Published : 20 Aug 2025, 09:14 PM
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদাপাথর’ এলাকা থেকে পাথর লুটে জড়িত ৪২ জনকে চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। তালিকায় বিএনপির ২০, আওয়ামী লীগের সাত এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি দুজন করে নেতার নাম রয়েছে।
কমিশনের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান ও অনুসন্ধান চালিয়ে নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে।
যদিও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি অস্বীকার করে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এ ছাড়া পাথর চুরির ঘটনায় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি সদস্যদের কর্তব্যে অবহেলার তথ্যও পেয়েছে দুদক।
প্রতিবেদনে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ এলাকার সাদাপাথর থেকে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর লুটপাট হয়েছে বলে বলা হয়েছে। সাদাপাথর চুরির ঘটনায় দুদক ভোলাগঞ্জে অভিযান চালায় গত ১৩ আগস্ট।
এ ব্যাপারে দুদক মহাপরিচালক ও মুখপাত্র মো. আক্তার হোসেন বুধবার বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে পাথর চুরির সত্যতা পাওয়ায় অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে, যা কমিশনের সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।”
তালিকায় বিএনপির যাদের নাম
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিন, সদস্য হাজী কামাল (পাথর ব্যবসায়ী), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শ্রমিকদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান লাল মিয়া (পাথর ব্যবসায়ী), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে দুদু (পাথর ব্যবসায়ী), সিলেট জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রুবেল আহমেদ বাহার (পাথর ব্যবসায়ী), সহসাংগঠনিক সম্পাদক মুসতাকিন আহমদ ফরহাদ (পাথর ব্যবসায়ী), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. দুলাল মিয়া ওরফে দুলা, যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন, সাজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কর্মী জাকির হোসেন, সদস্য মোজাফর আলী, মানিক মিয়া, সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকসুদ আহমদ, সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ওরফে শাহপরাণ, কোষাধ্যক্ষ (বহিষ্কৃত) শাহ আলম ওরফে স্বপন, সিলেট জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম এবং পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বকস।
আওয়ামী লীগের সাতজন
কার্যক্রম নিষিদ্ধ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কর্মী বিলাল মিয়া (পাথর ব্যবসায়ী), শাহাবুদ্দিন (পাথর ব্যবসায়ী), গিয়াস উদ্দিন (পাথর ব্যবসায়ী), কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল ওদুদ আলফু, কর্মী মনির মিয়া, হাবিল মিয়া ও সাইদুর রহমান।
জামায়াত ও এনসিপির চার নেতা
সিলেট মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. ফখরুল ইসলাম ও সিলেট জেলার সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন; সিলেট জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগর প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
আরও ১১ জন
অনুসন্ধানে সাদাপাথর চুরির সঙ্গে আরও যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তারা হলেন- কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জের আনর আলী, উসমান খাঁ, ইকবাল হোসেন আরিফ, দেলোয়ার হোসেন জীবন, আরজান মিয়া, মো. জাকির, আলী আকবর, আলী আব্বাস, মো. জুয়েল, আলমগীর আলম ও মুকাররিম আহমেদ।

তালিকা মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: বিএনপি
‘দুদকের অনুসন্ধান: সিলেটে সাদাপাথর চুরির সঙ্গে জড়িত ৪২ জন’ শীর্ষক একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে সিলেট মহানগর বিএনপি।
বুধবার বিকালে সিলেট নগরীর ফুড লাউঞ্জ রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে এই প্রতিবাদ জানান নেতারা।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, “কোনোপ্রকার সুনির্দিষ্ট সূত্র, যথাযথ অনুসন্ধান এবং কোনো প্রকার তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাথর চুরির সঙ্গে জড়িত মর্মে আমার এবং সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর নাম লুটেরাদের তালিকায় যুক্ত করেছে। এতে করে আমরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্নই নয়; বরং এই ধরনের বস্তবতা বিবর্জিত কাল্পনিক সংবাদের কারণে আমরা আশ্চর্য হয়েছি।”
এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমার আহ্বান জানিয়ে কয়েস লোদী বলেন, “প্রকৃতপক্ষে বিগত ১৫ বছর থেকে এই এলাকায় তৎকালীন দখলদার আওয়ামী লীগের যোগসাজশে ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে এখানে লুটপাট চলছে, যা এখনো চলমান রয়েছে।”
তিনি বলেন, “দেশ যখন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে একটি পক্ষ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সারাদেশে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেছে। এই ধারাবাহিকতায় গত কিছুদিন থেকে সিলেট বিএনপির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে গুজব ও অপপ্রচার করা হচ্ছে।”
কয়েস লোদী বলেন, “আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই পাথর চুরির সঙ্গে জড়িত সবাইকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।”
জামায়াতের নিন্দা-প্রতিবাদ
পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াতে ইসলামী। বুধবার যৌথ সংবাদ বিবৃতিতে সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমির নূরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ও হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান এবং মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী এই প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এটা জড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে জামায়াত নেতৃবৃন্দ দূরে থাক সাধারণ কোনো কর্মী-সমর্থকের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও বৈধ পন্থায় পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে সিলেটের পরিবহন মালিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি কর্মসূচিতে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জামায়াত নেতারাও বক্তব্য দেন।
এ ধরনের সংবাদ পাথর চুরিতে জড়িত প্রকৃত আসামিদের আড়ালের অপচেষ্টা বর্ণনা করে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পাথর লুটে জড়িত প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানান।