Published : 20 Jul 2026, 05:55 PM
সারাক্ষণ নিজেকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা, একসঙ্গে একাধিক কাজ বা ‘মাল্টিটাস্কিং’ করা যেন বর্তমানে করপোরেট সংস্কৃতিতে সফল ও বুদ্ধিমানের লক্ষণ বলে মনে করা হয়।
এর বিপরীতে যারা কিছুটা অলস সময় কাটান বা কাজ ছাড়া চুপচাপ বসে থাকেন, সমাজ তাদের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে তাকায়।
তবে চিকিৎসা-বিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা।
গবেষকদের মতে, সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা নয়, বরং কখন বিশ্রাম নিতে হবে আর কখন কাজ বন্ধ করতে হবে, সেটা সঠিকভাবে জানাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।
ফরাসি মনোবিজ্ঞানী নাটালি আন্দ্রে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমিস্টারসহ একদল গবেষকের করা ২০২৬ সালের নতুন গবেষণাটি চিকিৎসা সাময়িকী ‘নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড বায়োবিহেভিওরাল রিভিউস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
‘ডু পিপল রিয়েলি অ্যাভোয়েড এফোর্ট? এ কেস্ট-বেনিফিট পার্সপেকটিভ অন দ্য প্রেন্সিপাল অফ লিস্ট এফোর্ট’ নামের এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেল অধ্যাপক ড. সুসান ক্রাউস হুইটবোর্ন সাইকোলজি ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “মানুষের মস্তিষ্ক আসলে সবসময় কাজ এড়াতে চায় না; বরং শক্তি অপচয় রোধ করতে ‘ব্যাকএন্ডে’ বা পেছনে এক ধরনের লাভ-লোকসানের গাণিতিক হিসাব বা ‘কস্ট-বেনেফিট অ্যানালিসিস’ করে।
মস্তিষ্ক যেভাবে কাজের লাভ-ক্ষতি হিসাব করে
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীরা প্রাকৃতিকভাবেই ‘ন্যূনতম প্রচেষ্টার নীতি’ মেনে চলে। অর্থাৎ, কোনো বাড়তি কষ্ট ছাড়াই যদি কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়, তবে মস্তিষ্ক শরীরকে অলস বা নিষ্ক্রিয় রাখার নির্দেশ দেয়। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাক্টিভ ইনফারেন্স থিওরি’।
কোনো কাজে যদি নতুন কোনো তথ্য বা বড় কোনো পুরষ্কার মেলার সম্ভাবনা না থাকে, তবে মস্তিষ্ক সেই কাজের পেছনে ‘এনার্জি’ বা শক্তি নষ্ট করতে চায় না।
একেই সাধারণ মানুষ ‘অলসতা’ বলে ভুল করে, অথচ এটি আসলে শরীরের জ্বালানি বাঁচানোর একটি চৌকশ কৌশল।
কাজের পেছনে ৮টি বড় ‘মূল্য’
কোনো কাজ করার আগে মানুষের অবচেতন মন সারাক্ষণ ৮টি বড় বিষয়ের ভালো-মন্দ দিক মেপে দেখে।
১. শারীরিক শক্তি: কাজটি করতে শরীরের কতখানি শক্তি খরচ হবে।
২. মানসিক মনোযোগ: মগজে কতখানি বাড়তি চিন্তা বা বুদ্ধির প্রয়োজন হবে।
৩. সময়: কাজটি শেষ করতে ঠিক আনুমানিক কত সময় লাগবে।
৪. সময়ের চাপ: নির্ধারিত তারিখের মধ্যে কাজটি করা কতটা কঠিন।
৫. ক্লান্তি: শারীরিক বা মানসিক কোনো অবসাদ তৈরি হবে কি-না।
৬. কষ্ট বা বেদনা: কাজটি করতে গেলে কোনো ব্যথা বা শারীরিক কষ্ট সইতে হবে কি-না।
৭. হতাশা বা বিরক্তি: কাজটি করতে গিয়ে অন্য কোনো জরুরি কাজ হাতছাড়া হবে কি-না।
৮. ঝুঁকি ও আশঙ্কা: কাজটি করার সময় কতখানি মানসিক উদ্বেগ বা ভয় কাজ করবে।
মস্তিষ্ক যখন দেখে এই ৮টি খরচের তুলনায় দিনশেষে প্রাপ্তি বা পুরষ্কার অনেক কম, তখনই মানুষ কাজ ফেলে অলস বসে থাকে। যেমন, কোনো অর্থহীন বা কম বেতনের ‘ওভারটাইম’ কাজের প্রস্তাব পেলে বুদ্ধিমান মানুষের মগজ প্রাকৃতিকভাবেই সেখানে শক্তি খরচ না করে, সেটা ব্যাংকে টাকা জমানোর মতো ভবিষ্যতের জন্য ‘কনজার্ভ’ বা জমা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও এটি সত্য
গবেষকেরা শিশুদের ওপর করা আগের কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, মানুষের মাঝে কষ্ট করার আনন্দ শৈশব থেকেই তৈরি হয়, তবে তা শর্তসাপেক্ষ।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ বছরের শিশুরা সহজ কাজের চেয়ে কোনো কঠিন বা নতুন ধাঁধা মেলাতে পারলে বেশি চওড়া হাসি দেয়। এর অর্থ হল, মানুষ পরিশ্রম অপছন্দ করে না, বরং মানুষ অপছন্দ করে এমন পরিশ্রম, যা থেকে নতুন কিছু শেখা যায় না বা কোনো প্রতিদান পাওয়া যায় না।
গবেষকদের পরামর্শ
অলসতা মানেই নেতিবাচক কিছু নয়, এটি আসলে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার এক দারুণ ক্ষমতা। তাই কখন পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে হবে আর কখন অলস হয়ে নিজের ‘এনার্জি রিচার্জ’ বা শক্তি সঞ্চয় করতে হবে, এই ভারসাম্য বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতা ও কর্মক্ষেত্রে সফলতার আসল উপায়।
আরও পড়ুন
প্রতিদিন আনন্দ লাভের রুটিন গড়তে
রাত জেগে খেলা দেখায় পরদিন ক্লান্তি? চনমনে থাকার রয়েছে কৌশল
বেশিক্ষণ বসে টিভি দেখলে বার্ধ্যকে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে