প্রমাণ লুকাতে লাশ গায়েব, সন্দেহ ‘জঙ্গি’ আল-আমিনের বাবার

ছেলের লাশের খোঁজে বান্দরবানের গহীন বনে র‌্যাবের সঙ্গে গিয়েছিলেন কুমিল্লার নুরুল ইসলাম। তবে সেখানে যে কবর পেয়েছেন, সেখানে লাশ ছিল না।

আবদুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Jan 2023, 04:55 PM
Updated : 16 Jan 2023, 04:55 PM

হত্যার প্রমাণ যাতে না থাকে সেজন্যই বান্দরবানের গহীনের কবর থেকে ছেলের লাশ গায়েব করা হয়েছে বলে পাহাড়ে ‘বম পার্টি’র আখড়ায় প্রশিক্ষণে যাওয়া জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সদস্য আল-আমিনের বাবার সন্দেহ।  

রোববার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে রুমা উপজেলার রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম মুয়ংমুয়াল পাড়ায় কবরে গিয়ে ছেলের লাশ না দেখতে পেয়ে হতাশ, দিশেহারা কুমিল্লার নুরুল ইসলাম। 

তিনি সোমবার রাতে মোবাইল ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার সন্দেহ জঙ্গিরা হয়তো ছেলেকে হত্যা করেছে। কোনো প্রমাণ যেন সামনে না আসে, সেজন্য লাশ গায়েব করে ফেলেছে তারা। 

“আমার ছেলে হয়তো ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চেয়েছিল। এজন্য জঙ্গিরা তাকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে।” 

এ ঘটনায় মামলা করার কথা ভাবছেন বলে জানান আমিনুর রহমান ওরফে আল-আমিনের বাবা। 

গত ১২ জানুয়ারি র‌্যাব জানায়, নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসারের আরও পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জঙ্গিরা রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গহীন পাহাড়ে সশস্ত্র দল ‘কেএনএফ’ বা ‘বম পার্টি’র আস্তানায় প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিল। 

গ্রেপ্তার জঙ্গিদের মধ্যে চারজন হলেন- নোয়াখালীর নিজামুদ্দিন হিরণ ওরফে ইউসুফ (৩০), সিলেটের সাদিকুর রহমান সুমন ওরফে ফারকুন (৩০), কুমিল্লার সালেহ আহমেদ ওরফে সাইহা (২৭) ও বায়েজিদ ইসলাম ওরফে মুয়াছ ওরফে বাইরু (২১); এবং আরেকজন কুমিল্লার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। 

পরে তাদের জিজ্ঞাবাদের জন্য রিমান্ডে পায় পুলিশ। তখন দুই জঙ্গি ‘নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে একজনকে খুন করে কবর দেওয়ার’ কথা জানায়। 

সেই সূত্র ধরেই মরদেহের খোঁজে শনি ও রোববার অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আল-আমিনের বাবা নুরুল ইসলামও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। 

মুয়ংমুয়াল পাড়া এলাকাটি খুবই দুর্গম। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শনিবার প্রস্তুতি নিয়েও সেখানে যেতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য রোববার পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়। 

এলাকাটি রুমা উপজেলার মধ্যে হলেও যাওয়ার সহজ পথ থানচি উপজেলা হয়ে। রুমা উপজেলার উপর দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হলে এক থেকে দেড় দিন সময় লেগে যায়। ফলে দলটি থানচি হয়ে যায়। অভিযান শেষ করে রাতে থানচি উপজেলা সদরে ফিরে আসে দলটি। 

আল-আমিনের বাবা নুরুল ইসলাম, তার স্ত্রী ও স্বজন সোমবার বান্দরবানেই অবস্থান করছিলেন। 

রাতে সেখান থেকে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগে কুমিল্লা থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া এক কিশোর (বয়স ১৭) ধরা পড়েছে। সে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, আমার ছেলে আল-আমিন বান্দরবানের রুমা উপজেলার গহীন অরণ্যে না খেয়ে, রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ নভেম্বর মারা গেছে। সেদিন দুপুরে তারা আল-আমিনকে দাফন করেছে। 

