Published : 27 Aug 2025, 10:03 AM
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী আখের রস থেকে হাতে তৈরি লাল চিনি ভৌগোলিক নির্দেশক-জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ফুলবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ জানান, তারা ওয়েবসাইট চেক করে জিআই পণ্য হিসেবে লাল চিনি নিবন্ধনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
ফুলবাড়িয়া কৃষি বিভাগ বলছে, এ উপজেলার আখের রস থেকে হাতে তৈরি লাল চিনির ঐতিহ্য প্রায় আড়াইশ বছরের। মিহি দানার এ চিনি শরবত, পিঠা বা মিষ্টান্নতে ব্যবহার করা হয়। এই চিনি তৈরির প্রক্রিয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং শতভাগ বিশুদ্ধ।
এটি কেবলমাত্র আখের রস থেকে তৈরি হয়; যা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কোনো ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া তৈরি অর্গানিক এ চিনির কদরও বেশ।
প্রতি বছর প্রায় ‘শত কোটি’ টাকায় এ চিনি বিক্রি হয়, বলছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, “২০২৪ সালের ১১ জুলাই ফুলবাড়িয়ার লাল চিনির জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে। অন্য কোনো পক্ষের দাবি না থাকায় সব প্রক্রিয়া শেষে আমরা স্বীকৃতি পেয়েছি। সনদের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিয়েছি।”
জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন এ কৃষি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “আগে যারা লাল চিনি সম্পর্কে জানতো না তারাও এখন জানতে পারবে।
“জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় কৃষকরাও এটির উৎপাদন বাড়াবে এবং সরকারেরও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়বে। অর্গানিক পণ্য হিসেবে দেশের বাইরে রপ্তানি করা গেলে চাষিদের জন্য অন্যরকম সুযোগ তৈরি হবে।”
ফুলবাড়িয়া উপজেলার বাকতা, কালাদহ ও রাধাকানাই ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামের কিষান-কিষানিরা আখ উৎপাদন ও চিনি তৈরির কাজ করেন বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
পরে বাকতা গ্রামের গিয়ে লাল চিনি তৈরির কৃষক আবুল কালাম ও কৃষক হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

এ চিনির তৈরির প্রক্রিয়া কি জানতে চাইলে আবুল কালাম বলেন, “লাল চিনির একমাত্র কাঁচামাল হল আখ। লাল চিনি তৈরির জন্য প্রথমে আখ জমি থেকে সংগ্রহ করে তা পরিষ্কার করে যন্ত্রচালিত আখ মাড়াইকলের সাহায্যে রস বের করা হয়। পরে জ্বালঘরের চুলায় সাতটি লোহার কড়াই বসানো হয়।
“প্রথম কড়াইয়ে পরিমাণ মতো কাঁচা রস দিয়ে জ্বাল দেওয়া শুরু করা হয়। জ্বাল দেওয়ার আধা ঘণ্টা পর প্রথম কড়াই থেকে দ্বিতীয় কড়াইয়ে, তারপর তৃতীয় কড়াইয়ে এভাবে সপ্তম কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া রস ঘন হলে চুলা থেকে নামিয়ে কাঠের তৈরি মুগুর দিয়ে বারবার ঘষে বাদামি রঙের লাল চিনি তৈরি করা হয়।”
যতক্ষণ না পাকা রস শুকনো ধুলার মতো আকার ধারণ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঘুটতে হয় বলে জানান আবুল কালাম।
কৃষক হাফিজ উদ্দিন বলছিলেন, “আখের গুণগত মান খারাপ হলে ধুলার মতো না হয়ে গুটি গুটি আকার ধারণ করে। ধুলার মতো বা গুটির মতো যাই হোক, ফুলবাড়িয়ার ভাষায় এটিই হলো ঐতিহ্যবাহী লাল চিনি। দেখতে ধূসর বাদামি বা হালকা খয়েরি হলেও সাদা চিনির বিপরীতেই হয়তো ‘লাল চিনি’ নামকরণ করা হয় একে। চিনি তৈরি হওয়ার পর তা রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয় “
তিনি বলেন, জমিতে চৈত্র মাসে আখ লাগানো হয়। আখ মাড়াই শুরু হয় পৌষ মাসের শুরু থেকে। দীর্ঘ এক বছরে একটি ফসল হয়। আর এই লাল চিনি তৈরি হয় আড়াই মাসে।”
ফুলবড়িয়া কৃষি বিভাগ থেখে পাওয়া তথ্য অনুযাযী, এখানে প্রধান ফসল ধানের পাশাপাশি আখসহ অন্যান্য ফসলও হয়। ২০২৫ সালে ৬৫০ হেক্টর জমিতে আখ হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ জমিতে দেশী জাতের আখের আবাদ হয়। বাকি জমিতে ‘ঈশ্বরদী-৪১’ ও ‘ঈশ্বরদী-৪২’ জাতের আখ হয়। এক হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৮ মেট্রিক টন লাল চিনি উৎপাদন হয়। লাল চিনি গড়ে ৮ হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়। এ বছর প্রায় ১০৮ কোটি টাকার লাল চিনি বিক্রি করেন কৃষকেরা। এক মেট্রিক টন আখ থেকে প্রায় ৩২ হাজার লিটার রস হয়। চার কেজি রস থেকে এক কেজি লাল চিনি বের হয়।
লাল চিনি সম্পূর্ণ ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে তৈরি হয়। চুলা পরিবর্তনের মাধ্যমে রস জাল করে হাত দিয়ে অনবরত ঘুরিয়ে উৎপাদন করা হয়। ফলে এ চিনি সম্পূর্ণ অর্গানিক বলা যায়। শরবত বা মিষ্টান্নতে এ চিনি ব্যবহার করা হলে কাঁচা রসের ফ্লেভার পাওয়া যায়। ফলে দেশে ও বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। অনেকে ফুলবাড়িয়ার চিনি অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশে নিচ্ছে।
রাধাকানাই ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রামের আব্দুস সবুর বলেন, “আমরা বাপ দাদার আমল থেকে লাল চিনি বানাই। কোনো ধরনের মিডিসিন দেই না। জমিগুলোতে আখ ছাড়া অন্য কিছু না হওয়ায় আখ করতে হয়। চিনিগুলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে বেপারীরা কিনে নেয়। তাদের হাতে তৈরি লাল চিনি জিআই স্বীকৃতির খবরে আমি খুশি।”
ফুলবাড়িয়া উপজেলার ফুলবাড়িয়া বাজারের পাইকার মো. আবদুল মজিদ বলেন, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় চিনির চাহিদা আরও বাড়বে। তাদের ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটবে বলে আশা করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, লাল চিনির জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেতে অনেক মানুষের শ্রম, মেধা জড়িয়ে রয়েছে। এটি আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনন্য প্রাপ্তি বা স্বীকৃতি।
লাল চিনি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে যারা নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানান তিনি।
ফুলবাড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর ইসলাম বলেন, “লাল চিনির জিআই স্বীকৃতির বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হয়ে সনদের জন্য টাকা জমা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি৷ এই স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত এ অঞ্চলের মানুষ৷ এই স্বীকৃতি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”