তৌফিক ইমরোজ খালিদী: পাঁচ বছরের এক রোমাঞ্চকর আইনি লড়াই
“একদিনের জন্যও তাকে জেলে পাঠাব”—হুমকি আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন উপেক্ষা করে টানা পাঁচ বছরের আইনি যুদ্ধে অপরাজিত তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে তার আইনজীবী নোমান হোসাইন তালুকদারের স্মৃতিকথা।
দক্ষিণ এশিয়ার অনলাইন সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন আধুনিক ধারার পথপ্রদর্শক। চিন্তার তীক্ষ্ণতা, চেতনার দীপ্তি আর মননের গভীরতায় তিনি সাংবাদিকতার প্রথাগত গণ্ডি ছাপিয়ে নিজেকে উন্নীত করেছিলেন অকুতোভয় একজন সম্পাদকের আসনে। ক্ষমতার সামনে নতজানু না হওয়ার যে নৈতিক অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে পাঠক হৃদয়ে দিয়েছে অনন্য ও আপসহীন উচ্চতা।
সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতার বুলি যখন প্রায়শই নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়, তখন তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন ব্যতিক্রমী ও স্পষ্টভাষী। মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আর মুক্তচিন্তার সপক্ষে নিজের পক্ষপাতিত্ব প্রকাশে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি; বরং অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তা উচ্চারণ করেছেন। ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও আজীবন নিজের সেই ঘোষিত সম্পাদকীয় আদর্শ ও নীতিতে অটল থেকেছেন তিনি।
তার সঙ্গে আমার পরিচয়ের শুরুটা অবশ্য অন্যভাবে। একদিন আমার বড় ভাই সুলাইমান নিলয় আমাকে ফোন করে দেখা করতে বললেন। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে জ্যেষ্ঠ আইন প্রতিবেদক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকতা করেছেন, পরে বিডিনিউজের মাল্টিমিডিয়া বিভাগের প্রধান হন। অনেক সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তিনি আমাকে জানালেন, এই মামলার বিষয়ে তৌফিক ভাই ও নিলয় ভাই তাদের পরিচিত কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কেউ তাৎক্ষণিক মামলাটি নিতে রাজি হননি, কেউ আবার কিছুটা সময় নিয়ে পরে অপারগতা জানিয়েছেন।
এরপর ভাইয়া আমাকে বললেন, “এই মামলায় অনেক ঝুঁকি আছে। এরপরও তুই মামলাটি করতে চাস কি না?”
আমি এক মুহূর্তও দ্বিধা করিনি। কারণ আমি জানতাম, তৌফিক ইমরোজ খালিদী কে? আমার কাছে তিনি ছিলেন অকুতোভয় সাংবাদিকতার জীবন্ত প্রতীক, যার নীতি ও আদর্শের পাশে দাঁড়ানোকে আমি নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে করেছিলাম।
পরে অবশ্য হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, তৌফিক ভাইয়ের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন, তারা কতটা প্রভাবশালী এবং এই আইনি লড়াই কতটা কঠিন হতে পারে। কিন্তু তখন আমার কাছে বিষয়টি ছিল একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত। পরে সেই সিদ্ধান্তই আমাকে দীর্ঘ পাঁচ বছরের একটি কঠিন আইনি যাত্রার মধ্যে নিয়ে যায়।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল তৌফিক ভাইয়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তাকে একের পর এক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেয়ার বিক্রির টাকা নিয়ে দুদক তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। পরে মানিলন্ডারিংয়ের প্রশ্নও আসে। নানা দিক থেকে তার বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগও ওঠে।
আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছিল কিছু অভিযোগের ধরন এবং মামলার সময় নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো। একটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলার এজাহারেই সম্পত্তির উৎস সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। তাহলে এটা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হয় কীভাবে? আবার অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল। এসব বিষয় নিয়ে আমরা আদালতে আইনি প্রশ্ন তুলেছি।
তাকে হয়রানি করা হবে, এমন হুমকিও এসেছিল। সংশ্লিষ্ট একজন বলেছিলেন, একদিনের জন্য হলেও তাকে জেলে পাঠাবেন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমরা প্রতিটি মামলায় তাকে জামিন করাতে সক্ষম হয়েছিলাম।
পুরো আইনি যাত্রাটাই ছিল এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের গল্প। একটি মামলায় শুধু আদালতে দাঁড়িয়ে শুনানি করাই সবকিছু নয়। এর পেছনে থাকে টিম স্ট্র্যাটেজি, ওয়ার্কপ্ল্যান, কোন আদালতে কখন কোন আবেদন নিয়ে যেতে হবে, কোন পর্যায়ে কী কৌশল নেওয়া হবে, এসবেরও অনেক হিসাব থাকে। তৌফিক ভাইয়ের মামলাগুলোতে তার ব্রিফ নেওয়া থেকে শুরু করে শুনানির প্রস্তুতি, পুরো টিমের কাজের সমন্বয়, কোন দিন কোন সিনিয়র থাকবেন, এমনকি শুনানির কোন অংশে কে কী বলবেন, সবকিছুই পরিকল্পনা করে এগোতে হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেছে এনএইচ তালুকদার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।
প্রথমে আমরা হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আগাম জামিন পাই। দুদক সেই জামিন বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে যায়। শুনানির সময় আপিল বিভাগের বেঞ্চ দুদকের আইনজীবীকে আদালতের সময় নষ্ট না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এভাবে চলতে থাকলে আদালত কস্ট ইমপোজ করতে পারে।
এরপরও উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে তৌফিক ভাইয়ের জামিন বাতিলের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। কেবল দুদকের এক মামলাতেই মোট আটটি পর্যায়ে আমাদের জামিনের জন্য আদালতে যেতে হয়েছে। অথচ আমার মনে হয়েছে, তার ক্ষেত্রে জামিনের প্রশ্নটিই সামনে আসার কথা ছিল না। কারণ তিনি পালিয়ে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। তাকে গ্রেপ্তারের হুমকির মুখে প্রথমবার আমরা জামিন নিই। পরের সাতবার যেতে হয়েছে জামিন বাতিলের চেষ্টা রুখতে।
কখনও কখনও দীর্ঘ প্রস্তুতির পর শুনানি শেষে আদালত থেকে জয় নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তটি ছিল অসাধারণ। আবার কখনও মনে হয়েছে, পরের লড়াইটি আগেরটির চেয়েও কঠিন।
শেষ পর্যন্ত আমরা তাকে কারাগারে যেতে দিইনি। মামলাটিও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। যে বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে এত কিছু, সেই টাকাও পরে আনফ্রিজ হয়েছে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই পাঁচ বছরে তৌফিক ভাই যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেলেন, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
কোনো মামলা শেষ হয়ে গেলে কাগজে-কলমে একটি আইনি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে তার প্রভাব কি সেখানেই শেষ হয়ে যায়? বছরের পর বছর মামলা, আদালতে হাজিরা, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, জামিন নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, সম্পদ আটকে থাকা, এসবের যে মানসিক চাপ, তার কোনো হিসাব কি হয়?
শুধু তৌফিক ভাই নন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কর্মীরাও এই সময়ের ভোগান্তির বাইরে ছিলেন না। একটি সংবাদমাধ্যমের বিনিয়োগ আটকে গেলে, মালিকানা ও সম্পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিউজরুমে গিয়ে পড়ে। সাংবাদিক, সম্পাদক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সবাই কোনো না কোনোভাবে সেই চাপের মধ্যে ছিলেন।
তাহলে তাদের সেই ভোগান্তির ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
আইনের বিচারে মামলা শেষ হয়েছে। কিন্তু একজন মানুষ ও একটি সংবাদমাধ্যম যে পাঁচ বছর হারিয়েছে, সেই সময় কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব?
দীর্ঘ পাঁচ বছর আদালতের ঘানি টানতে টানতে তৌফিক ভাই মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। একজন সাংবাদিক ও সম্পাদককে তার মূল কাজের বাইরে বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের মধ্যে থাকতে হলে তার ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হয়, সেটি বাইরে থেকে বোঝা কঠিন।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্ব আমার থাকায় তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা হয়েছে। মামলা নিয়ে কথা হয়েছে, আবার মামলা ছাড়িয়েও কথা হয়েছে। সাংবাদিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্র, ইতিহাস, অনেক কিছু নিয়ে।
খুব কাছ থেকে তার মেধা, চিন্তার গভীরতা, আদর্শ, রসবোধ ও স্মার্টনেস দেখেছি। তার সমকক্ষ সাংবাদিক বাংলাদেশে আর আসবে কি না, আমি জানি না।
একদিন আমাকে আফসোস করে বলেছিলেন, “নোমান, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, এটা আমার দুঃখ নয়। দুঃখ হলো, যখন মিথ্যা মামলা হয়েছে, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।”
কথাটি আজও আমার মনে আছে।
তার মৃত্যুর পর গত কয়েকদিনে অনেকে তাকে নিয়ে অনেক কথা লিখছেন। সেটিই স্বাভাবিক। একজন মানুষ চলে গেলে তার কাজ, অবদান ও স্মৃতিগুলো সামনে আসে। কিন্তু আমি সেই সময়টিও ভুলতে পারি না, যখন তৌফিক ভাইকে বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছে। তখন তার পাশে হাতেগোনা আমরা কয়েকজন ছাড়া তেমন কাউকে পাইনি।
আমার মনে হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের পর আওয়ামী লীগ তাদের অনেক প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারও একটি বড় পরিণতি দেখা গেছে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে অনেক মত, অনেক মূল্যায়ন থাকতে পারে। তার সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে কারও সঙ্গে মতভেদও থাকতে পারে। কিন্তু একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে যাননি। এটাই আমার কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমার কাছে তৌফিক ভাই শুধু একজন মক্কেল ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আইনের লড়াই নিয়ে কথা বলেছি, আবার একই মানুষটির সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশ নিয়ে আড্ডা দিয়েছি।
সেই মানুষটি আজ নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার যে জায়গা, সেটি থাকবে। তার কাজের মধ্য দিয়ে, তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে এবং তাকে কাছ থেকে দেখা আমাদের মতো মানুষদের স্মৃতির মধ্য দিয়ে।
তৌফিক ভাই বেঁচে থাকবেন আমাদের মনে।
নোমান হোসাইন তালুকদার: হেড অব চেম্বার, এনএইচ তালুকদার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট; অ্যাডভোকেট, আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
