০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ভূমিহীন হলে কি সরকারি চাকরি পাওয়া যাবে না?

জমি বা নিজস্ব বসতভিটা না থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিয়োগ আটকে গেছে মিশন আচার্যের।

ভূমিহীন হলে কি সরকারি চাকরি পাওয়া যাবে না?

মিশন আচার্যের ঘটনাটি নিয়ে সরকারি চাকরিতে প্রার্থীর ঠিকানা যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

মো আব্বাস মো আব্বাস

Published : 04 Oct 2026, 04:31 PM

Updated : 04 Oct 2026, 04:31 PM

মেধাতালিকায় উপজেলা পর্যায়ে ১৭তম হয়েও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র পাননি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মিশন আচার্য। তার নিয়োগ আটকে যাওয়ার কারণ হিসেবে সামনে এসেছে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ভাষ্য, গোয়েন্দা সংস্থার ঠিকানা যাচাইয়ে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানার তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।

সংবাদে প্রথম যে বিষয়টি আলোচনায় আসে, তা হলো মিশনের পরিবারের নিজস্ব কোনো বসতভিটা নেই। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, তার নামে জমির দলিলসহ দরকারি কাগজপত্র সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। মিশন বর্তমানে তার মা ও নানিকে নিয়ে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। পরিবারের দাবি, তারা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ওই এলাকাতেই বসবাস করছেন।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সরকারি চাকরির জন্য একজন নাগরিকের নিজের নামে বসতভিটা থাকা কি সত্যিই বাধ্যতামূলক কোনো আইনি শর্ত?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু মিশন আচার্যের চাকরির স্বার্থেই জরুরি নয়; এটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যেন ভবিষ্যতে কোনো ভূমিহীন, ভিটেমাটিহীন বা ভাড়াটে নাগরিককে এই একই হয়রানি ও জটিলতার মুখে পড়তে না হয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান বিধিমালা (২০২৫) অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া উপজেলা বা শিক্ষা থানাভিত্তিক। অর্থাৎ প্রার্থী যে এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, কেবল ওই এলাকার শূন্য পদের জন্যই তিনি বিবেচিত হবেন। ২০২৫ সালের বিজ্ঞপ্তিতেও একই ধরনের শর্ত ছিল।

নিয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ও পরিচয় নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদের মতো প্রয়োজনীয় দলিল নেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রার্থীর পরিচয় বা ঠিকানা নিশ্চিত করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়মকানুন ঘেঁটে দেখেছি, সেখানে প্রার্থীর নিজের নামে বসতভিটা বা জমিজমা থাকাকে ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ হওয়ার বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

তাহলে মিশনের ক্ষেত্রে জটিলতাটি ঠিক কোথায়?

জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা, আবেদনপত্রের তথ্য আর সরেজমিন তদন্তে পাওয়া ঠিকানার মধ্যে যদি পার্থক্য থাকে, তবে প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখতেই পারে। সরকারি চাকুরিতে ভুল বা ভুয়া তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই, দিলে তার পরিণতিও প্রার্থীকে ভোগ করতে হবে। তাই প্রশাসন কোনো তদন্ত করবে না, এমন দাবি তোলাও অর্থহীন।

তবে সংকট তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন ঠিকানা যাচাইয়ের প্রশ্নটিকে সরাসরি সম্পত্তির মালিকানার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।

ধরা যাক, একজন মানুষ জন্মের পর থেকেই একটি ভাড়া বাসায় বেড়ে উঠেছেন। তার বাবা-মায়েরও নিজের কোনো জমি নেই। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা আর স্থানীয় চেয়ারম্যান বা মেয়রের দেওয়া নাগরিকত্ব সনদে ওই এলাকার ঠিকানাই লেখা। তার শিক্ষা, সামাজিক পরিচয় ও জীবনের সমস্ত পথচলাও ওই এলাকাকে ঘিরেই।

এখন নিজের নামে একখণ্ড জমি বা ভিটেমাটি নেই বলেই কি তাকে ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা গণ্য করা যাবে না?

