অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে গতির ঝড় তোলার অপেক্ষায় নরকিয়া
চোটের কারণে দীর্ঘদিন লাল বলের ক্রিকেট থেকে দূরে থাকলেও এখন টেস্ট ক্রিকেটে ফিরতে রোমাঞ্চ নিয়ে তৈরি হচ্ছেন এই গতি তারকা।
চোটজর্জর ক্যারিয়ারটাকে পথে ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট থেকে দূরে আছেন আনরিখ নরকিয়া। লাল বলের ক্রিকেটের সঙ্গে তার সংস্পর্শ নেই গত তিন বছর আট মাসে। তবে সাদা পোশাকের প্রতি পুরোনো সেই অনুরাগ তার হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছে আবার। নতুন মৌসুমের আগে নিজেকে তৈরি করছেন সেভাবেই। টেস্ট ক্রিকেটে ফিরতে রোমাঞ্চ নিতে অপেক্ষায় দক্ষিণ আফ্রিকার এই গতি তারকা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সামনের টেস্ট সিরিজের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাথমিক স্কোয়াডে রাখা হয়েছে নরকিয়াকে। চূড়ান্ত দলেও তিনি থাকার আশা করছেন। তিন ম্যাচের এই সিরিজের পর আগামী মাসে প্রোটিয়ারা টেস্ট সিরিজ খেলবে বাংলাদেশের বিপক্ষেও।
সবশেষ টেস্ট খেলেছেন তিনি ২০২৩ সালের মাচের্রর শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। এরপর আর কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচেও তাকে দেখা যায়নি।
ওই বছরের সেপ্টেম্বরের পর থেকে আর ওয়ানডে ক্রিকেট বা লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও দেখা যায়নি তাকে। চোটের ফাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। ২০২৪ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। এরপর আবার ছিটকে পড়েছেন। ওই বিশ্বকাপ থেকে গত বিশ্বকাপের মাঝে দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন স্রেফ তিনটি। ভারতে বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে ভালো বোলিং করলেও আবার চোটের থাবায় থমকে গেছেন।
আরেক দফা লড়াই শেষে এখন ফেরার কাছাকাছি নরকিয়া। ৩২ বছর বয়সী এই বোলার জানালেন, এবার টেস্ট ক্রিকেটের জন্যই নিজেকে তৈরি করছেন তিনি।
“বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমার প্রস্তুতি চলছে মূলত লাল বলকে ঘিরেই। “লাল বলে স্কিল মেলে ধরা, ধীরে ধীরে এবং সঠিক উপায়ে খেলার পরিমাণ বাড়ানো এবং ওভারের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করাটাই ছিল আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বেশ কিছুদিন ধরেই এটা করে আসছি, সেটা একাই হোক বা অন্য কোনোভাবে।
স্কিল পুনরায় বাড়াতে এবং যেখান থেকে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকে উন্নতি করার জন্য যথেষ্ট প্রচেষ্টা চলছে। এক-দুটি বিষয়ে ঘাটতি ছিল, যা আমি উন্নত করতে চেয়েছিলাম।”
ফেরার লড়াইয়ে নরকিয়া পাশে পেয়েছেন জাতীয় দলের বোলিং কোচ পিট বোথাকে। দুজনই গেবেখায় থাকেন বলে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ মিলেছে।
“তাকে (পিট বোথা) পাশে পাওয়া সবসময়ই দারুণ। আমি নিজেও সম্প্রতি অনেক কিছু করেছি। আগে কখনও এতটা নিজের খেলা রেকর্ড করিনি।
আমার বোলিং অ্যাকশন এবং স্কিলের দিক থেকে কোথায় উন্নতি করতে পারি, তা আমাকে দেখতে হয়েছে এবং কোচ পিটের সাথে এ নিয়ে বেশ ভালোই আলোচনা হয়েছে। আমি নিজেও অ্যালাইনমেন্টের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি এবং বোলিং অ্যাকশনকে আরও ভালো, শক্তিশালী, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য করার চেষ্টা করছি। এরপর এগুলো কোচ পিটের কাছে পাঠাচ্ছি এবং দেখছি সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না।”
