Published : 08 Jun 2026, 09:34 PM
টানা বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা আর বাঁধ ভেঙে সিলেট বিভাগের চার জেলায় প্রায় হাজার কোটি টাকার বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার ঘোষণা দেয় সরকার। তবে বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে দাবি কৃষকদের।
এর মধ্যে কৃষকদের জন্য সরকারের মানবিক সহায়তার তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে যেসব এলাকার তালিকায় অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো সংশোধন করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছে জেলা প্রশাসন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারের মানবিক সহায়তার তালিকায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছেন সুনামগঞ্জের কৃষকরা।
সোমবার সকালে শাল্লা উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল করেন বঞ্চিতরা। একই অভিযোগে বৃহস্পতিবার ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নে সহায়তার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা।
কৃষকদের দাবি, হাওরে বোরো ধানের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের থেকেও বেশি। আর একমাত্র ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বছরের খাদ্য নিরাপত্তা ও সংসারের ব্যয় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। অনেক কৃষক এখন কর্মহীন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, বিভাগের চার জেলায় বোরো ফসলের ৯৯৭ কোটি ৮২ লাখ ৮২ হাজার ২০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা এক লাখ ৮৩ হাজার ৫৯০ জন; আর জমির পরিমাণ ৫৮ হাজার ৬৪৩ হেক্টর। সবচেয়ে বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলায়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওড়পাড়ের পাঠাবুকা গ্রামের বাসিন্দা রিপছান হাবীবের মাটিয়ান হাওরে থাকা সাত কিয়ার (এক কিয়ার সমান ৩৩ শতাংশ) জমি দুই দিনের বৃষ্টির তলিয়ে যায়। এ ছাড়া রোদ না থাকায় কাটা ধানের চারা গজিয়ে নষ্ট হয়।
হাবীবের ভাষ্য, “এ বছর হাওরে ধান নেই, মাছও নেই। মানুষ কষ্টে আছে, অবস্থা ভালো না। আমাদের এলাকার অনেকে কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। হাওর এলাকার ৭০ ভাগ কৃষক পরিবার অন্যের জামি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেন।

“এই পরিবারগুলো ধার-দেনা অথবা বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা তুলে ধান চাষের খরচ মেটান। এর মধ্যে কেউ কেউ সুদে টাকা নিয়ে জমি চাষ করেন। তারা বৈশাখে ধান ওঠার পর তা বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু এবার বেশিরভাগ কৃষক ধান কাটতে পারেনেনি। পরিবারগুলো খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, কোনো কাজ না পেয়ে অনেকে বাড়িতে বেকার বসে আছেন।”
শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের বর্গাচাষি কৃষক শান্ত দাস বলেন, “আমি অনেক কষ্ট করে চার কিয়ার জমি চাষ করেছিলাম। সব পানির নিচে। উপায় না পেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের গাজীপুর পাঠিয়ে দিয়েছি। শুধু আমি বাড়িতে আছি।
“আমার তিনটা গরু আছে, তাও ব্র্যাক থেকে ঋণ নিয়ে কিনেছিলাম। এখন ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় আমার নাম নেই। নিজে খাব কি আর গরুকে কি খেতে দেব, এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।”
খাদ্যবান্ধব কিংবা টিসিবি সরকারি কোনও সুবিধাই পাননি বলে জানান এই বর্গাচাষি। তার মত অনেকেই কষ্টে দিন পার করছেন।
সরকারের সহায়তার তালিকায় নাম নেই জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দিরাই উপজেলার পূর্ব চণ্ডিপুরের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমাদের দুই ভাইয়ের ৬০ কিয়ার জমি পানিতে তলিয়েছিল। এক কিয়ার জমির ধানও কাটতে পারিনি। কিন্তু সহায়তার তালিকায় আমার নাম নেই।
“আমি প্রকৃত হয়েও সহায়তা পাচ্ছি না। আমরা ছয় ভাই আলাদা থাকি, আমার এক ভাইয়ের নাম আছে শুধু। প্রকৃত কৃষককে সহায়তা দিতে হলে আমার নাম থাকবে না কেন? জানতে চাইলে, বলা হয়েছে, এক ভাই পাবে। এটা কেমন কথা।”
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা মাসুক মিয়া বলেন, “ধারদেনা করে জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে ধান কাটতে পারিনি; যা কিছু কেটে ছিলাম তাও রোদ না থাকায় চারা গজিয়েছে নষ্ট হয়েছে।
“গবাদি পশুর খাবার না থাকায় কম দামে বেচতে হয়েছে। জমির ধান বিক্রি করে ধারদেনা ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতাম। কিন্তু এখন ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে, কীভাবে যে সামনের দিনগুলো কাটবে তা বুঝতেছি না।”

সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সিলেট জেলায় চার হাজার ২৩৫ জন কৃষকের ৫৯০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে ডুবে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। আর এ জেলায় চালের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ৩৩৬ টন।
মৌলভীবাজার জেলায় ২৭ হাজার ৪৬৩ জন কৃষকের চার হাজার ২০৬ হেক্টর জামির ধান পানিতে তলিতে গিয়ে ৮২ কোটি ৮৫ লাখ ৬১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। চালের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে ১৬ হাজার ৯০৯ টন।
হবিগঞ্জ জেলায় ২২ হাজার ৩৩৩ জন কৃষকের ১০ হাজার ৯৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে ২১০ কোটি ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। চালের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৩ হাজার ১২১ টন।
সুনামগঞ্জ জেলায় এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন কৃষকের ৪৩ হাজার ৭৪৭ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে ডুবে ৬৯২ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০১ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চালের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ ৪১ হাজার ৩৯৭ টন।
সহায়তার তালিকায় অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন বা ফসলহানির শিকার হননি এমন ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় বিএনপির নেতা এবং তাদের স্বজনদের নামও রয়েছে।
এদিন সকাল ১০টায় শাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হবিবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার সুব্রত সরকার বলেন, “তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে।
“তালিকায় সরকারি চাকরিজীবী, অকৃষক, সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, প্রভাবশালী, একই পরিবারের একাধিক নাম ও ঢাকায় অবস্থান করে এমন ব্যক্তিদের নামও আছে। একটি ওয়ার্ডে পরিবারের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। হাতেগোনা কয়েকজন বাদে সবাই কৃষক।”

তিনি বলেন, তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০। এখানেও অনিয়ম করা হয়েছে। এসব অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে প্রতিবাদ স্বরূপ বিক্ষোভ মিছিল করেছেন তারা।
প্রতিটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে তালিকা সংশোধন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের দাবি জানান সুব্রত সরকার।
হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস সাংবাদিকদের বলেন, “তালিকায় অনিয়ম হলে সংশোধন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলেছি। যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের মতামতের ভিত্তিতে ৮৮টি নাম স্থগিত করা করা হয়েছে।”
ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নে বিক্ষোভ চলাকালে পাইকুরাটি গ্রামের বাসিন্দা নয়ন মনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য এসেছেন তিনি। তালিকায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়-স্বজনের নাম। নিজেদের লোকজনকে দিলে প্রকৃত কৃষক কোথায় যাবে বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, “আমার ৪০ কাঠা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিন্তু তালিকায় আমার নাম নেই। কেন নেই, তার কোনও উত্তর পাইনি।”
মানবিক সহায়তার তালিকায় অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি অভিযোগের বিষয়ে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, “তালিকায় যেসব নামে অভিযোগ আছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে।
“তিনটি ওয়ার্ডে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনও অভিযোগ ওঠেনি। যে ওয়ার্ডে অভিযোগ থাকবে সেখানে সহায়তা দেওয়া হবে না, সংশোধনের পর দেওয়া হবে।”
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “কৃষকরা এসেছিলেন, তারা মৌখিকভাবে বলেছেন। সহায়তার তালিকায় কোনো অভিযোগ থাকলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কৃষকদের মানবিক সহায়তার তালিকা নিয়ে যেসব এলাকায় অভিযোগ উঠছে সেখানকার ইউএনওকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।