মুক্তিযুদ্ধ, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ ও একজন তৌফিক ইমরোজ খালিদী
সামরিক বাহিনীর অপতৎপরতা থেকে সংখ্যালঘু নিপীড়ন—অন্যরা যে সত্য প্রকাশের সাহস পায়নি, তৌফিক ইমরোজ খালিদী তা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছিলেন; প্রিয় সম্পাদককে নিয়ে চিররঞ্জন সরকারের স্মৃতিচারণ।
ইদানীং খারাপ সংবাদই যেন বেশি শুনছি। পরিচিত, ঘনিষ্ঠ, প্রিয় মানুষগুলো একে একে অকালে বিদায় নিচ্ছেন। প্রতিটি মৃত্যুসংবাদ মনের ভেতর একটু একটু করে শূন্যতা তৈরি করছে। এমনিতেই মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন, তার ওপর পরিচিত মানুষের বিদায় যেন নিজের জীবনেরই কোনো একটা অধ্যায়কে নিঃশব্দে সরিয়ে নেয়। সেই শোকের ধারাবাহিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চলে যাওয়ার খবরটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। খবরটি শুনে প্রথমেই মনে হয়েছিল, এ নিশ্চয়ই ভুল সংবাদ। এমন একজন টগবগে, প্রাণবন্ত, কর্মচঞ্চল মানুষ আর নেই—এ কথা কীভাবে বিশ্বাস করি? যে মানুষটি কথা বলতেন, ভাবতেন, পরিকল্পনা করতেন, নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন, সেই মানুষটি হঠাৎ করেই আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেলেন! সংবাদটি সত্য, অথচ মন কিছুতেই তাকে সত্য বলে মেনে নিতে চাইছে না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু কেবল একজন সাংবাদিকের প্রয়াণ নয়; বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু তাকে নিয়ে লিখতে বসে বারবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরে মানুষটির কাছে ফিরে যাচ্ছি। মনে পড়ছে, তার সঙ্গে কয়েকবার দেখা হওয়ার কথা, আমার লেখার প্রতি তার আগ্রহের কথা। তিনি আমার লেখা পছন্দ করতেন। কথাটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু একজন লেখকের কাছে একজন সম্পাদকের এই স্বীকৃতি কতটা মূল্যবান, তা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাই সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। জীবনে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কত কথা হয়, কত পরিচয় তৈরি হয়; কিন্তু কিছু মানুষের সামান্য স্বীকৃতিও মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া সেই স্বীকৃতি আমার কাছে তেমনই একটি ব্যক্তিগত প্রাপ্তি। আজ তার অনুপস্থিতিতে স্মৃতিটুকু আরও গভীর, আরও বেদনাময় হয়ে উঠেছে।
প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লিখছি। এই দীর্ঘ যাত্রায় আনন্দ যেমন পেয়েছি, তেমনি হতাশাও কম সইতে হয়নি। অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে, আবার অনেক লেখা ফিরেও এসেছে। কখনো সম্পাদক অপারগতা জানিয়েছেন, কখনো লেখা প্রকাশের সাহস দেখাননি। ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, প্রচলিত বয়ানের বিপরীতে যায় কিংবা স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশ্ন তোলে—এমন লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক সংবাদমাধ্যমেরই নানা সংকোচ থাকে। লেখক হিসেবে এসব অভিজ্ঞতা কখনো হতাশ করেছে, কখনো ক্ষুব্ধ করেছে, কখনো নিজের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ নিয়েই সংশয়ে ফেলেছে। সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আমার কাছে ব্যতিক্রম। অন্য সংবাদমাধ্যম যে লেখা প্রকাশ করতে সাহস করেনি কিংবা অপারগতা জানিয়েছে, তৌফিক ভাইয়ের সম্পাদনায় বিডিনিউজ সেই লেখাগুলোর অনেকগুলো অবিকৃতভাবে প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অপতৎপরতা নিয়ে আমার লেখা কয়েকটি কলাম সেখানে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার কাছে এটি নিছক লেখা ছাপানোর সুযোগ ছিল না; ছিল নিজের বক্তব্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। সেই সুযোগের জন্য তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ব্যক্তিগত এবং গভীর।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী মানুষের ওপর হামলা, শোষণ, নির্যাতন ও অধিকারহরণের বিষয়েও বিডিনিউজের ভূমিকা আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এসব বিষয়ে আমিও বিস্তর লিখেছি। অনেক সময় প্রগতিশীলতার দাবিদার সম্পাদকদের কাছ থেকেও লেখা ফিরিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। অথচ বিডিনিউজ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। যেসব মানুষের কণ্ঠস্বর সাধারণত দুর্বল, যাদের ওপর নিপীড়নের খবর সহজেই আড়ালে চলে যায়, তাদের দুর্দশা সংবাদে জায়গা করে দেওয়া যে কতটা জরুরি, তা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি। তৌফিক ভাইয়ের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার বড় একটি জায়গা এখানেই। কারণ, একজন সম্পাদক যখন কোনো লেখকের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেন, তখন তিনি শুধু একটি লেখা প্রকাশ করেন না; অনেক সময় এমন কিছু মানুষের কথাও সামনে নিয়ে আসেন, যাদের কথা শোনার আগ্রহ সমাজের প্রভাবশালী অংশের থাকে না।
তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার আরও একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে, যা আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমার শরীরে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, চিকিৎসার জন্য প্রায় এক লাখ টাকা লাগবে। সেই সময় বিডিনিউজে প্রকাশিত আমার লেখার সম্মানির বেশ কিছু টাকা বকেয়া ছিল। চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে একদিন সরাসরি তৌফিক ভাইকে ফোন করেছিলাম। তাকে বলেছিলাম, আমার চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন; লেখার সম্মানির টাকাগুলো পাওয়ার ব্যবস্থা করলে উপকৃত হতাম। পরদিনই তিনি আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
ঘটনাটি লিখতে গিয়ে আজও কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠছে। অসুস্থতা ও চিকিৎসার অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই অর্থ আমার জন্য কত বড় সহায়তা ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অর্থের পরিমাণের চেয়েও বড় ছিল তার দ্রুত সাড়া দেওয়া, আমার প্রয়োজনটুকু গুরুত্ব দিয়ে দেখা। জীবনে বিপদের সময় কে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা মানুষ সহজে ভোলে না। হয়তো যিনি সহায়তা করেন, তার কাছে ঘটনাটি খুব সাধারণ; কিন্তু যিনি সহায়তা পান, তার জীবনে তা হয়ে থাকে দীর্ঘদিনের স্মৃতি। তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের জায়গাটি তাই শুধু লেখক ও সম্পাদকের ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা, আস্থা এবং কিছু মানবিক ঋণ, যা কোনো হিসাবের খাতায় লেখা থাকে না।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দায়বদ্ধতার কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে চাই। ২০২৪ সালের অগাস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রতীককে ঘিরে যখন নানা বিতর্ক এবং মুছে ফেলার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন তৌফিক ইমরোজ খালিদীর উদ্যোগে প্রকাশিত তিন খণ্ডের দলিলভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এটি নিছক বই প্রকাশের উদ্যোগ ছিল না; ছিল ইতিহাসকে দলিল, তথ্য ও স্মৃতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা শুধু বক্তৃতায় প্রকাশ পায় না; কখনো তা প্রকাশ পায় দলিল সংগ্রহে, দুর্লভ ছবি সংরক্ষণে, বিস্মৃত হয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার কাজে। তৌফিক ভাইয়ের এই উদ্যোগের গুরুত্ব তাই তার ব্যক্তিগত কর্মজীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
তার পেশাগত জীবন অবশ্য প্রতিকূলতামুক্ত ছিল না। প্রত্যক্ষভাবে আক্রান্ত হওয়া, রাষ্ট্রীয় চাপ, মামলা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাও তার জীবনের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মামলাটি থেকে অব্যাহতি পান। এসব অভিজ্ঞতার মানসিক চাপ কতটা গভীর হতে পারে, তা বাইরে থেকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন। তারপরও তিনি সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করেছেন, নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন, নিজের পেশাগত অবস্থান ধরে রেখেছেন। তার সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই; কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করে যাওয়ার দৃঢ়তাকে স্বীকার করা প্রয়োজন।
তার মৃত্যুর পর রাজনৈতিক তকমা দিয়ে তাকে হেয় করার প্রবণতা আমাকে ব্যথিত করেছে। সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কিন্তু একজন মানুষের দীর্ঘ কর্মজীবন, তার অবদান ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে আড়াল করে কেবল অপবাদ দিয়ে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল মূল্যবোধের বিরোধী অবস্থান থেকে তার কাজকে অস্বীকার করার চেষ্টা আরও বেদনাদায়ক। মতপার্থক্য থাকবে, মূল্যায়নে ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু একজন মৃত মানুষকে নিয়ে আলোচনা করতে হলেও ন্যূনতম সততা ও মানবিকতা থাকা প্রয়োজন।
তৌফিক ভাই, আপনার চলে যাওয়ায় আমি যে শূন্যতা অনুভব করছি, তার সবটুকু হয়তো এই লেখায় প্রকাশ করতে পারলাম না। সত্য, ন্যায়, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার জন্য যে সংবাদমাধ্যমটিকে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় মনে করতাম, আপনার অনুপস্থিতিতে সেই জায়গাটি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন লেখা প্রকাশের দরজা কতটা খোলা থাকবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আপনার দেওয়া স্বীকৃতি, বিপদের দিনে আপনার সহযোগিতা এবং আমার লেখার প্রতি আপনার আস্থার স্মৃতি সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
জীবিত থাকতে আমরা প্রায়ই ভাবি, আবার দেখা হবে, আবার কথা হবে, প্রয়োজন হলে আবার ফোন করা যাবে। কত কথা জমে থাকে, কত কৃতজ্ঞতা বলা হয় না, কত দেখা আর হয়ে ওঠে না! মৃত্যুর পর সেই সাধারণ কথাগুলোই অসাধারণ মূল্য পেয়ে যায়। তৌফিক ভাই, আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রইল। আপনার পরিবারের সদস্যদের, সহকর্মীদের এবং আপনাকে ভালোবাসতেন এমন সবার প্রতি আন্তরিক সমবেদনা। আপনার চলে যাওয়া এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আপনি থাকবেন আপনার কাজে, আর আমার মতো অনেকের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে—যেখানে একজন সম্পাদকের পরিচয়ের আড়ালে বেঁচে থাকবেন একজন সহৃদয় মানুষ।
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com
