০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্ধু তৌফিক, দেখা হবে তারার দেশে

টিএসসির সরব আড্ডা থেকে বিডিনিউজের নিউজরুম—চাপ আর দলবাজির ভিড়ে আপসহীন বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে জিয়া শাহীনের আবেগঘন স্মৃতিকথা।

বন্ধু তৌফিক, দেখা হবে তারার দেশে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

জিয়া শাহীন জিয়া শাহীন

Published : 05 Oct 2026, 08:41 AM

Updated : 05 Oct 2026, 08:41 AM

কিছু স্মৃতি, কিছু স্মৃতিচারণা। নিজেকে কীভাবে বোঝাই সে আর নেই। তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে বন্ধুমহলে আমরা তৌফিক বলেই ডাকতাম।

সেই অতীত—কখনও টিএসসির ক্যাফেটেরিয়া, কখনও ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিল চত্বর, কখনওবা আর্টস ক্যাফেটেরিয়া, আবার কখনও নীলক্ষেত। আরও কত জায়গায় যে আড্ডায় মেতে উঠতাম আমরা। সেই সাবলীল আড্ডায় থাকত সাজেদুল হক রিপন, বরিশালের কায়উম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি সাকলাইন, ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান লাজ, কখনও বাংলা বিভাগের রোজী, প্যারী, বিল্লাহসহ আরও অনেকে। তৌফিক ছিল সবার কাছেই ভীষণ প্রিয় একজন মানুষ।

তৌফিক মানেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক এবং প্রকাশক। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করত। আমার আড্ডার বেশি সময় কাটত ইংরেজি এবং বাংলা বিভাগে। কার্জন হল থেকে এসে কলা ভবনের এই আড্ডা আমাকে প্রাণের খোরাক জোগাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির প্রয়াত সভাপতি শ্রদ্ধেয় জহুরুল হক স্যারের ছেলে, ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ও প্রয়াত সাজেদুল হক রিপনের মাধ্যমে তৌফিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। রিপন থাইল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করত।

তৌফিকের ছিল পরিপাটি পোশাক, মুখে দাড়ি; ফুলহাতা সাদা শার্ট পরত বেশি, আর কথায় ছিল দারুণ স্মার্ট।

তৌফিকের বিষয়ে রিপনকে একদিন বলেছিলাম, “রিপন, তৌফিক কি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত? আবার নামের শেষে খালিদী? অথচ পোশাক-আশাক এত পরিপাটি। মুখে দাড়ি দেখে আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়, কোনো মৌলবাদী সংগঠন করে নাকি?”

রিপন তখন ধমক দিয়ে বলেছিল, “তৌফিক একজন প্রগতিশীল মানুষ, প্রগতিশীল রাজনীতির কর্মী।”

এরপর থেকে ওর প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। আমাদের আড্ডার মধ্যমণি হয়ে ওঠে তৌফিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুলহাতা সাদা শার্টে ওর চলাফেরা ছিল অনবদ্য। রিপন মারা গেছে বছরখানেক আগে। বছরতিনেক আগের কথা, হঠাৎ রাত ১টায় রিপন ফোন দিয়ে বলল, “তৌফিক এসেছে আমার বাসায়।”

বললাম, “এত রাতে কেন? ও তো অফিশিয়াল নানা চাপে আছে, বিশেষ করে সরকারি চাটুকার সাংবাদিক এবং মন্ত্রীদের কারণে। ওকে বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে বল।”

রিপন বলল, “দাঁড়া, তুই তৌফিকের সঙ্গে কথা বল।”

কথা হলো তৌফিকের সঙ্গে। ও বলল, “শাহীন, সবদিক থেকে এত চাপ। তবুও চালিয়ে যাচ্ছি। মনটা ভালো নেই, তাই রিপনের বাসায় এলাম কথা বলে একটু হালকা হতে।”

মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে কথা বলে জটিলতার বিষয়গুলো জানাত আর বলত, “সাংবাদিকতার সঠিক জায়গা থেকে ফাইট করে যাব, যতক্ষণ পারি। তবুও লাইনচ্যুত হব না।”

তৌফিক কতটুকু নিজ প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের প্রাধান্য দিত, তার একটি প্রমাণ আমি নিজেই। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও এবং সম্পাদক হিসেবে ও যখন দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিল, আমি বলেছিলাম, “আমি বগুড়া থেকে কাজ করব।”

ও আমাকে বলেছিল, “শাহীন, আমি একটা বোর্ড করে দিয়েছি, তারা কাজ করছে। এখানে আমাকে বলিস না, তাদের সিদ্ধান্তই আমি গ্রহণ করব। তুই বিডিনিউজেই থাক।”

ওই টেলিভিশন থেকে যখন ও সরে এল, তখন আমি বলেছিলাম, "সরে এলি কেন?"

উত্তরে ও বলেছিল, "বিশ্বমানের টেলিভিশন বাংলাদেশ থেকেও করা সম্ভব, আমি সেটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু টেলিভিশন নিরপেক্ষ রাখা যাবে না, মালিকপক্ষ থেকে নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশ আসতে শুরু করেছে। তাই বুঝলাম, মানে মানে সরে আসাই ভালো।"

অসুস্থতার কারণে এখন আর ঢাকা যাওয়া হয় না। চাকরিজীবনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম অফিসে একবারই গিয়েছিলাম; সঙ্গে ছিলেন বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও 'জনকণ্ঠ' পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মাহমুদুল আলম নয়ন। অফিসে মফস্বল বিভাগে বসেছিলাম আমি আর নয়ন। অফিসের কেউ নামে চিনলেও আমাদের মুখ চিনেনি, পাত্তাও দিচ্ছিল না কেউ। ভেতরে তখন সংবাদ সংক্রান্ত মিটিং হচ্ছিল। মিটিং থেকে বের হওয়ার সময় তৌফিকের চোখে পড়ল আমার ওপর। বলল, "শাহীন, কখন এলি? জানাবি না? আমার রুমে আয়।"

তখন সবাই যেন নড়েচড়ে বসল। তারপর আমি আর নয়ন ঢুকলাম ওর অফিসে। ওকে বলেছিলাম, "একটা প্রিন্ট মিডিয়া বের কর না কেন?"

তখন তৌফিক বলেছিল, "কয়েক বছর পর সবকিছু মোবাইলে চলে আসবে। আমি কাজটি আগেই শুরু করেছি, বাকিরা পরে করবে।"

তৌফিকের মৃত্যুর খবর পেয়ে নয়ন আমাকে বলল, "এত অমায়িক মানুষ হয় না। বন্ধুর মূল্যায়ন এভাবে কেউ করে, তা জানা ছিল না। ওনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কথা ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমরা একজন প্রকৃত সাংবাদিককে হারালাম।"

বগুড়ার ডিবিসি টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার মোহন আখন্দ একদিন আমাকে বলেছিল, "জিয়া শাহীন ভাই, এক ঘণ্টার জন্য হলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে আপনার বন্ধুকে বলে আমাকে কাজ করার একটা সুযোগ করে দিন। আমি বিডিনিউজ ফলো করি। অন্তত একদিনের জন্য হলেও তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাইকে বগুড়ায় নিয়ে আসুন।”

এডিটরস গিল্ড নামে সম্পাদকদের সংগঠনটি যখন ও গড়ল, তখন আমি বলেছিলাম, “তুই ভুল করলি। যাদের নিয়ে কাজ করছিস, তারা দলবাজির সাংবাদিকতা করে। পেশার চেয়ে দল আর স্বার্থ বেশি বোঝে তারা।"

পরবর্তীতে একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু আর আবেদ খানরা যখন সংগঠনটির নেতৃত্ব নিজেদের কব্জায় নিল, তখন আবারও ওকে বলেছিলাম, "আমার কথা কি মিলল?"

কোনো উত্তর না দিয়ে তৌফিক শুধু কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই চরণ আওড়েছিল, “যা হবার নয় তা-ই তা-ই হয়/ কবিরা হয় ঠিকাদার, মেয়েরা হয় বেশ্যা।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিষয়ে বগুড়ার সাংবাদিক মোহন আখন্দ পরে লিখেছে, "বন্ধুর প্রতি কতটা আন্তরিক ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী, তার প্রমাণ হলো জিয়া শাহীনের টাকার প্রয়োজন হলে অফিসে টাকা না থাকলেও ও নিজে থেকেই পাঠাত।"

কথাটি নাকি ওরই একসময়ের সহকর্মী বিডিনিউজের সিনিয়র সাংবাদিক রাজীব নূর বলছিলেন। কথাটি আসলেও সত্যি। আমি অসুস্থ হওয়ার পর ওকে বললাম, ভারতের চিকিৎসার জন্য যাব, ও তড়িঘড়ি ষাট হাজার টাকা পাঠিয়ে দিল। আমি অসুস্থ থাকায় অফিসের সবাইকে বলে রেখেছিল যেন আমার ওপর কাজের বেশি চাপ না দেওয়া হয়। অবশ্য সহকর্মীদের কেউ আমাকে চাপ দেয়নি, তাই অফিসের সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।

লন্ডন যাওয়ার আগে ওর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বলেছিলাম, “তৌফিক, আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না। পঁচিশ হাজার টাকায় আর সংসার চলে না, ওষুধ কিনতেই অর্ধেক চলে যায়। কী করব বল তো?”

ও বলেছিল, "লন্ডন থেকে ফিরেই তোর বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেব।"

হয়তো ভাবছিলাম তৌফিক লন্ডন থেকে দেশে ফিরবে, কিন্তু তার আগেই না-ফেরার দেশে চলে গেছে।

তৌফিকের সেই কথাটি আমার আজও মনে পড়ে। বন্ধু সাজেদুল হক রিপন মারা যাওয়ার পর ও আমাকে বলেছিল, “আর কোনো বন্ধুকে হারাতে চাই না। তুই সবকিছু ছেড়ে বাকি জীবনটা ভালো থাক, আয় আমরা একসঙ্গে থাকি।"

আমিতো বেঁচে রইলাম রে তৌফিক, কিন্তু তুই তো চলে গেলি। তোর অসমাপ্ত কাজের জায়গা সাংবাদিকতায় আর কেউ পূরণ করতে পারবে না। এখনকার সাংবাদিকতা তো কেবল দলবাজি।

জিয়া শাহীন: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বগুড়া প্রতিনিধি।