২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

ডোনাল্ড মিলার: গল্প বলার শিল্প

আমরা গল্প শুনতে পছন্দ করি, যেভাবে আমরা পছন্দ করি মুখরোচক খাবার খেতে। মানুষের মনে গল্প শুনার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। গল্প এমনই এক বিস্ময়কর জাদু, বহুবার শোনার পরও যার আবেদন কখনো ফুরায় না।

ডোনাল্ড মিলার: গল্প বলার শিল্প

ছবি:নেট থেকে নেয়া

এনামুল আহসান এনামুল আহসান

Published : 24 Oct 2026, 03:07 PM

Updated : 24 Oct 2026, 03:07 PM

ডোনাল্ড মিলার (জন্ম- ১৯৭১) একজন জনপ্রিয় আমেরিকান লেখক। গল্প কী করে বলতে হয় এটাই তার আগ্রহের বিষয়। শুধু সাহিত্যের গল্প না, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থেকে পারিবারিক, দৈনন্দিন, সামাজিক জীবনে গল্প বলার মাধ্যমে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করা যায় তা নিয়ে তিনি জনসম্মুখে বক্তব্য দেন। স্টোরিব্রান্ড একটি মার্কেটিং কোম্পানি, তিনি এই কোম্পানির সিইও। কী করে গল্প বলতে হয়, এ-বিষয়ে তার বেশ কিছু বেস্টসেলার বই আছে। হাউ টু টেল এ স্টোরি তার সমস্ত গবেষণার নির্যাস-সংবলিত একটি ছোট্ট পুস্তিকা। লেখাটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন এনামুল আহসান।

মূল: ডোনাল্ড মিলার

অনুবাদ - এনামুল আহসান

ভূমিকা

গল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ? গল্প কেমন করে হয় তার অনেক সংজ্ঞা আছে।

দার্শনিক প্লেটো থেকে শুরু করে আমেরিকান কৌতূক অভিনেতা ও লেখক উইয়ার্ড আল ইয়নকোভিচ প্রত্যেকেই গল্প কেমন করে তৈরি হয় এ নিয়ে কথা বলেছেন। আপনি যদি এই বইটি পড়তে শুরু করেন, হতে পারে আপনি গল্প নিয়ে জটিল কোনো সংজ্ঞা খুঁজছেন না, হয়তো সাধারণভাবেই আপনি জানতে চাচ্ছেন কীভাবে একটি গল্প তৈরি হয়, কীভাবে লেখকরা এতো সুন্দর করে গল্প লিখেন, কীভাবে তাদের লেখা গল্প মানুষের মনে গেথেঁ যায়, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, কীভাবে আমিও একটি এরকম দারুণ গল্প বলতে পারি। আপনার মনেও আসতে পারে দারুণ কোনো গল্পের ছক। যদি এরকমটি হয় আপনার মনের ধারণা, তাহলে আমি আনন্দিত হবো। একটি ভালো গল্প বলা ও লেখা নিয়ে আমিও একইরকম আগ্রহী।

আপনি যদি একজন বক্তা হন, যিনি কথা বলে শ্রোতাদের মন জয় করতে চান, আপনি হতে পারেন কোন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা, যিনি নতুন কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গল্পের মতে করে উপস্থাপন করতে চান বড় কোনো কোম্পানির কাছে। হতে পারেন কোনো লেখক, যিনি নতুন কোনো উপন্যাস লিখতে চান, বা আপনি আপনার সন্তানকে সুন্দর কোনো গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতে চান- তাহলে এই বইটি আপনার জন্য। এই বইটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা আপনাকে নতুনভাবে কোনো গল্প বলতে সাহায্য করবে।

মনোবিজ্ঞানী ইউরি হ্যাসন, যিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তিনি অনেকদিন যাবৎ পর্যবেক্ষণ করছিলেন গল্প শুনলে ও গল্পভিত্তিক কোনো দৃশ্য দেখলে মানুষের মস্তিষ্কের ইমেজ কীরকম হয়। তার ২০০৮ সালের করা গবেষণায় দেখা যায় যে, আমরা যখন টেলিভিশনে কোনো কিছু দেখি তখন আমাদের মস্তিষ্ক মোটেও নির্জীব অবস্থায় থাকে না। বরং আমরা কী দেখছি তার উপর নির্ভর করে আমাদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে সচল থাকে।

এক রবিবার সকালে নিউ ইয়র্কের ওয়াশিংটন স্কয়ার পাকে ১০ মিনিটের একটি ভিডিও দেখানো হয়েছিল। বেশির ভাগ মানুষই তখন মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনি। নীরসভাবে দাড়িয়েছিল সবাই। পরীক্ষা করে দেখা যায়, কনসার্ট দেখতে আসা মানুষের মাত্র ৫% মস্তিষ্কের কর্টেক্স সক্রিয় ছিল। বেশিরভাগ মানুষই কনসার্টটি উপভোগ করছিল না। একটা গবেষণার কাজে এই কাজটি করা হয়েছিল।

কিন্তু ইউরি হ্যাসন যখন দর্শকদের অ্যালফ্রেড হিচককের ‘ব্যাং! ইউ আর ডেড’ মুভিটি দেখান তখন দেখা যায় দর্শকদের মস্তিষ্কের ৬৫% অংশ সক্রিয়। তাহলে বলা যায়, গল্প মানুষের মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে তোলে। গল্পের মধ্যে জীবন্ত এক শক্তি আছে যা মানুষের মস্তিষ্ককে সচল করে।

সিনেমার টিকেট বিক্রি করে প্রতিবছর বক্স অফিস থেকে ৪৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়। এর মানে দাঁড়ায়, আমরা গল্প শুনতে পছন্দ করি, যেভাবে আমরা পছন্দ করি মুখরোচক খাবার খেতে। মানুষের মনে গল্প শুনার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। গল্প এমনই এক বিস্ময়কর জাদু, বহুবার শোনার পরও যার আবেদন কখনো ফুরায় না। গল্পকে আমরা দেখতে বা ছুঁতে পারি না, তার মানে এই না যে গল্প ক্রয়-বিক্রয় হতে পারে না। লেখক জর্জ লুকাস তার ‘স্টার ওয়ারস’ ছবির কাহিনী আর চরিত্রগুলো দ্য ডিজনি কোম্পানির কাছে বিক্রি করেছিলেন ৪ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু তিনি আসলে কী বিক্রি করেছিলেন? জর্জ লুকাস আসলে বিক্রি করেছিলেন কাগজে লেখা তার আইডিয়া। তিনি তার কল্পনার কাল্পনিক জগত বিক্রি করেছেন। বস্তুত, ডিজনি কোম্পানির সাথে করা চুক্তিতে লুকাস ৩০ হাজারের বেশি গ্রহ বিক্রি করেছিলেন, যেগুলোর আসলে অস্তিত্ব নেই। তিনি আসলে কী বিক্রি করেছিলেন? তিনি বিক্রি করেছিলেন গল্প।

গল্প শুধু মানুষকে আনন্দই দেয় না, এর চেয়েও বেশি কিছু দেয়। আপনি যদি মানুষকে কোনো জটিল ধারনা বোঝাতে চান তাহলে সেই জটিল বা কঠিন ধারনাটি নিয়ে একটি গল্প বলুন। সবাই বুঝতে পারবে। গল্প বলার সময় যখন কেউ আপনার গল্প শুনছে তখন তাদের মনে ‘ক্লিকিং অভিজ্ঞতা’ তৈরি করে। ‘ক্লিকিং অভিজ্ঞতা’ মানে আচমকা তারা বুঝতে পারে গল্পের মাধ্যমে তাদের কী বোঝানো হচ্ছে। এতে মানুষ সহজেই ধরতে পারে গল্পটির সারমর্ম। নিজের জীবনের সাথে মিলাতে পারে। তাই যারা ভালো গল্প বলতে পারে তারা মানুষদের সাথে খুব দ্রুত, গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