পিঠের স্ট্রেস ফ্র্যাকচারসহ গুরুতর সব চোটের ইতিহাস থাকায় বোলিং অ্যাকশনের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে নরকিয়াকে। যদিও তার বোলিং অ্যাকশন ‘চেস্ট-অন’ এবং ‘রিপিটেবল’, তবুও মনে করা হয় যে, মূলত গতির ঝড় তুলতে গিয়েই বারবার চোটের কবলে পড়তে হয়েছে তাকে। সেরা সময়ে তো ১৪৫-১৫০ কিলোমিটার নিয়মিতই ছাড়াতেন, ১৫৫-১৫৬ কিলোমিটারও ছাড়িয়েছেন। সেই গতিই তাকে থমকে দিয়েছে বারবার।
গত তিন বছরে যেহেতু শুধু টি-টোয়েন্টিই খেলেছেন, টেস্টে ফেরার লড়াইয়ে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ লম্বা সময় বোলিং করা। নরকিয়া বললেন, সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের স্বাদ আবার পাওয়াটাই তার মূল প্রেরণা।
“টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কঠিন সময়ের ব্যপারটি ভাবনায় থাকে না। সেখানে শুধু স্কিল প্রয়োগের কথা মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে কঠিন সময়, ভালো সময়, কঠোর পরিশ্রমের কথা ভাবতে এবং মনে রাখতে হয় যে, এগুলোই কিছু সেশন পার করতে সাহায্য করে।
আবার যদি টেস্ট ক্যাপ মাথায় তুলতে পারি, খুবই রোমাঞ্চিত হব। বেড়ে ওঠার সময় তো সবসময় এই সংস্করণ খেলারই তাড়না ছিল। এটিই ছিল অনুশীলনের মূল প্রেরণা।”
টেস্ট ক্রিকেট থেকে নরকিয়ার দূরে থাকার এই সময়টায় দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট দল দারুণ করেছে। গত আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্য যেটি। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষেও উঠেছিল, এখন আছে দুই নম্বরে।
দারুণ করতে থাকা দলটিতে নিজের ছাপ রাখতে চান এই ফাস্ট বোলার।
“গত কয়েক বছরে কোচ শুক্সের (শুকরি কনরাড, প্রধান কোচ) কোচিংয়ে দলের যে উন্নতি হয়েছে, তা অসাধারণ। ওরা যেভাবে খেলেছে এবং যেভাবে কাজগুলো করেছে, তা সত্যিই খুব দারুণ। আশা করি, আমি দলকে সাহায্য করতে পারব এবং এক শতাংশ হোক বা দুই শতাংশ, বাড়তি কিছু যোগ করতে পারব।”
ছেলেরা বেশ উন্নতি করেছে। ওরা অনেক খেলেছে। ওরা খুব ভালো করেছে। ওরা সফল হয়েছে। আশা করি, আমি আরও কিছু যোগ করতে পারব। আবার মাঠে ফিরতে এবং দেশের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করার জন্য মুখিয়ে আছি।”
টেস্ট ক্রিকেটে নরকিয়ার রেকর্ড এমনিতে বেশ ভালো। ১৯ টেস্টে ৭০ উইকেট নিয়েছেন। বোলিং গড় ও স্ট্রাইক রেট দারুণ। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রেকর্ড খুব সুবিধের নয়। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন টেস্টে উইকেট নিয়েছিলেন মোটে সাতটি। তার ওপর দলের অনেক ভরসা থাকলেও তা পূরণ করতে পারেননি।
এবার ঠিক এই সময়টায় তার টেস্টে ফিরতে চাওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ, সামনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ।
“(অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে) একটু বাড়তি এক্স-ফ্যাক্টর বা আগুন আর প্রাণশক্তি বেরিয়ে আসে। সবাই ভালো করতে চায় এবং প্রত্যেকেই ভালো পারফর্ম করতে চায়। এটা একটা বড় সিরিজ।”
নিজেদের মধ্যে দুই দিনের একটি প্রস্তুতি ম্যাচের পর সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোয়াড ১৮ জন থেকে ১৫ জনে নামিয়ে আনা হবে। কাগিসো রাবাদাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি, লুঙ্গি এনগিডি, কোয়েনা মাফাকা ও ওটনিল বার্টম্যান ছিটকে পড়েছেন চোটের কারণে। নরকিয়ার দলে থাকার সম্ভাবনা তাই প্রবল।
তিন ম্যাচের সিরিজ শুরু আগামী শুক্রবার।
