্যান্ড
গ্রুপ ৩: ব্রাজিল, চেকোস্লোভাকিয়া, স্পেন, মেক্সিকো
গ্রুপ ৪: হাঙ্গেরি, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, বুলগেরিয়া
গ্রুপ পর্ব
চারটি গ্রুপে চারটি করে দল অংশ নেয়। গ্রুপের প্রতিটি দল রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলে পরস্পরের বিপক্ষে। সেরা দুটি করে দল যায় কোয়ার্টার-ফাইনালে।
গ্রুপ ১ থেকে পরের ধাপে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়া। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই জয়ে চার পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় যুগোস্লাভিয়া।
এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় উরুগুয়ে। কলম্বিয়ার অর্জন ড্র থেকে ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ২ থেকে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় পশ্চিম জার্মানি ও চিলি। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পশ্চিম জার্মানি। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ চিলি।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ইতালি। তিন হারে শূন্য হাতে ফেরে সুইজারল্যান্ড।
২ জুন, ১৯৬২। এদিন স্বাগতিক চিলির মুখোমুখি হয় সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি। ইতিহাসের পাতায় ম্যাচটি ঠাঁই করে নিয়েছে ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে। আক্ষরিক অর্থেই যেন মাঠে যুদ্ধ হয় সেদিন। দুই দলের খেলোয়াড়রা বারবার জড়িয়ে পড়েন সংঘর্ষে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, ফুটবলারদের শান্ত করতে তিনবার মাঠে পুলিশ প্রবেশ করে! ফুটবল ইতিহাসে যার নজির খুব বিরল।
গ্রুপ ৩ থেকে নক আউট পর্বে যায় ব্রাজিল ও চেকোস্লোভাকিয়া। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় শিরোপাধারী ব্রাজিল। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় চেকোস্লোভাকিয়া।
একটি করে জয়ে ২ পয়েন্ট করে পায় মেক্সিকো ও স্পেন। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে তৃতীয় হয় মেক্সিকো।
গ্রুপ ৪ থেকে পরের ধাপে যায় হাঙ্গেরি ও ইংল্যান্ড। দুটি জয় ও একটি ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় হাঙ্গেরি।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট করে পায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থাকায় কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় ইংল্যান্ড, বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। এক ড্রয়ে বুলগেরিয়ার অর্জন ১ পয়েন্ট। আসরের একমাত্র হ্যাটট্রিক হয় এই দলের বিপক্ষেই; ৬-১ গোলে জয়ের ম্যাচে সেটা করেন হাঙ্গেরির ফ্লোহিয়ান আলবের্ত।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
১০ জুন চার মাঠে হয় চারটি কোয়ার্টার-ফাইনাল। শেষ আটের লাইনআপ ছিল এমন: ব্রাজিল-ইংল্যান্ড, চিলি-সোভিয়েত ইউনিয়ন, পশ্চিম জার্মানি- যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরি- চেকোস্লোভাকিয়া।
ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমি-ফাইনালে পৌঁছায় ব্রাজিল। তৎকালীন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারিয়ে তাদের সঙ্গী হয় চিলি।
‘অল ইউরোপিয়ান’ দুটি কোয়ার্টার-ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ১-০ গোলে হারায় চেকোস্লোভাকিয়া। একই ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয় পায় যুগোস্লাভিয়া।
সেমি-ফাইনাল
১৩ জুন হয় দুটি সেমি-ফাইনাল। ভিনা দেল মারে ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে যুগোস্লাভিয়াকে ৩-১ গোলে হারায় চেকোস্লোভাকিয়া। জোড়া গোল করেন এডলফ শিয়েরার, অন্যটি ইউসেফ কাদ্রাবা। যুগোস্লাভিয়ার একমাত্র গোলটি করে দ্রাজান জেরকোভিচ।
সান্তিয়াগোতে অন্য সেমি-ফাইনালে চিলিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফাইনালে যায় ব্রাজিল। জোড়া গোল করেন গারিঞ্চা ও ভাভা। স্বাগতিকদের গোল দুটি করে হোর্হে লুইস তোরো ও লিওনেল সানচেস।
এই ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন গারিঞ্চা। ফাইনালে তার খেলার কথা ছিল না। কিন্তু ফিফার মাধ্যমে তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় ব্রাজিল। সেমি-ফাইনালে লাল কার্ড দেখার পরও, ফাইনালে খেলতে পারা প্রথম খেলোয়াড় গারিঞ্চা।
২৬ জুন তৃতীয় স্থান নির্ধারনী ম্যাচে এলাদিও আলবের্তো রোহাস দিয়াসের একমাত্র গোলে যুগোস্লাভিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় চিলি। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে যা তাদের সেরা অর্জন।
ফাইনাল
১৭ জুন, ১৯৬২। প্রায় ৬৯ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে সান্তিয়াগোর স্তাদিও নাসিওনালে শুরু হয় ব্রাজিল ও চেকোস্লোভাকিয়ার শিরোপা লড়াই। এই আসরেই প্রথমবার শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খেলে আগে ফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দুটি দল। এর আগের প্রতিটি আসরের ফাইনালে অন্তত একটি দল ছিল নতুন।
পিছিয়ে পড়ার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে শিরোপা ধরে রাখে ব্রাজিল। ফাইনালে জেতে ৩-১ গোলে।
ফাইনালে ব্রাজিলের হয়ে একটি করে গোল করেন আমারিলদো, জিতো ও ভাভা। পঞ্চদশ মিনিটে চেকোস্লোভাকিয়াকে এগিয়ে নিয়েছিলেন ইউসেফ মাসোপুস্ত।
দ্বিতীয় দল হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি গড়ে ব্রাজিল। তৃতীয় দল হিসেবে জেতে দুটি শিরোপা।
এক নজরে সপ্তম বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: চিলি
চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল
রানার্সআপ: চেকোস্লোভাকিয়া
মোট ম্যাচ: ৩২
মোট গোল: ৮৯
গোল গড়: ২.৭৮
সর্বোচ্চ গোল: ফ্লোহিয়ান আলবের্ত (হাঙ্গেরি), গারিঞ্চা (ব্রাজিল), ভালেন্তিন ইভানভ (সোভিয়েত ইউনিয়ন), দ্রাজান জেরকোভিচ (যুগোস্লোভিয়া), লিওনেল সানচেস (চিলি), ভাভা (ব্রাজিল) [সবাই ৪ টি করে গোল]
সেরা খেলোয়াড়: গারিঞ্চা (ব্রাজিল) [আন অফিসিয়াল]