গল্প মানুষের মনে যে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে তা এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে শুরু করেছে। সম্প্রতি হার্ভাড বিজনেস রিভিউতে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গল্পই হলো মার্কেটিংয়ের ভবিষৎ। এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কেইথ কিউসেনবেরি, যিনি জন হপকিন্স সেন্টার ফর লিডারশীপ এডুকেশনের একজন লেকচারার, তিনি আমেরিকান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ খেলা যা আমেরিকায় বলা হয় সুপার বোল, এই সুপার বোল খেলা চলাকালীন সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন বিরতির সময় প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলোতে দারুণ সব গল্প থাকে। এরকম করে তিনি প্রায় ১০০ টি বিজ্ঞাপন নিয়ে গবেষণা করেন এবং তিনি একটি বিষয় খেয়াল করেন যে যেসব বিজ্ঞাপনগুলোতে স্পষ্ট ও দারুণ সব গল্প থাকে সেগুলো ভাইরাল হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ সুন্দর গল্প বিজ্ঞাপনে থাকলে তা মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে যায়। কেইথ কিউসেনবেরির এই ধারনা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।

আমেরিকার এক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে একটি ছোট্ট কুকুরছানা ও একটি ঘোড়ার বন্ধুত্ব দেখানো হয়। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের এই বিজ্ঞাপনে একটি সিনেমার গল্পই তুলে ধরা হয়েছিল, আর বিজ্ঞাপণটি ছিল একটি বিয়ারের। ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে কোনো অল্প পোশাকের নারী মডেল আর চটকদার কোনো কৌতুক দেখাতে হয়নি। এগুলো ছাড়াই বিজ্ঞাপনটি মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছিল।

সাধারণত বেশিরভাগ মানুষই মনে করে, ভাইরাল বা সফল বিজ্ঞাপন মানেই যেন যৌন আবেদন, হাস্যরস বা মজার কোনো কৌতুক, কিন্তু আসলে তা নয়। কিউসেনবেরি বলেন, একটি চমৎকার বিজ্ঞাপন তৈরির আসল রহস্য হলো বিজ্ঞাপনটিতে ভালো গল্প থাকা।

একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনগুলোতে যত বেশি ভালো গল্প তুলে ধরতে পারে, তত দ্রুত সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে আর রেটিং জরিপে সেই বিজ্ঞাপনগুলোই মানুষ বেশি পছন্দ করে। ভালো গল্প থাকলে মানুষরা সেই বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে পছন্দ করে, দেখতে চায় আর সবার সাথে শেয়ার করে।

যোগাযোগের এক অসাধারণ মাধ্যম হলো গল্প। গল্পের মাধ্যমে আমরা শিখতে পারি জীবনের নানা কিছু। গল্প আমাদের ক্লান্ত মনকে শান্ত করে, গল্প আমাদের আনন্দ দেয় এবং অন্য মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তুলতেও গল্প আমাদের সাহায্য করে। অপরদিকে, গল্প বড় ধরনের ক্ষতিও করতে পারে। গল্প হলো এমন এক হাতিয়ার যা ভুল মানুষের হাতে পড়লে পুরো একটি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমাকে এমন একজন দুর্নীতিপরাণ ও ভয়ংকর স্বৈরশাসক দেখান যে ক্ষমতার শিখরে উঠে এসেছে, আর আমি আপনাকে সত্যটা বলব, একজন ভয়ংকর স্বৈরশাসক আসলে অসাধারণ গল্প বানাতে পারে। ভালো গল্প বলতে পারা একজন স্বৈরশাসকের জন্য শক্তিশালী এক হাতিয়ার।

রবার্ট ম্যাককি যিনি সমকালীন বিশ্বের একজন প্রভাবশালী গল্পতত্ত্ব বিশ্লেষক, তার মতে, গল্প আমাদের মস্তিষ্কে একটি ভালো-মন্দের দিকনির্দেশনা তৈরি করে। রবার্ট ম্যাককি বলেন, গল্প থেকে আমরা শিখি জীবনে কোন জিনিসটি মূল্যবান, আর কোন জিনিসটি তুচ্ছ। গল্প থেকে আমরা শিখি কীসের জন্য বাঁচতে হবে আর কীসের জন্য মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

গল্প এখন আর শুধু শিল্পীদের মাধ্যম নয়। সাধারণ মানুষরাও ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে যে গল্পকাররা একটি পুরো সংস্কৃতির কাঠামো গঠন করে। তাই ব্যবসায়িক নেতা, ধর্মীয় নেতা এবং বাবা-মায়েরাও ভাবতে শুরু করেছেন কীভাবে তারা তাদের যোগাযোগ পদ্ধতিতে আরো বেশি গল্প ব্যবহার করতে পারেন। আর তারা যদি এই পথটি অনুসরণ করেন তাহলে সবাই এর মাধ্যমে উপকৃত হবে।

সৌভাগ্যবশত, গল্প বলা এমন একটি দক্ষতা যা আমরা শিখতে পারি। গল্প বলা একটি শিল্প, আর এই শিল্পের কিছু কাঠামো ও নিয়ম আছে। যদি এই শিল্পের কাঠামো, গঠন ও নিয়ম ভালোভাবে আয়ত্ত করা যায়, তাহলে একজন অভিজ্ঞ গল্পকার হাজারো মানুষকে মুগ্ধ করতে পারবে। এমনভাবে মুগ্ধ করতে পারবে যেন পাঠক হবে তার কাছের কয়েকজন বন্ধুর মতো, শীতের কোনো রাতে আগুনের চারপাশে সবাই একসাথে জড়ো হয়ে বসে গল্প শুনছে। গল্পের এমনই শক্তি।

যারা ভালো গল্প বলতে চান আমার এই বইটি তাদের জন্য। গল্প বলার সহজ নিয়মগুলো নিয়ে বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে। সহজ হলেও গল্প বলার এই কাঠামোগুলো খুবই প্রভাবশালী। আমি যে সহজ প্লট বা কাহিনীর কাঠামো আমার বইতে তুলে ধরছি, আপনি যদি একবার আয়ত্ত করতে পারেন তাহলে আপনার কাছে সিনেমা দেখা, বই পড়া, টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখা বা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনা আর আগের মতো লাগবে না। আপনি ধীরে ধীরে এসব বিষয়র ভেতরের ধরণগুলো বুঝতে পারবেন। এবং যখন বুঝতে পারবেন তখন আপনার নিজের যোগাযোগের মধ্যেও সেগুলো ব্যবহার করতে পারবেন।

আমার প্রত্যাশা, আপনি যেন আপনার চারপাশের জগৎকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারেন। মানুষের সাথে আরো ভালোভাবে যুক্ত হতে পারেন। এবং আপনি যে-ভালো কাজগুলো পৃথিবীতে করতে চান, লিখতে চান সেগুলো যেন একটি সুন্দর গল্পের মতো করে বিকশিত হয়।

ভালো গল্প বলার জন্য শুভকামনা।

বিণীত

ডোনাল্ড মিলার

অধ্যায়: ১

একটি ভালো গল্প এমনি এমনি তৈরি হয় না

গল্প নিয়ে আমি সবচেয়ে সুন্দর যে-কথাটি শুনেছি তা হলো- গল্প তা-ই যার মাধ্যমে আমরা জীবনকে খুঁজে পাই। জীবনকে আমরা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি গল্পের মাধ্যমে। গল্পের প্রতি মানুষের এতো আকৃষ্ট হওয়ার কারণ গল্পের মধ্যে মানুষ তার জীবনকে স্পষ্ট আর পরিষ্কারভাবে দেখতে পায়।

যখন আমরা একটি গল্প পড়ি বা শুনি তখন আমরা জানতে পারি- চরিত্রগুলোর নাম, তারা কী চায়, তারা কোন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। আমরা এটাও জানতে পারি, গল্পের নায়ক যদি সফল হয় তাহলে কী ঘটবে, আর নায়ক যদি ব্যর্থ হয় তাহলে তার ওপর কী ধরনের বিপদ বা দুঃখ নেমে আসবে। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবন এরকম নয়। বেশিরভাগ মানুষের জীবন ধীর এবং বেশিরভাগ মানুষই বুঝতে পারে না প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তার কোন কাজটি করা দরকার, তার জীবনে কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তারা সফল বা ব্যর্থ হলে তার পরিণাম কী হবে। এক্ষেত্রে, গল্প আমাদের জীবনের একটি পরিষ্কার ও সংক্ষিপ্ত রুপ দেখায়, আর এই কারণেই মানুষ গল্পের প্রতি এতো আকৃষ্ট হয়।

এটি সত্যি যে মানুষ সহজ জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয় আর জটিলতা থেকে দূরে থাকে।

একটি ভালো গল্প হওয়া উচিত পরিষ্কার ও স্পষ্ট। গল্প যত এলোমেলো হয় তত সেটি জটিল হয় এবং মানুষ সহজেই তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যখন আমি বলি গল্পটি পরিষ্কার হওয়া উচিত, তখন আমি বোঝাতে চাই- গল্পটিতে ঘটনার ধারাবাহিকতা থাকবে যা পাঠক পড়ে সহজেই বুঝতে পারবে এবং গল্পের সাথে নিজের জীবনের একটা মিল পাবে। তাহলে আমরা কিভাবে কোনো জটিলতা ছাড়া সহজ ও পরিষ্কারভাবে একটি গল্প বলবো?

জটিলতা ছাড়া সহজেই গল্প বলার কৌশলটি এই: একটি গল্পে ঘটনাগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজানো থাকে। প্রতিটি ঘটনা পরের ঘটনার সাথে যুক্ত থাকে এবং গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আসলে গল্পের একটি গঠন থাকে এবং সেই গঠনের অনেক ধরণ আছে। যেমন- এক ভাগের গল্প, তিন ভাগের গল্প, পাঁচ ভাগের গল্প, আবার কিছু গল্পে নির্দিষ্ট কোনো গঠন থাকে না। যখন হলিউডের কোনো চিত্রনাট্যকার সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন তখন তিনি চিত্রনাট্যটি ধারাবাহিকভাবে সাজান, যাতে করে সিনেমার গল্প খুব বেশি জটিল বা এলোমেলো না হয়ে যায়। চিত্রনাট্যটি এমন হতে পারে- প্রথম পৃষ্ঠায় থাকতে পারে সিনেমার নায়কের পরিচয়। তৃতীয় পৃষ্ঠায়, নায়ককে এমন একটি ভালো কাজ করতে হয় যাতে দর্শক তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। ষষ্ঠ পৃষ্ঠায়, নায়ককে কোনো সমস্যায় বা বিপদে পড়তে হয়। এইভাবেই গল্প ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়।

আসলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গল্প নিয়ে গবেষণা করার পর আমি বুঝেছি যে, হলিউড সিনেমা টমি বয়, স্টার ওয়ার্স রেবেল এসাল্ট, দ্যা হাঙ্গার গেমস্ সিনেমাগুলোর মূল কাঠামো প্রায় একই রকম। শুধু ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র এবং ভিন্ন সমস্যাকে সেই একই কাঠামোর মধ্যে বসিয়ে দিলেই একটি সফল সিনেমার গল্প তৈরি হয়ে যায়।

আপনি গল্পের কাহিনীকে অনেকটা সঙ্গীতের স্কেলের মতো ভাবতে পারেন। ধরুন, আমি একই সাথে গিটার, ডাম্প-ট্রাক বাজাচ্ছি আর আমার পাশেই একটি শিশু কান্না করছে, আপনি কি এটাকে সঙ্গীত বলবেন? আপনি এটাকে বলবেন শব্দের গোলমাল।

তাহলে প্রশ্ন হলো, সঙ্গীত আর শব্দের গোলমালের মধ্যে পার্থক্য কী? দুটোই তো বাতাসে তৈরি হওয়া কম্পন, যা আপনি শুনছেন। সঙ্গীত এবং শব্দের গোলমাল-এর মধ্যে পার্থক্য হলো এদের গঠনে। শব্দ তখনই সঙ্গীত হয়ে ওঠে যখন সেটি কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। হারমোনিকস, মেলোডি ইত্যাদি আসলে এমন শব্দ যেগুলোকে নিয়মের মধ্যে এনে সঙ্গীতে রূপ দেওয়া হয়েছে। তাহলে কি সব সঙ্গীত বা মিউজিক একই ধরনের নিয়ম মেনে চলে? একেবারেই না। সঙ্গীতের স্কেল ও এর গঠনের ভেতর অসীম সৃজনশীলতার জায়গা রয়েছে। এই সৃজনশীলতার নিয়মগুলো যদি ভেঙ্গে ফেলা হয়, তাহলে সঙ্গীত খুব দ্রুতই আবার শব্দ দূষণে পরিণত হবে।

গল্প জিনিসটাও সঙ্গীতের মতো। গল্পে ঘটনাগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে বলা যায়। এলোমেলো ঘটনাগুলো তখনই গল্প হয়ে ওঠে যখন সেগুলোকে সংগঠিত করে গুছিয়ে একটি প্লট বা কাহিনীর মাধ্যমে বলা হয়। সঙ্গীতের মতো গল্প বলার নিয়মের মধ্যেও অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। আসল কথাটি হলো এই যে, ভালো গল্প হঠাৎ করে তৈরি হয় না।

একটি ভালো গল্প লেখার পিছনে পরিকল্পনা থাকে, ভাবনা-চিন্তা থাকে, গল্প লেখার পর পরিমার্জন করা হয়, সঠিকভাবে সম্পাদনা করা হয় যাতে গল্পটি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। ভালো গল্পে অপ্রয়োজনীয় জিনিস থাকে না। মানুষ সেই গল্পের প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়, যে গল্প লেখা হয় সবচেয়ে সহজ আর পরিষ্কারভাবে। অ্যাকশন বা কমেডির চেয়ে মানুষ সহজবোধ্য পরিষ্কার গল্পই বেশি পছন্দ করে।

পরের অধ্যায়ে আমি এমন একটি কাহিনী কাঠামো দেখাব, যেখানে আপনি বিভিন্ন চরিত্র, এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং সমাপ্তি অংশ বসিয়ে নতুন গল্প তৈরি করতে পারবেন। এমনকি আপনি চাইলে, আমার কাহিনী কাঠামোর আলোকে আপনার সারাদিনের ঘটনাবলী সাজিয়ে কাছের কাউকে বলতে পারেন, তারা আরও আগ্রহ নিয়ে শুনবে।

অধ্যায়: ২

গল্প বলার জন্য আমি যেই কাঠামোটি ব্যবহার করি

অল্পকথায় বলতে গেলে, গল্পের কাঠামোর ব্যাপারে আমি এমন একটি নিয়ম বা কৌশল তৈরি করেছি যা আমাকে গল্প বলতে সাহায্য করে। একটি সহজ ৭ ধাপের প্রক্রিয়া, যা আমি আমার সব বইয়ে ব্যবহার করেছি। জাতীয়ভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমায় সহকারী লেখক হিসেবে, একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের জন্য লেখা গানের কথায়, এমনকি বহু-বিলিয়ন ডলারের বিপণন, বিজ্ঞাপনের কাজে আমি আমার সহজ ৭ ধাপের লেখার কৌশল প্রয়োগ করেছি।

আমার এই লেখালেখির কৌশলটি এতই সহজ যে, এটি আমার কাছে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সারাদিনের কাজ শেষে বাসায় ফেরার পর, আমি আমার তৈরি করা সেই কাহিনী কাঠামো অনুযায়ী পুরো দিনের ঘটনা মনে করি। অনেক সময় নিজেই বুঝতে পারি না যে আমি আমার তৈরি করা কৌশলটি নিজের ওপরই প্রয়োগ করছি। যখন নীরবে বসে ভাবি, তখন আমার স্ত্রীও বুঝতে পারে আমি কী করছি। সে বুঝতে পারে আমার সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে আমি ভাবছি, এলোমেলোভাবে নয়, সহজ স্বাভাবিকভাবে। ব্যপারটি যে বিরুক্তিকর নয় আমার স্ত্রী বুঝতে পারে।

এবার তাহলে বলি আমার তৈরি সহজ কৌশলটি যা আমি ব্যবহার করি:

সিনেমা বা গল্পে মূল চরিত্রটি সমস্যার মধ্যে থাকে, এর থেকে মুক্তি পেতে সে একজন মেন্টর বা পথপ্রদর্শকের সাথে সাক্ষাৎ করে, মেন্টর বা পদপ্রদর্শক তাকে একটি পরিকল্পনা দিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করতে বলে। পরিকল্পনার অনুযায়ী কাজ করার ফলাফল হয় সুখকর অথবা দুঃখজনক কোনো পরিণতি।

উপরের এই দুইটি বাক্যই আমার সিনেমার কাহিনী আর গল্প লেখার কলা-কৌশল। এই দুইটি বাক্যের মাঝে লুকিয়ে আছে হাজারো হলিউড সিনেমার প্লট বা কাহিনী। হলিউড মুভি ‘স্টার ওয়ার্স থেকে হাঙ্গার গেমস্’ আমার উল্লেখ করা কৌশল বা কাঠামোর সাথে মিলে।

হলিউড মুভি ‘স্টার ওয়ার্স’-এ দেখা যায়, সিনেমার নায়ক লুক স্কাইওয়ালকার শত্রু-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়, কিন্তু সে আবার এটাও জানতে চায় সে কি শক্তিশালী যোদ্ধা বা নাইট হতে পারবে? লুক একজনের সাথে সাক্ষাৎ করে যার নাম ইয়োডা, যার কাছ থেকে লুক আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা আর প্রশিক্ষণ পায়, লুক শত্রুদের পরাজিত আর ‘ডেথ স্টার’ ধ্বংস করে। লুক ‘ডেথ স্টার’ ধ্বংস করে বিদ্রোহীদের বাঁচিয়ে রাখে যাতে তারা আবার প্রয়োজনের সময় সংগ্রাম করতে পারে। সবশেষে একটা সুখের সমাপ্তি ঘটে।

এবারে আমরা ‘হাঙ্গার গেমস্’ সিনেমার কাহিনীর কাঠামোটা দেখি।

‘হাঙ্গার গেমস’ সিনেমাটাতে দেখা যায়, ক্যাটনিস চরিত্রটি খেলায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে এবং টিকে থাকার জন্য তার সাহায্য দরকার, সিনেমায় ক্যাটনিসের সাথে থাকা ‘হেমিচ’ ক্যাটনিসকে সাহায্য করে, তাকে আত্মবিশ্বাস ও পরিকল্পনা দেয়। সিনেমায় খেলার নিয়মটি ছিল এমন যে খেলায় টিকে থাকতে হলে ক্যাটনিসকে জনসাধারণের প্রিয় হয়ে উঠতে হবে যাতে তারা ক্যাটনিসকে স্পনসরশিপ দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাটনিস খেলায় অংশগ্রহণ করে, অনেক সংগ্রাম করে খেলায় টিকে থাকে, সবশেষে সে সফল হলে সিনেমায় একটা সুখের সমাপ্তি ঘটে। ক্যাটনিস বেঁচে থাকে আরেকটা সংগ্রাম করার জন্য, আর তার পরিবারের জন্য সে নতুন আশা নিয়ে আসে।

উপরের লাইনগুলোতে আমি যা বললাম তা হয়তো গল্প লেখার একমাত্র কৌশল না, আরো হয়তো অনেক কৌশল বা কাঠামো থাকতে পারে। কিন্তু আমি যা আলোচনা করলাম উপরোক্ত সিনেমা দুটির ব্যাপারে আমার জন্য এই টেকনিক বা কৌশলটাই ভালো কাজ করে।

আপনি যদি আমার টেকনিক বা কৌশলটি পছন্দ করে থাকেন তাহলে আপনি এটি আপনার ব্যক্তিজীবনে নানা সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে পারেন। মানুষ তার নিজের জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা বা স্মৃতিকে গল্পের কাঠামোতে লিখে দেখলে সে তার অতীত জীবনকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবে।

আমি কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করছি:

১) আপনার পরিচয় কী ছিলো আর জীবন থেকে কী চেয়েছিলেন?

২) আপনি কি ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আপনার কেমন ধরণের অনুভূতি হয়েছিল?

৩) জীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সময় আপনি কার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বা কী ধরণের বই পড়েছিলেন যা আপনাকে সাহায্য করেছিলো?

৪) আপনার গাইডের সাথে সাক্ষাৎ করার পর কী ধরণের পরিকল্পনা করেছিলেন?

৫) পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার পর কী ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছিল?

৬) যদি ব্যর্থ হতেন তাহলে কী হারাতেন?

৭) আপনার সমস্যাগুলো থেকে ভালোভাবে মুক্তি পেয়েছিলেন, শেষটা সুখের ছিল কি?

উপরের উল্লেখিত পয়েন্টগুলো কীভাবে কাজ করে তার একটা উদাহরণ:

১) কলেজে পড়ার সময় আমি একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করতাম।

২) মেয়েটার সাথে আমার তেমন দেখা বা কথা হতো না। আমার নামটাও সে মনে রাখতে পারতো না।

৩) মেয়েটার রুমমেট আমার সাথে গণিত ক্লাস করতো। সে বুঝতে পেরেছিল আমার ব্যাপারটি। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম আমি যাকে পছন্দ করি সে ফুটবল খেলা পছন্দ করে। তাই সে আমাকে পরামর্শ দিল আমি যেন একসাথে একটা ফুটবল ম্যাচ দেখার অফার করি মেয়েটাকে। তাহলে আমাদের নিয়মিতো দেখা-সাক্ষাৎ হতে পারে।

৪) আইডিয়াটি ভালো লাগল। কিন্তু আমার সরাসরি প্রস্তাব দিতে ভয় লাগছিল। তাই কলেজ ক্যাম্পাসে একটি ফুটবল দলের জার্সি পড়ে মেয়েটির আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এভাবে মেয়েটি দেখতে পেলো একদিন। তারপর তার সাথে ফুটবল ম্যাচ নিয়ে আধা ঘন্টা কথা হলো। সেদিন সে আমার নামটি মনে রাখতে পেরেছিল।

৫) তারপর একদিন তাকে বললাম, একসাথে একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাওয়ার কথা। তখন আমেরিকান সকার লীগের ম্যাচ চলছিল। সে রাজি হলো। আমরা একসাথে গেলাম খেলা দেখতে। আমাদের মাঝে একটি ডিল হলো, যার পছন্দের দল জিতবে সে কফি খাওয়াবে। সে রাজি হলো।

৬) এভাবেই মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব বাড়তে লাগলো। প্রায়ই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়া শুরু হলো তারপর থেকে।

৭) সে তারপর আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠল।

উপরে পয়েন্ট আকারে যা বললাম এটাই মূল কথা। যা তুলে ধরলাম তা একটি সহজ ছোট গল্প। গল্পটি হয়তো কোনো পুরষ্কার পাবে না, কিন্তু এটি একটি গল্প। সংখ্যাগুলো বাদ দিয়ে আপনি উপরের লাইন থেকে কথাবার্তার মতো করে কারো সাথে বলে যান, দেখবেন মানুষ বুঝতে পারছে। আর এভাবেই সহজ গল্প বলার মাধ্যমে আপনি আপনার চারপাশের মানুষের সাথে আরো ভালোভাবে মিশতে পারবেন।

পয়েন্ট আকারে লেখা উপরের লাইনগুলো চাইলে আরো নাটকীয় করা যায়। এতে গল্পে বেশি করে মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। এমন হতে পারে, তারা দুইজন যখন ফুটবল খেলা দেখছে তখন একজনের গায়ে বলের আঘাত লাগতে পারে, অথবা তারা যখন কফি পান করতে যাবে তখন মেয়েটির সাথে কফি শপের কেউ বিশ্রি কোনো কৌতুক করতে পারে, আর ছেলেটি সাথে সাথেই প্রতিবাদ করবে। এতে করে গল্পে একটা সংঘর্ষ নিয়ে আসা যায়। কল্পিত গল্পে-উপন্যাসে এভাবে একটা টেনশন বা উত্তেজনা তৈরি করা হয়।

মূল কথা হলো, গল্পের একটি কাঠামো থাকে অর্থাৎ গল্পের একটি ধারা বা বিন্যাস থাকে যা গল্পকে সহজবোধ্য ও সুস্পষ্ট করে তোলে। আমি আমার তৈরি করা কাঠামো বা ধারা অনুযায়ী গল্প বলি, কারণ তখন আমার গল্প হয়ে উঠে সুস্পষ্ট আর আকর্ষণীয়।

আপনিও নতুন কোনো গল্পের কাঠামো তৈরি করে নিজের মতো একটি গল্প লিখতে পারেন বা আমার মতো করেও লিখতে পারেন।

যদি আপনি ভালো লিখে থাকেন তাহলে পাঠক আপনার লেখার কাঠামো বা স্টাইলের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখবে না, পাঠকের চোখ থাকবে আপনার গল্পের দিকে। আপনি ভালো লিখলে আপনার মনেই হবে না আপনি কোনো কাঠামো ব্যবহার করছেন। কাঠামো ছাড়াই আপনি সহজেই গল্প বলতে পারবেন। গল্প লেখায় কাঠামো ব্যবহার অভ্যাসে পরিণত হলে আপনার গল্প হয়ে উঠবে সঙ্গীতের মতোই সুমধুর।

আপনি হয়তো ভাবছেন বা অবাক হচ্ছেন কেন আমার গল্পের কাঠামোতে এসব উপাদান রাখা হয়েছে আর এসব উপাদানগুলো আসলেই প্রয়োজনীয় কি না। চলুন, একটু গভীরভাবে দেখি গল্পের কাঠামোর উপাদানগুলোকে, তাহলে আপনি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, কেন এগুলো আমার কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যায় : ৩

গল্পের কাঠামোর প্রতিটি ধাপ আলাদা করে বিশ্লেষণ করা

যারা ভালো গল্পকার, তারা গল্প লেখার নিয়ম কানুন ভাঙেন না। তারা হয়তো কিছুটা পরিবর্তন করে বা নতুন কিছু যোগ করেন, কিন্তু পুরো নিয়ম ভেঙে ফেলেন না। যদি তারা গল্পের আসল কাঠামোটিই ভেঙে ফেলেন তাহলে গল্প বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। এতে করে পাঠকরা গল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, পড়ায় বিরক্তিবোধ এসে পড়ে।

তাই, আমার গল্প লেখার কাঠামোর উপাদানগুলো একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক:

প্রধান চরিত্র

গল্পে একটি প্রধান চরিত্র থাকে, যাকে আমরা নায়ক বলি। নায়ক একটি বিশেষ মিশনে যাত্রা শুরু করে। সিনেমায় গল্প দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করতে হলে, নায়ককে এমন এক সমস্যায় ফেলতে হবে যা সমাধান করা খুব কঠিন ব্যাপার। সাধারণ মানুষের সাধারণ সমস্যার চেয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। তার বেঁচে থাকার জন্য, আর তার সাথে থাকা অন্য চরিত্রগুলো, যারা তার ঘনিষ্ট সহযোগী, তাদের জন্যও সমস্যার সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। মজার ব্যাপার হলো, গল্পে নায়ক সবচেয়ে শক্তিশালী বা নির্ভরযোগ্য চরিত্র থাকে না। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বা শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে আমরা পাই কোন গাইড বা পদপ্রদর্শককে। কিন্তু গল্পে নায়কই থাকে কেন্দ্রিয় চরিত্র। গল্পে নায়কদেরই পরিকল্পপনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হয় বা শত্রু ঘাটিতে আক্রমণ করতে হয়। গল্পে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে নায়কের মনোজগতে বা ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসে।

গল্পের প্রধান চরিত্র বা নায়কের উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পারি- ফ্রডো ব্যাগিংস (সিনেমা-লর্ড অফ দ্যা রিংস), রুডি (সিনেমা-রুডি), লুক স্কাইওয়ালকার (সিনেমা- স্টার ওয়ার্স) ।

সংঘাত ও সমস্যা

গল্পে নায়ক কোনো সমস্যার মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত গল্প জমে উঠে না। গল্পের প্রধান চরিত্র শুরুতেই সমস্যার মধ্যে পড়ে, এর কারণ সেই সমস্যা বা দ্বন্দ্বটি গল্পে একটি প্রশ্ন তৈরি করে। চরিত্রটি কি সমস্যাগুলো থেকে বের হতে পারবে? যদি না পারে তাহলে কী হবে? নায়ক কি শত্রুকে পরাজিত ও তার সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারবে? যদি সমস্যা থেকে বা শত্রুকে হারাতে না পারে তাহলে কী হবে, কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে নায়ককে?

গল্প মানুষের কাছে আকর্ষণীয়- এর কারণ গল্প একের পর এক প্রশ্ন তৈরি করে। আর সিনেমার গল্পে এরকম প্রশ্ন বা দ্বন্দ্বই দর্শককে আটকে রাখে শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার জন্য। নায়ক কি শত্রুদের ঘাটি ধ্বংস করতে পারবে? খেলাধূলা নিয়ে কোনো সিনেমা হলে সেখানে একটি প্রশ্ন থাকে, দলটি কি ফাইনাল খেলায় জিতে আসতে পারবে?

একটি ভালো গল্পে চরিত্র তিন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। এগুলো হলো:

বাহ্যিক সমস্যা- বাইরে থেকে আসা সমস্যা। যেমন- শত্রুর সাথে যুদ্ধ, কোনো বড় বিপদে পড়া।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা- চরিত্রের ভিতরের সমস্যা। যেমন- ভয়, সন্দেহ, আত্মবিশ্বাসের অভাব।

দর্শনগত বা নৈতিক সমস্যা- ন্যায় ও অন্যায়, জীবনের বড় প্রশ্ন। ভালো-মন্দের লড়াই, সত্য-মিথ্যার সংঘর্ষ।

সিনেমায় বাহ্যিক বা বাইরের থেকে আগত সমস্যার উদাহরণ:

ফ্রুডো (পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে, সিনেমা- লর্ড অফ দ্যা রিংস), রুডি (নটরডেম ফুটবল দলকে শক্তিশালী বানাতে হবে, সিনেমা- রুডি), লুক স্কাইওয়ালকার (শত্রু সাম্রাজ্যকে পরাজিত করা, সিনেমা- স্টার ওয়ার্স)

সিনেমায় অভ্যন্তরীণ বা ভিতর থেকে সমস্যার উদাহরণ:

ফ্রুডো (সে কি সাহসী, নির্ভীক আর সঠিক শৃঙ্খলিত? সে কি ভালো? সিনেমা- লর্ড অফ দ্যা রিংস), রুডি (যা তার প্রয়োজন সেটা কি তার আছে? অন্যদের কাছে সে কি মূল্যবান? সিনেমা- রুডি)

লুক স্কাইওয়ালকার( তার কি সাহসী যোদ্ধা বা নাইট হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তার সৎ পিতা তার সম্পর্কে সঠিক ধারনা রাখে? সিনেম্লা- স্টার ওয়ারস)

সিনেমায় দর্শনগত বা নৈতিক সমস্যার উদাহরণ:

ফ্রুডো (সত্যের কি বিজয় হবে মন্দকে পরাজিত করে? দলীয় স্বার্থ কি জয়ী হবে ব্যক্তিগত স্বার্থকে পেছনে ফেলে? সিনেমা- লর্ড অফ দ্যা রিংস)

রুডি (মহৎ চরিত্র কি শক্তিশালী শত্রুর বিপক্ষে লড়াই করতে পারে? জীবন কি ন্যায্য? সিনেমা- রুডি)

লুক স্কাইওয়ালকার (ভালো-মন্দের লড়াইয়ে ভালো কি জয়ী হতে পারবে? দলীয় স্বার্থ কি ব্যক্তি স্বার্থ কে পরাজিত করতে পারবে? উদারতা কি লোভ কে জয় করতে পারবে? স্বাধীনতা আর শোষনের লড়াইয়ে স্বাধীনতা কি বিজয়ী হবে? সিনেমা-স্টার ওয়ার্স)।

গল্প লেখার সময় যখন সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্ব ব্যবহার করবেন, তখন আপনাকে সব সময় সমস্যার দর্শন বা নৈতিক দিকটি দেখাতে হবে এমনটি জরুরি নয়। চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা তুলে ধরাটাই বড় কথা, তাদের মনের ভিতরে কী ধরনের সমস্যা ঘুরপাঁক খাচ্ছে তা বলতে হবে। গল্পে শুধু বাইরের সমস্যা দেখালেই হবে না, সমস্যাগুলো চরিত্রের মনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তাদের ভয়, সন্দেহ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব- এগুলোও দেখাতে হবে। চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার পরিবর্তন দেখাতে না পারলে আপনি আপনার দর্শক হারাবেন।

প্রধান চরিত্রের সাথে গাইড বা পথপ্রদর্শকের সাক্ষাৎ

সিনেমায় বা উপন্যাসের গল্পে, প্রধান চরিত্রটি নিজেই তার সমস্যার সমাধান করতে পারে না। যদি প্রধান চরিত্রটি বা অন্য চরিত্রগুলো নিজেরাই তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারতো তাহলে তারা শুরুতেই সমস্যার মধ্যে পড়তো না। সিনেমায় বা গল্প-উপন্যাসে আমরা কি দেখি, আমরা দেখি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র কারো সাথে সাক্ষাৎ করছে, হয়তো কোনো বই পড়ছে, জীবনের কোনো সংকটময় মূহুর্তে হয়তো সে তার অতীতের কোনো স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা স্মরণ করছে যা তাকে আত্মবিশ্বাস ও সাহস দিবে। কারো সাথে সাক্ষাৎ করা, ভালো বই পড়া, অতীতের ভালো কোনো স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তা থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস এগুলো হচ্ছে গল্পের চরিত্রগুলোর জন্য একেকটি গাইড বা পথপ্রদর্শক। একজন ভালো গাইড বা পথপ্রদর্শক হতে পারে এমন কোনো ব্যক্তি, যিনি অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী, যার আছে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা। এরকম একজন গাইড বা পথপ্রদর্শকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব প্রধান চরিত্র বা নায়কের যাত্রা কোন দিকে হওয়া উচিত। সে তাকে বলতে পারবে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে। প্রথমত, গাইড বা পথপ্রদর্শকের কাজ হলো তার কাছে প্রধান চরিত্র বা গল্পের নায়ক যখন আসবে তার কথাগুলো শোনা, নায়কের সমস্যাগুলোকে গভীরভাবে বোঝা ও তাকে সহানুভূতি দেয়া।

দ্বিতীয় কাজটি হলো, গাইড বা গুরু নায়ককে একটি পরিকল্পনা দিবে যাতে করে নায়ক সে পরিকল্পনা অনুযায়ী লড়াই করে শেষ পর্যন্ত একটি সুখময় সমাপ্তি অর্জন করতে পারে। গল্পে গাইড বা গুরু হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধৈর্যশীল চরিত্র, নায়ক নয়।

গল্পে নায়ককে গাইড বা নায়কের পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে এমন কিছু উদাহরণ:

লর্ড অফ দ্যা রিংস সিনেমায় নায়ক ফ্রুডো’র গাইডের ভূমিকায় দেখা যায় গ্যান্ডাল্ফ সহ অন্য চরিত্রদেরকে। রুডি সিনেমায় গাইড বা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় দেখা যায় সিনেমার নায়ক রুডির বাবাকে, রুডির শিক্ষককে এছাড়াও আরো অন্য অনেককে। ইয়োডা, ওবি ওয়ান কেনোবি ‘স্টার ওয়ারর্স’ সিনেমায় লুক স্কাইওয়ালকার এর গাইড বা পথপ্রদর্শক হিসেবে থাকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা

গল্পে একটা সংকটের মুহূর্ত আসে যখন নায়ককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সে কি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করবে, সে কি সফল হবে তার যাত্রায়? সে কি ডেথ স্টার ধ্বংস করতে পারবে, না পিছু হটে আসবে? গল্পে এই ‘কল টু একশন’ই হলো সংকট মুহূর্ত। এটি গল্পের নায়কের জন্য একটি অন্ধকার কঠিন সময়। তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সে কি নিরাপদ দূরত্ব থাকবে, না তার গাইড তাকে যে পরিকল্পনা দিয়েছে সে অনুযায়ী কাজ করবে। গল্পে একজন ভালো গাইড বা পথপ্রদর্শক নায়কের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার প্রতি সহানুভূতি দেখায়, নায়ককে একটি পরিকল্পনা দেয় এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে বলে।

সংকট মুহূর্তে সিনেমায় প্রধান চরিত্র বা নায়ক কিভাবে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে তার উদাহরণ: সিনেমা- রুডি, নায়ক রুডি ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করে, চেষ্টা করতেই থাকে। অবশেষে রুডি তার বাবার পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করে।

সিনেমা-স্টার ওয়ার্স, নায়ক লুক স্কাইওয়ালকার সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইয়োডার পরামর্শ মোতাবেক বিদ্রোহী দলে যোগ দেয় ‘ডেথ স্টার’ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে।

গল্পের শেষে সুখের সমাপ্তি

সিনেমায় বা গল্পে সবশেষে ভালো কিছু ঘটলে তখন বলা যায় সুখের সমাপ্তি, অপরদিকে দুঃখ দিয়ে শেষ হলে বলে ট্রাজিডি বা দুঃখময় পরিণতি। সুখ বা দুঃখের পরিণতি যাই হোক না কেন, দর্শক জানতে চায় গল্পের শেষে কী ঘটে। এটাই দর্শককে গল্পে আটকে রাখে- কী হবে শেষে। দর্শক জানতে চায় নায়ক কি খেলায় হারবে না জিতবে, শত্রুদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারবে না ব্যর্থ হবে, নায়ক কি নায়িকার দেখা পাবে না তাকে হারিয়ে ফেলবে?

সাধারণত, গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র থাকে যাকে বলা হয় গাইড বা পথপ্রদর্শক, যে নায়ককে আইডিয়া বা পরিকল্পনা দেয় আর বলে, ‘‘যদি তুমি ডেথ স্টার ধ্বংস করে বিদ্রোহীদের বাঁচাতে চাও তাহলে এভাবে কাজ করো, এরকমভাবে এগোলে তুমি সফল হবে।’’

সিনেমায় সুখের সমাপ্তির উদাহরণ

সিনেমা- রুডি, রুডি সিনেমায় গল্পের নায়ক রুডি অনেক চেষ্টার পর ফুটবলে দলে খেলার সুযোগ পায়। সিনেমা- স্টার ওয়ার্র, স্টার ওয়ারস সিনেমায় নায়ক লুক স্কাইওয়ালকার ডেথ স্টার ধ্বংস করে বিদ্রোহীদের বাঁচিয়ে রাখে যাতে তারা আবার সংগ্রাম করতে পারে।

যখন দুঃখের সমাপ্তি ঘটে

ভালো চিত্রনাট্যকার, গল্পকার বা উপন্যাসিক আমাদেরকে কল্পনা করতে সাহায্য করেন সিনেমায় বা গল্পে কী হতে পারে শেষে। নায়কের ভাগ্যে শেষে ভয়ংকর পরিণতি কী হতে পারে এগুলো গল্পে উত্তেজনা বজায় রাখে। দর্শক দেখতে চায় কিরকম দুঃখের পরিণতি ঘটতে পারে যদি নায়ক তার পরিকল্পনা কাজ করতে না পারে। যদি দর্শক বুঝতে না পারে কী ধরণের দুঃখের পরিণতি নেমে আসছে নায়কের উপর, তাহলে দর্শক সিনেমা থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে আর বাকি অংশ দেখার আগ্রহ থাকে না।

ট্রাজিডি বা দুঃখের সমাপ্তির উদাহরণ

সিনেমা- লর্ড অফ দ্যা রিংস, চরিত্র- ফ্রুডো, ফ্রুডো সিনেমায় মিডল আর্থ রক্ষা করতে পারে না। তার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়।

সিনেমা-স্টার ওয়ার্স, প্রধান চরিত্র- লুক স্কাইওয়ালকার, লুক স্কাইওয়ালকার ডেথ স্টার ধ্বংস করে কিন্তু অপরদিকে শত্রু সাম্রাজ্য গ্যালাক্সি শাসন করে।

গল্প হতে হবে স্পষ্ট বা পরিষ্কার যাতে পাঠক সহজে বুঝতে পারে

গল্প বলার হাজারো নিয়ম থাকলেও মনে রাখতে হবে একটি সূত্রের কথা, যা ভাঙা কখনো ভাঙা যায় না। সেটা হলো- গল্প হতে হবে স্পষ্ট, পরিষ্কার ও সহজবোধ্য।

যদি গল্পের প্রতিটি দৃশ্যকে সঠিক ভাবে উপস্থাপন করা না যায় তাহলে পাঠক বা সিনেমার দর্শক সহজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাদের কাছে তখন গল্পটিকে নীরস মনে হয়। কিছু হয়তো ব্যতিক্রম আছে লেখার কলাকৌশলে, গল্প বলায়, কিন্তু সেগুলো খুব বেশি নয়।

একজন ভালো গল্প লেখক অনেকটা ভালো টেনিস প্লেয়ারের মতো। টেনিস খেলায় ভালো করতে হলে আগে এর নিয়ম-কানুনগুলো ভালো করে শিখতে হয়। তারপরে নিজের মতো খেলার ধরন উন্নত করা যায়, নতুন কিছু শেখা যায়।

গল্প লেখার কৌশলও অনেকটাই টেনিস খেলার মতো। প্রথমে গল্প লেখার কলাকৌশল আর মৌলিক নিয়মগুলো জানতে হবে, চর্চা করতে হবে। এগুলো সম্পর্কে ধারণা না থাকলে ভালো গল্পকার বা পেশাদার গল্প লেখকদের সাথে আপনি প্রতিযোগিতা করে পারবেন না।

মনে রাখবেন : স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে গল্প বলা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গল্প লেখা চর্চার বিষয়, এক্ষেত্রে শুরুতেই আপনার খেয়াল রাখতে হবে গল্প যেন স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হয়। প্রথমে হয়তো আপনার গল্প বলার ধরন পাঠকদের কাছে গৎবাঁধা বা যান্ত্রিক মনে হতে পারে। কিন্তু শেখার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়, তা হলো গল্পে থাকতে হবে স্পষ্টতা। গল্প বলার মূল বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারলে আপনার কাছে বিষয়টি আরো সহজ মনে হবে। আপনার তখন একই নিয়মে গল্প বলতে হবে না। এমনকি গল্পে একজন গাইড বা পথপ্রদর্শক থাকার পরিকল্পনাও আপনি বাদ দিতে পারেন। গল্প বলায় আপনি হয়তো তখন চরিত্রগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্ব, তাদের মানসিক জটিলতা অথবা দুঃখের পরিণতি ভালো করে লিখতে পারবেন। এরকম পারদর্শীতা নির্ভর করবে গল্পের সহজ কাঠামো আয়ত্তের মধ্যে দিয়ে।

সঙ্গীতে নতুন সুর তৈরি করতে যেমন সঙ্গীতের স্কেল শেখা দরকার, ঠিক তেমনি ভালো গল্প লিখতে হলেও প্রথমে গল্পের মৌলিক কাঠামো ও এর কলাকৌশল সম্পর্কে জানতে হয়।

গল্পের কাঠামো নিয়ে এখন আমি বেশি ভাবি না। লেখালিখির চর্চার মধ্যে থাকলে এটি একসময় প্রতিদিনকার অভ্যাসের মতো হয়ে যায়। যতক্ষণ না আমি কোনো পাণ্ডলিপি বিশ্লেষণ বা কোনো কোম্পানির ব্র্যান্ডিং-কৌশল, তাদের বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য নিয়ে সাহায্য না করি, ততক্ষণ পর্যন্ত গল্পের কাঠামো আসলে আমার মনের মধ্যে সাজানোই থাকে। শুধু সময় মতো গল্পের কাঠামোকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়। আর কিছু নয়। একজন সংঙ্গীতশিল্পীর মন যেমন সঙ্গীতের স্কেল আর সুর জুড়ে থাকে ঠিক তেমনি আমার মধ্যেও সবসময় গল্পের কাঠামো জুড়ে থাকে। আসলে, আমি গল্পের গঠন নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত ভাবি না, যতক্ষণ না আমার কাছে মনে হয় কোথাও কোন ভুল আছে। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখার সময় আমার কাছে বিজ্ঞাপনটি স্পষ্ট বা ভালো না লাগলে আমি আমার কফির টেবিলে চলে যাই, একটি জার্নাল নেই তারপর কফি পান করতে করতে বিজ্ঞাপনের গল্পের গঠনটি বিশ্লেষণ করতে থাকি, বুঝতে চেষ্টা করি কোথায় এর ভুল আছে। এছাড়া, সিনেমা দেখার সময় বিরক্তিবোধ আসলে আমি মনে মনে ২০টি জিনিসের তালিকা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি যা সিনেমা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ, খেয়াল করি চিত্রনাট্যকার কোন কোন জিনিসগুলো বাদ দিয়েছেন। সিনেমা বিরক্তিকর হয় গল্পে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো না থাকলে। তাই সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ গল্পের গঠন আয়ত্ত করা।

অধ্যায় চার

গল্প বলে যেভাবে মানুষের সাথে সংযোগ তৈরি করা যায়

গল্প এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম যা আপনাকে অন্য একজন মানুষের সাথে একাত্ম করে। গল্পের মাধ্যমে আপনি অচেনা একজন মানুষের সুখ, দুঃখ অনুভব করতে পারবেন। যখন সারাদিনের ঘটনাবলী আমরা সংক্ষেপে কাউকে বলি, রাতে ঘুমানোর আগে বাচ্চাদের সুন্দর কোনো গল্প শুনাই, তখন আসলে গল্প বলার মাধ্যমে আমাদের মন গভীরভাবে অন্য মানুষদের সাথে সংযুক্ত হয়।

আমার জীবন ও কাজে আমি যেভাবে গল্পের কাঠামো ব্যবহার করি তার কিছু উপায় নিচে বলছি:

বই লেখার সময় যেভাবে গল্পের কাঠামো ব্যবহার করি

যখন আমি নতুন কোন বই লিখি তখন এই বইয়ে উল্লেখিত কাঠামো অনুযায়ী লিখি, যে গল্পের কাঠামোর কথা আমি বারবার বলে আসছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, আমার বইয়ের একটি অধ্যায়ের মধ্যেই আমি গল্পের কাঠামোটি কয়েকবার ব্যবহার করি, ব্যাপারটি অনেকটা গাড়ির চাকা ঘুরার মতো। এভাবে লিখতে লিখতে তারপর অধ্যায়টি শেষ করি দুঃখজনক বা সুখের সমাপ্তি দিয়ে।

আমার বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় একটি বড় গল্পের অংশ হয়ে যায়, যা পুরো বইয়ের মূল গল্প তৈরি করে। এভাবে আমার বইটিতে ছোট ছোট গল্পের সমষ্টি মিলে তৈরি হয় একটি বড় গল্প। চাইলে আপনি প্রতিটি অধ্যায়কে একটি সাব-প্লট বা উপ-গল্প হিসেবেও ধরতে পারেন।

ধরা যাক, লেখালিখির সৃজনশীল প্রক্রিয়া নিয়ে আমি একটি বই লিখছি, বইটি হতে পারে উপন্যাস বা চিত্রনাট্যের কলাকৌশল নিয়ে। বইটিতে দেখাতে পারি, কিভাবে আমি একজন ঝামেলাপূর্ণ সিনেমা প্রযোজকের জন্য একটি বড় গল্প থেকে চিত্রনাট্য লেখা শেষ করেছি। আমাকে মনে রাখতে হবে চিত্রনাট্যটি তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে, না হলে চুক্তির বাকি টাকা পাবো না।

তাহলে, একটি অধ্যায়ে দেখাতে পারি কীভাবে আমি কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস কাটিয়ে উঠিয়েছিলাম। তার পরের অধ্যায়ে আমি দেখাতে পারি কিভাবে গল্পের চরিত্র তৈরি করতে হয় এবং এভাবেই লেখা এগিয়ে যেতে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে উপন্যাসে একটি বড় গল্প থাকে, সাথে সাথে কয়েকটা উপ-গল্প বা ছোটগল্প থাকতে পারে। এই উপ-গল্প বা ছোটগল্প উপন্যাসের বড় গল্পটাকে অনুসরণ করবে। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই?

