Published : 16 Feb 2026, 10:00 PM
শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ‘মাছ চুরির’ অপবাদ দিয়ে যুবককে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক ঘের মালিকের বিরুদ্ধে। নির্যাতনে যুবকের ডান পা ভেঙে গেছে এবং চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে।
রোববার সকালে ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ইকুরি এলাকায় শাহীন মাদবরের মাছের ঘেরে এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। শাহীন শরীয়তপুর পৌরসভা যুবদলের সহ-সভাপতি।
তবে তার পদ-পদবী নেই বলে দাবি জেলা যুবদল নেতাদের।
নির্যাতনের শিকার হওয়া ৩০ বছর বয়সী সেলিম পাইককে আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্তাবধায়ক হাবিবুর রহমান।
তিনি বলেন, সেলিম পাইককে অজ্ঞাতনামা লোকজন হাসপাতালে ভর্তি করে চলে যায়। তাকে মাছ চুরির অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে ডান পা ভেঙে দিয়েছে। এবং চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অনেক আঘাত রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সেলিম পাইককে নির্যাতনের একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সেলিমের হাত রশি দিয়ে বেঁধে নিচে ফেলা রাখা হয়েছে। মাছের ঘেরের মালিক শাহিন মাদবর মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে সেলিমের দুই পায়ে সজোরে পিটাচ্ছেন। আর তিন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন। এ সময় সেলিম চিৎকার করে কাতর আর্জি জানাচ্ছেন।
৪৩ সেকেন্ডের অপর ভিডিওতে দেখা যায়, নির্যাতনের একপর্যায়ে সেলিমের ডান পা ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পান। সেলিম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আর্তচিৎকার করতে থাকে। এ সময় তার চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, রোববার সকালে শাহীন মাদবরের মাছের ঘেরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সেলিম পাইক। এ সময় ঘেরের কর্মচারীরা তাকে ‘মাছ চোর’ সন্দেহে ধাওয়া করে ধরে ফেলে।
প্রথমে তাকে পানিতে চুবিয়ে পাড়ে আনা হয় এবং সেখানে এক দফা মারধর করা হয়। পরবর্তীতে ঘেরের মালিক শাহীন মাদবর ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেলিমের হাত বেঁধে মাটিতে ফেলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তাকে পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে।
পরে স্থানীয়দের চাপের মুখে অভিযুক্তরা তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
আহত সেলিম পাইক বলেন, তিনি মাছ চুরির বিষয়ে কিছুই জানেন না।
তিনি অভিযোগ করেন, “চা দোকান থেকে জোর করে ধরে নিয়ে কয়েক দফা পিটিয়ে আমার ডান পা ভেঙে দিয়েছে ও চোখ নষ্ট করে দিয়েছে যুবদল নেতা শাহীন মাদবর ও তার লোকজন। বিষয়টি সাংবাদিক ও প্রশাসনকে জানালে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে তারা।”
সেলিমের ভাই জয়নাল আবেদীন বলেন, তার ভাই কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সে যদি চুরি করত তবে তার কাছে মাছ পাওয়া যেত। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঘের মালিক শাহীন মাদবরের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ বলেন, “শাহীন বিভিন্ন সময় পোস্টার ব্যানারে বিভিন্ন পদ পদবী লিখে। ও আসলে আমাদের দলের কেউ না।”
তবে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম শাহ বলেন, “শাহীন যুবদল করে, তবে পদ-পদবি জানি না।”
স্থানীয়রা জানান, শাহীন আগে যুবলীগ করত, ক্ষমতার পালাবদলে তিনি যুবদলে যোগ দেন। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত দেখা যায়।
এদিকে এই নির্যাতনের ঘটনাকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান। এই ঘটনায় দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিও করেছেন।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোসাইরহাট সার্কেল) শামসুল আরেফীন বলেন, “নির্যাতনের ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”