দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট, হৃদয়ের সঙ্গে ‘আলোচনা হয়েছে’ শান্তদের
বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বললেন, তাওহিদ হৃদয় অনুধাবন করতে পেরেছেন নিজের ভুল।
পারফরম্যান্সে কাটাছেঁড়া সাধারণত ম্যাচ শেষেই হয়। তবে কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ম্যাচের ভেতরই ব্যবস্থা নিতে হয়। তাওহিদ হৃদয়কে নিয়ে এমন জরুরি অবস্থাই তৈরি হয়েছিল দলে। তার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে হয়েছে। নিজের ভুল তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন বলেও জানালেন অধিনায়ক নাজমুর হোসেন শান্ত।
৮ উইকেটে পরাজয়ের ম্যাচে অনেক কিছুই ঠিকঠাক হয়নি বাংলাদেশের। বিশেষ করে ব্যাটিং ভালো হয়নি দুই ইনিংসেই। আলাদা করে তাই কারও দিকে আঙুল তোলা কঠিন। তবে দুই ইনিংসেই অবিবেচকের মতো শট খেলে আউট হওয়ায় সমালোচনার কেন্দ্রে আছেন হৃদয়।
শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে দারুণ অবস্থা থেকে হারের পর খোলাখুলিই দলের সমালোচনা করেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক সিকান্দার রাজা। ড্রেসিং রুমে সতীর্থদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথাও বলেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার। মিরপুর টেস্টেও একইভাবে হৃদয়ের সঙ্গে ড্রেসিং রুমে আলোচনা করেন শান্ত।
তবে সংবাদ সম্মেলনে টেস্ট ক্রিকেটে তুলনামূলক নবীন ব্যাটসম্যানকে আগলেই রাখেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উদাহরণ টেনে শান্ত বলেন, ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াবেন হৃদয়।
“দেখুন, একেকজনের খেলা একেক রকম। চার ইনিংস দিয়ে কোনো ব্যাটসম্যানকে আমি বিচার করতে চাই না। কারও করা উচিত নয়। সবাই জানি, ওর (হৃদয়) সামর্থ্য কতটা, ও কত ভালো ব্যাটসম্যান। বিশেষ করে সাদা বলের ক্রিকেটে, এমনকি যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও খেলে, তখনও লম্বা রান করে।
“ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে (টেস্টে) মাত্র চারটা ইনিংস ব্যাটিং করেছে। আমার পুরোপুরি বিশ্বাস আছে যে, ও খুব ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে এবং বড় বড় রান করবে। এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছি না। কারণ, ও এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কত ভালো ক্রিকেটার।”
অধিনায়ক হিসেবে সতীর্থের পক্ষে ব্যাট ধরা শান্তর জন্য স্বাভাবিকই। তবে হৃদয়ের আউট নিয়ে চর্চা সহসাই থামছে না। প্রথম ইনিংসে দল ছিল শক্ত অবস্থানে। আগের দিন পেশির টানে উঠে যাওয়ার পর নতুন দিন তরতাজা হয়ে নামেন হৃদয়। কিন্তু কোনোরকম ক্রিকেটীয় ব্যাকরণের পথ না ধরে অহেতুক স্লগ করতে গিয়ে কুৎসিতভাবে বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি।
দ্বিতীয় ইনিংসের আউট ছিল আরও ব্যাখ্যাতীত। মাথায় আঘাত পাওয়ায় তিন নম্বরে নামা হয়নি মুমিনুলের। শুরুতেই ফিরে যান তানজিদ হাসান। কিছু সময় ক্রিজে কাটিয়ে রস্টন চেইসের বলে বোল্ড হন প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা সাদমানও। প্রমোশন পেয়ে চার নম্বরে নামেন হৃদয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যাটিং। কিন্তু কিসের কী!