“র‌্যাবের কাছ থেকে এই খবর পেয়ে শুক্রবার আমরা বান্দরবানে যাই ছেলের লাশের সন্ধানে। রোববার আমাকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে র‌্যাব ঘটনাস্থলে যায়। তারপর হেঁটে গহীন অরণ্যে যেখানে আল আমিনের কবর সেখানে যাই আমরা।” 

নুরুল ইসলাম বলেন, “এ সময় ইউএনও, র‌্যাব, পুলিশ এবং কিশোরকেও সঙ্গে নেওয়া হয়। পরে ওই কিশোরই আল-আমিনের কবর দেখিয়ে দেয়। কিন্তু কবর খোঁড়ার পর দেখা যায়, লাশ গায়েব হয়ে গেছে।

কবরের আশপাশে কিছু স্যান্ডেল, জামা-কাপড় ও হাঁড়ি-পাতিল পড়ে ছিল। এ ঘটনার পর র‌্যাব ধারণা করছে, কবর থেকে কেউ লাশ সরিয়ে ফেলেছে।“ 

আল-আমিনের বাবা আরও বলেন, “যারা ফুঁসলিয়ে আমার ছেলেকে এই পথে নিয়ে খুন করেছে তাদের গ্রেপ্তার আর বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।” 

গত বছরের ২৩ অগাস্ট ‘হিজরতের উদ্দেশ্যে‘ কুমিল্লা থেকে এক সঙ্গে ঘর ছাড়েন সাত তরুণ। তারা সবাই শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে তিনজনকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র‌্যাব; আর নিজের ভুল বুঝতে পেরে পটুয়াখালী থেকে জঙ্গিদের সঙ্গ ছেড়ে কৌশলে পালিয়ে আসার দাবি করেছেন একজন।

আমিনুর রহমান ওরফে আল-আমিন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার বড় আলমপুর গ্রামে। পরিবারসহ তার বাবা মো. নুরুল ইসলাম কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলায় থাকেন। আল আমিনের খোঁজ না পেয়ে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় নিখোঁজ হওয়ার জিডি করেন নুরুল ইসলাম। 

নুরুল ইসলাম বলেন, “আমরা এখন দিশেহারা অবস্থায় আছি। আল-আমিন আমার বড় ছেলে। সে আগে তাবলিগের চিল্লায় গেছে অনেকবার। পড়াশোনার পাশাপাশি কান্দিরপাড়ে আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সময় দিতো সে। ধর্মকর্ম করার পাশাপাশি সে তার বৃদ্ধ দাদার সেবা করত।” 

“তার চলাফেরায় কখনো মনে হয়নি সে জঙ্গিবাদের মতো ঘটনায় জড়াতে পারে। আমাদের কতটা কষ্ট হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। ভেবেছিলাম অন্তত ছেলের লাশ তো পাব। ওর মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। এখন কী করব আল্লাহ ভালো জানেন,” অসহায় কণ্ঠে বলেন নুরুল ইসলাম। 

কুমিল্লার ওই সাত তরুণের মধ্যে এখনও নিরুদ্দেশ রয়েছেন কুমিল্লা সরকারি কলেজের এক কিশোর শিক্ষার্থী (১৭), কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থী (১৮)। তারা এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন; কিন্তু পরীক্ষায় বসেননি। 

আরও পড়ুন:

‘বম পার্টি’র আস্তানায় প্রশিক্ষণে যাওয়া আরও ৫ জঙ্গি পাহাড়ে গ্রেপ্তার

বম পার্টির সঙ্গে নতুন জঙ্গি দলের ‘মাসিক চুক্তির’ খবর দিল র‌্যাব

৭ জঙ্গির সঙ্গে এবার ৩ পাহাড়িও গ্রেপ্তার: র‌্যাব

নতুন জঙ্গি দলের ‘পাহাড়ি যোগ’ পেয়েছে র‌্যাব

জঙ্গি আর পাহাড়ি দলের মিলে যাওয়ার বিপদ যেখানে

র‌্যাবের জালে নতুন জঙ্গি দল, কারা এরা?

নিখোঁজ ৪ তরুণসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানাল নতুন জঙ্গি দলের নাম

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক