২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 05 Jun 2026, 08:24 AM
কেউ পায়ের কারিকুরিতে, কেউ বা গতিতে, কেউ আবার এই দুইয়ের মিশেলে কিংবা কেউ রক্ষণে দুর্দান্ত কার্যকারিতায় তারুণ্যেই ঝলক দেখিয়ে চলেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই উঠে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। ক্লাব ফুটবলে ইতোমধ্যে তারা প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরাতে পেরেছেন, জাতীয় দলেও দিয়েছেন দুর্দান্ত কিছু করে দেখানোর আভাস। সেই সম্ভাবনাকেই এবার পূর্ণতা দেওয়ার পালা, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ- বিশ্বকাপে।
উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ সামনে রেখে প্রতিভাধর তরুণ তারকাদের নিয়ে ফিফার বিশেষ আয়োজন বিশ্বকাপের বিস্ময়বালক। এই পর্বে আছেন ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড এন্দ্রিক।
জন্ম তারিখ: ২১ জুলাই, ২০০৬
দল: ব্রাজিল ও রেয়াল মাদ্রিদ
আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক: ১৬ নভেম্বর ২০২৩, কলম্বিয়ার বিপক্ষে (১৭ বছর বয়সে)
পজিশন: সেন্টার ফরোয়ার্ড
বিশেষ দক্ষতা: গোল করার সামর্থ্য, শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা ও বহুমুখিতা
কেন বিশ্বকাপের সেনসেশন হয়ে উঠতে পারেন এন্দ্রিক?
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বলে ওঠার বিশেষ প্রতিভা আছে এন্দ্রিকের। আর এই সামর্থ্যই তাকে অল্প বয়সে ব্রাজিলের মতো দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সেলেসাওদের হয়ে অভিষেকের কিছুদিন আগে, ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ এক পারফরম্যান্স করে বড় মঞ্চের জন্য নিজেকে প্রস্তুত প্রমাণ করেন তিনি।
ওই সময় ব্রাজিলের ক্লাব পালমেইরাসে খেলতেন এন্দ্রিক। ব্রাজিলিয়ান সেরি আয় তখন শীর্ষে থাকা বতাফোগোর বিপক্ষে প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল পালমেইরাস। দ্বিতীয়ার্ধে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এন্দ্রিক। চমৎকার পারফরম্যান্সে জোড়া গোল করে দলের ৪-৩ গোলের অবিশ্বাস্য জয়ে অবদান রেখেছিলেন তিনি। সেই জয় পালমেইরাসকে কেবল তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, শেষ পর্যন্ত ক্লাবটির লিগ শিরোপা জেতায় রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ওই ম্যাচের চার দিন পর বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে কলম্বিয়া ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াইয়ের দলে ডাক পান এন্দ্রিক। পরে ১৭ বছর ১১৮ দিন বয়সে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় তার। ব্রাজিলের জার্সিতে তার চেয়ে কম বয়সে অভিষেক হয়েছিল কেবল তিনজনের- কিংবদন্তি পেলে (১৬ বছর ২৫৭ দিন), জোনাস এদুয়ার্দো আমেরিকো (১৬ বছর ৩০৩ দিন) ও ফিলিপে কৌতিনিয়ো (১৭ বছর ২৮ দিন)।
আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রথম দুই ম্যাচে গোল না পাওয়া এন্দ্রিক পরের তিন ম্যাচেই পান জালের দেখা। ২০২৪ সালের মার্চে ইংল্যান্ডেকে হারানোর পথে একমাত্র গোলটি করেন তিনি। পরে স্পেনের বিপক্ষে ৩-৩ সমতায় শেষ হওয়া লড়াইয়েও একবার জালে বল পাঠান এই ফুটবলার। ওই ম্যাচে খেলেছিলেন স্প্যানিশ তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালও।
ওই বছরের জুনে মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারানোর ম্যাচে যোগ করা সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন এন্দ্রিক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পালমেইরাস থেকে রেয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন তিনি। রেয়াল ভাইয়াদলিদের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে বদলি হিসেবে অল্প সময়ের জন্য মাঠে নেমেই পেয়ে যান গোল। ১৮ বছর ৩৫ দিন বয়সে গোলটি করে দারুণ এক কীর্তিও গড়েন এন্দ্রিক। লা লিগায় রেয়ালের ইতিহাসে বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা তিনি।
ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আরও বড় মঞ্চে জালের দেখা পান এন্দ্রিক। স্টুটগার্টের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে জালে বল পাঠিয়ে রেয়ালের জার্সিতে এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি, ভেঙে দেন ১৯৯৫ সালে রাউল গন্সালেসের গড়া রেকর্ড।
রেয়ালে নিজের প্রথম মৌসুমে কার্লো আনচেলত্তিকে কোচ হিসেবে পেয়েছিলেন এন্দ্রিক। এই ইতালিয়ানের কোচিংয়ে সেবার কোপা দেল রেতে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি। ইউরোপের সফলতম ক্লাবটিতে দারুণ শুরুর পর চোটের থাবায় বদলে যায় তার সবকিছু। পুরোপুরি ফিট হয়ে ফেরার পরও ম্যাচ খেলার পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছিলেন না তিনি।
মনে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন নিয়ে, ছয় মাসের জন্য ধারে লিওঁতে পাড়ি জমান এন্দ্রিক। সেখানে গিয়েই প্রভাব ফেলেন তিনি। ফরাসি ক্লাবটিতে সংক্ষিপ্ত সময়ে ২১ ম্যাচে ৮টি করে গোল ও অ্যাসিস্ট করে জয় করে নেন সমর্থকদের মন।
ওই পারফরম্যান্সে ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তির মনও জয় করে নেন এন্দ্রিক। তাকে নিয়েই বিশ্বকাপের দল গঠন করেন অভিজ্ঞ কোচ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১৬ ম্যাচে তিনটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করা এন্দ্রিকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ।
কোচ ও সাবেকদের চোখে এন্দ্রিক
“সে অসাধারণ একজন ফুটবলার। তার সম্ভাবনার কোনো সীমা নেই। আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিল ফুটবলের বড় তারকা হতে যাচ্ছে এন্দ্রিক।”
- কার্লো আনচেলত্তি, ব্রাজিল কোচ
“এন্দ্রিকের সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয়, তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর। তখনকার মতো এখনও তার স্বপ্নগুলো একই আছে; ফুটবল খেলাটা উপভোগ করা এবং বড় কিছু অর্জন করা। সে দিনকে দিন আরও উন্নতি করছে।”
- ভিনিসিউস জুনিয়র, ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড
“সে সহজাত প্রতিভার একজন ফরোয়ার্ড, রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলতে খেলতে সে আরও শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে।”
- রোনালদো, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা
“সে অনেক জোরে শট নেয়। যখন সে গোল করে, সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। অসাধারণ মানসম্পন্ন একজন খেলোয়াড় সে।”
- থিবো কোর্তোয়া, বেলজিয়াম ও রেয়াল মাদ্রিদের তারকা গোলরক্ষক
“সে দুর্দান্ত ফর্মে আছে…বয়সের তুলনায় অসাধারণ খেলোয়াড় সে। তার মধ্যে সব গুণই রয়েছে; সে গতিময়, শক্তিশালী, দক্ষ, ফ্রি-কিকে ভীতি ছড়াতে পারে এবং হেডেও ভালো। সে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে সে নির্ভীক ফুটবল খেলে; এই জার্সির চাপ সে অনুভব করে না।”
- কাফু, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক
এন্দ্রিকের সম্ভাব্য বিশ্বকাপ অভিযান
৪৮ দলের বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে পড়েছে ব্রাজিল। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড।
আগামী ১৪ জুন নিউ ইয়র্কে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করবে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ফিলাডেলফিয়ায় ২০ জুন হাইতির মুখোমুখি হবে তারা। আর গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড, ২৫ জুন ম্যাচটি হবে মায়ামিতে।