দ্বিতীয় বলেই তিনি তেড়েফুঁড়ে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করেন মিড উইকেটের দিকে। টাইমিং হয়নি ঠিকঠাক। বল উঠে যায় আকাশে, জেডেন সিলস ক্যাচ নিতেই বেজে যায় বিদায়ঘণ্টা। ম্যাচের পরিস্থিতি, দলের অবস্থা বা উইকেট-কন্ডিশন; কিছুরই তোয়াক্কা না করে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন ২৬ বছর ছুঁইছুঁই ব্যাটসম্যান।
হৃদয়ের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন শট খেলার সময় অন্য প্রান্তেই ছিলেন শান্ত। হেলমেটের নিচে তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি তখন বোঝা যায়নি। তবে দলের কঠিন সময়ে অমন শট খেলা নিশ্চিতভাবেই হতাশা ঘিরে ধরে বাংলাদেশ অধিনায়ককেও। হৃদয়ের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ তাই অনুভব করে তিনি।
সেই আলোচনার ভিত্তিতে শান্তর বিশ্বাস, পরবর্তীতে এমন পরিস্থিতিতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন হৃদয়।
“অবশ্যই আলোচনা তো হয়েছে, এরই মধ্যে কথা হয়েছে। হৃদয় নিজেও অনুধাবন করতে পেরেছে যে, কী করলে আরেকটু ভালো হতো। হতে পারে (ঠিকভাবে) প্রয়োগের ব্যাপার, হতে পারে ভিন্ন মাইন্ডসেটের ব্যাপার- যেকোনো কিছু হতে পারে।
“আমি এতটুকু বলতে পারি, ও খুব স্মার্ট একটা ছেলে। খুব তাড়াতাড়ি শেখে। ওই জায়গা থেকে আমি বিশ্বাস করি যে, পরবর্তীতে এরকম পরিস্থিতি এলে এক্সিকিউশন হয়তো আরেকটু ভালো করবে অথবা পরিকল্পনা আরও ভালো হবে হৃদয়ের, এটা আমি বিশ্বাস করি।”
হৃদয়ের অমন শট বাংলাদেশের জন্য যতটা ছিল হৃদয়বিদায়ক, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য ঠিক ততটা স্বস্তি ও আনন্দের। তবে সফরকারীদের জন্য মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না হৃদয়ের তেড়েফুঁড়ে খেলার চেষ্টা। বরং চেইস বললেন, হৃদয়ের সঙ্গে খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে উইকেট নিয়েছেন তিনি।
“পুরো ব্যাপারটাই মোমেন্টামের। আমরা যখন দুটি উইকেট তুলে নিলাম... হৃদয়কে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, বিপিএলে ওর সঙ্গে খেলেছি। আমি জানি, ও বেশ আক্রমণাত্মক, ক্রিজে নেমেই পাল্টা আক্রমণ করতে পছন্দ করে। তাই ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ও যদি আগ্রাসী হয়ে পাল্টা লড়াই করতে চায়, আমি ওকে সেটাই করতে দেব।
“বাংলাদেশ যখন চাপে এবং খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই, তখন ও যদি আমাদের ওপর চড়াও হতে চায়, সেই সিদ্ধান্ত ওরই। ও আক্রমণ করল, শটটি যদি কাজে লেগে যেত তো গেল, তবে ওকে দেখাতে হতো যে, ও কাজটা স্বাচ্ছন্দে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই করছে। তাই ওর ওই শট দেখে অবাক হইনি। কারণ আগেই বলেছি, আমি জানি, ও আক্রমণাত্মক খেলতে ভালোবাসে। তবে এবার আর সেই পরিকল্পনা কাজে আসেনি।”
যাকে নিয়ে এত কথা, সেই হৃদয়ের এই ম্যাচটি খেলারই কথা ছিল না। ম্যাচের আগেরদিন নেট সেশনে আঙুলে চোট পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে ছিটকে যান মুশফিকুর রহিম। তাই অপ্রত্যাশিতভাবেই নিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়ে যান হৃদয়। প্রথম ইনিংসে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের অভাব পূরণের কাজটা ঠিকঠাক করছিলেন তিনি। তবে ক্র্যাম্প করায় ছেদ পড়ে ব্যাটিংয়ে। এরপরই দুই ইনিংসের দুটি কল্পনাতীত শট!
পরে ফিল্ডিংয়ের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ায় দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিংয়ে মুমিনুলকে পায়নি বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে নিজেদের কিছুটা দুর্ভাগাই মনে করছেন শান্ত।
“মুশফিক ভাই না থাকা অবশ্যই অনেক বড় একটা... মানে মিস করেছি আমরা। এমন একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার, তার ওপর এমন একটা কন্ডিশন। উনি থাকলে অবশ্যই ভালো হতো। উনার জায়গায় হৃদয় এসেছে।
“প্রথম ইনিংসে হৃদয় যতক্ষণ ব্যাটিং করেছে ক্র্যাম্প করার আগপর্যন্ত আমার মনে হয়, খুব ভালো ব্যাটিং করছিল। দুর্ভাগ্যবশত তারপর বড় করতে পারেনি। দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুল ভাইকে আমরা মিস করেছি। সব মিলিয়ে বলব যে, এই ম্যাচটা খারাপ খেলেছি, কিছু কিছু জায়গায় দুর্ভাগাও ছিলাম।”