একই প্রশ্ন ওঠে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া কিংবা দিনমজুর পরিবারের সন্তান, অথবা শহরের বস্তিতে বেড়ে ওঠা হাজারও মানুষের বেলায়। তাদের কি তবে সরকারি চাকরির জন্য আবেদনের আগে জমি কিনে মালিকানার প্রমাণ দিতে হবে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আর ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে। পাশাপাশি ৩১ অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে নিয়োগে কোনো নিয়মনীতি বা তথ্য যাচাই থাকবে না। প্রার্থীর নির্ধারিত মেধা ও যোগ্যতা থাকতে হবে, ভুল তথ্য দিলে জবাবদিহি করতে হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দার শর্ত পূরণ করতে হবে।

কিন্তু স্থায়ী বাসিন্দা প্রমাণের শর্তকে যদি নিজের নামে বসতভিটা থাকার শর্তে পরিণত করা হয়, তাহলে তার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের কথা উল্লেখ করা যায়। ২০২২ সালে সরকারি একটি নিয়োগের মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দেন, আবেদনপত্রের ঠিকানা ও পুলিশ ভেরিফিকেশনে পাওয়া ঠিকানার মধ্যে শুধু অমিল থাকাই কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করার মতো যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। আদালত বলেন, একজন মানুষ সবসময় একই ঠিকানায় থাকবেন এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে আর্থিক বা পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে কেউ ভাড়া বাসা কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে পারেন।

মিশনের ঘটনার সঙ্গে এই রায়ের বিষয়টি হুবহু এক না হলেও (যেহেতু তার ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন রয়েছে), আদালতের এই বার্তার মূল সারমর্মটি খুবই প্রাসঙ্গিক। শুধু ঠিকানার গরমিল দেখিয়েই কাউকে বঞ্চিত করা যায় না; ওই অমিলের পেছনের বাস্তব কারণ ও সার্বিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তাই মিশন আচার্যের ঘটনাটিকে নিছক একজন চাকরিপ্রার্থীর দুর্ভাগ্যের গল্প হিসেবে দেখলে বিষয়টি ছোট হয়ে যাবে। এটি আমাদের পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার ভেতরের এক গভীর দুর্বলতা ফুটিয়ে তুলেছে।

হয়তো শেষ পর্যন্ত মিশন তার নিয়োগপত্রটি পেয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত জানা তথ্যমতে, তার নিয়োগ পুরোপুরি বাতিল হয়নি, স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় স্থগিত রয়েছে মাত্র। জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় নথি অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে।

কিন্তু এখানেই আলোচনা থামানো উচিত নয়।

সরকারের উচিত স্থায়ী বাসিন্দা যাচাইয়ের এই নিয়মাবলী আরও পরিষ্কার ও সহজবোধ্য করা। কোন কোন কাগজপত্র চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও বাস্তব বসবাসের অমিল কীভাবে মেটানো হবে, কিংবা ভূমিহীন বা ভাড়াটে মানুষদের ক্ষেত্রে কী বিকল্প গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি।

কারণ সরকারি চাকরি কোনো নাগরিকের সম্পত্তির মালিকানার পুরস্কার নয়। এটি যোগ্যতা ও নির্ধারিত আইনি শর্ত পূরণের ভিত্তিতে পাওয়ার সুযোগ।

মিশনের ক্ষেত্রে হয়তো সাময়িক একটি সমাধান আসবে। কিন্তু ভবিষ্যতে যেন আর কোনো যোগ্য প্রার্থীকে এমন অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে না হয়, সেটির সুরাহা করাই আসল কাজ। প্রশ্নটি তাই এখন আর মিশনের একার নয়।

প্রশ্নটি দাঁড়ায়, সরকারি চাকুরিতে সুযোগ পাওয়ার যোগ্যতা কি প্রার্থীর মেধা, অর্জিত সনদ ও আইনি পরিচয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি তার নামে কয় শতক জমি আছে, সেটাও যোগ্যতার মাপকাঠি হবে?

এই প্রশ্নের একটি স্পষ্ট ও স্থায়ী উত্তর পাওয়া দরকার। মিশনের জন্য তো বটেই, এদেশের হাজারও ভূমিহীন ও খেটে খাওয়া মানুষের ভবিষ্যতের স্বার্থেই।

মো আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও করপোরেট যোগাযোগ পেশাজীবী। ই-মেইল: abdulla180395@gmail.com