আপনি চাইলে একই কাঠামো ব্যবহার করে বড় এপিকধর্মী বা ছোটগল্প লিখতে পারেন।

যখন আপনি আপনার বইয়ের খসড়া তৈরি করবেন, তখন একই কাঠামো ব্যবহার করে যতগুলো সম্ভব ছোটগল্প লিখে ফেলুন। তারপর সেই গল্পগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে সাজিয়ে নিন। দেখবেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার গল্পের তালিকাটা একটি পুরো বইয়ের মতো হয়ে যাবে।

বক্তৃতা দেয়ার সময়

যখন রুম ভর্তি ব্যবসায়িক নেতাদের সামনে বক্তৃতা দেই, তখন তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে আমি একই গল্পের কাঠামো ব্যবহার করি যা আমি ব্যবহার করেছি ইতিমধ্যে আমার বিভিন্ন লেখায়, গল্পে। বক্তৃতার সময় প্রথমেই নিজের পরিচয় দেই, তারপর নিজের ব্যবসা- প্রতিষ্ঠান নিয়ে কিছু কথা বলি, বা এমন কোন আর্থিক লক্ষ্য নিয়ে কথা বলি যা আমি অর্জন করতে চাচ্ছিলাম। তারপর ব্যবসা করতে গিয়ে আমি কী ধরণের সমস্যার মুখে পড়েছিলাম, সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য আমি কী ধরণের চেষ্টা করেছি, কার সাথে সাক্ষাৎ করেছি যাকে আমি খুব বিশ্বাস করি বা আমি কোন ধরণের বই পড়েছি সমস্য গুলো থেকে বের হওয়ার জন্য, বই পড়ে আমি কি ধরণের আইডিয়া পেয়েছি তা আমি বলতে থাকি ধারাবাহিক ভাবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমার দ্বিধা বা ভয়ের কথা বলি কারণ এক্ষেত্রে অনেক কিছু হারানোর সম্ভবনা থাকে। সম্ভাব্য একটি বিপদের চিত্র তুলে ধরার পর আমি শ্রোতাদের বিশেষ করে ব্যবসায়িক নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলি, কি ধরণের পদক্ষেপ আমি তখন নিয়েছিলাম আর কী করে সফল হয়েছিলাম।

বক্তৃতায় প্রতিটি বিষয় বোঝানোর জন্য আমি একই কাঠামো ব্যবহার করে গল্প বলি। প্রতিটি গল্প বলার শেষে আমি দর্শকদের এক মিনিট করে সময় দেই কিছু বলার জন্য বা আমার কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য। কিন্তু বেশিরভাগ বক্তা উল্টো কাজটি করেন, তারা শুধু কথা বলতেই থাকেন, দর্শকদের কোন মন্তব্য করতে দেন না প্রথমে। সব শেষে শ্রোতারা প্রশ্ন করতে শুরু করে, আর বক্তা তার ব্যাখ্যা দিতে থাকে। এতে করে দর্শকরা আলোচনার বিষয়বস্তু মনে রাখতে পারেন না। আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে চাই, দর্শকরা আসলে শুধু গল্পটিই শুনতে চায়। আমরা যখন কোনো কর্মশলায় গল্প বলা শুরু করি, দর্শকরা সে গল্পটির সাথে তাদের নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেতে চায়। তাই আপনার কাজ ভালো করে গল্প বলে যাওয়া, ভালো গল্প পেলে দর্শক নিজেই লুফে নিবে, আপনার আর চিন্তা করতে হবে না।

গল্প বলাটা হয়তো বাইরে থেকে দেখলে ফর্মুলা বা কৌশলগত মনে হতে পারে, কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যে গল্পগুলো আমি বলছি তা সত্য, জীবন থেকেই আমার গল্পের উপাদানগুলো নেয়া। মিথ্যা বা বানোয়াট গল্প বলে প্রতারণার আশ্রয় নিতে বলছি না, আমি সেটার পরামর্শও দিচ্ছি না। যখন আমরা কাঠামো আকারে তথা সাজানো গুছানোভাবে গল্প বলি তখন পাঠকরা বোরিং অনুভব করে না আর তারা লেখকদের উপর বিরক্তিও হয় না। আমরা লেখকরা জটিল বিষয়গুলো সহজ ও শৈল্পিকভাবে লিখি যাতে পাঠকরা পড়ে বুঝতে পারে ও আনন্দ পায়।

নিজের পরিচয় দেওয়া

যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কী করি, আমার পেশা কী, আমি তখন সরাসরি বলি না যে আমি একজন লেখক। লেখালিখির সাথে সাথে আমি যে একটি ব্র্যান্ড-স্ট্রাটেজি কোম্পানি চালাই তাও বলি না। যদি আমি মানুষদের পেশাগত জীবনের কথা বলা শুরু করি তাহলে তারা জানতে চাইবে আমি কী লিখি, কী কী বই লিখেছি? তারা হয়তো জানতে চাইবে কীভাবে আমি ব্র্যান্ড-স্ট্র্যাটেজি কোম্পানি চালাই ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন। এক্ষেত্রে আমার কাছে যদি সময় থাকে, মানুষদের আমি একটা গল্প বলি।

গল্পটি এরকম- অনেক বছর আগে আমি লেখালিখি করতাম আর আমার একটি ছোট কনফারেন্স কোম্পানি ছিলো। ভালো চলছিলো, কিন্তু আমি খেয়াল করলাম আমার কাছের ভক্তকূল ছাড়া তেমন কেউই কনফারেন্সে আসছে না। আমি চাচ্ছিলাম আমার কাছের ভক্তরা ছাড়াও মানুষজন কনফারেন্সে আসবে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে অন্য মানুষদের আকৃষ্ট করবো। একদিন বিমানে করে যাচ্ছিলাম কোথাও, দেখি পাশের সিটে বসা একজন আমার লেটেস্ট বইটি পড়ছে। লোকটি জানতো না আমিই বইটির লেখক। আমি লোকটিকে মজা করে বললাম, ‘শুনেছি এই বইটির লেখক নাকি একটু অহংকারী।’ লোকটি তখনও বুঝতে পারেনি আমিই বইটির লেখক। আমি তারপর লোকটির সাথে আমার বইটি নিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা আলাপ করলাম এবং যা বুঝতে পারলাম তা হলো লোকটি আমার লেখা পছন্দ করলেও লেখার বিষয়বস্তুটি ব্যাখ্যা করতে পারছিলো না। আমার বইয়ের নামগুলো ছিল অস্পষ্ট, লেখাগুলো ছিলো কাব্যিক আর তাই হয়তো পাঠকরা সহজে বুঝতে পারতো না।

তখন বুঝতে পারলাম আমি হয়তো আমার বইগুলোতে এমন ভাষায় লিখতে পারিনি যাতে পাঠক সহজেই লেখাগুলো বুঝতে পারবে, আর অন্য পাঠকদের কাছে আমার বইটির কথা বলতে পারবে। এরপর যা করলাম তা হলো, পাহাড়ী এলাকায় চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে ভালো একটা হোটেল দেখে রুম ভাড়া করলাম। রুমে বসে হলিউডের সিনেমাগুলো বহু বছর ধরে যেসব গল্পের কাঠামো ব্যবহার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করেছে তা বিশ্লেষণ করতে থাকলাম। হলিউড সিনেমার গল্পের কাঠামো বিশ্লেষণ করে আমি নিজেই একটা প্লট স্ট্রাকচার তৈরি করলাম। তারপর নিজের তৈরি প্লট স্ট্রাকচার বা কাহিনী কাঠামো কাজে লাগিয়ে বানিয়ে ফেললাম নিজস্ব ব্র্যান্ড-স্ট্র্যাটেজি।

আমি এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করেছিলাম, যার মাধ্যমে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের মার্কেটিং করতে পারবে পরিষ্কার ও সহজভাবে। আমার তৈরি পরিকল্পনাটি এবার নিজের ছোট কনফারেন্স ব্যবসায় প্রয়োগ করলাম এবং মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে আমার ব্যবসা চার গুণ বেড়ে গেল। দারুণ ফলাফল পেলাম। শুধু তাই নয়, যখন আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুছিয়ে নিলাম, তখন অন্য মানুষরা এসে আমার কাছ থেকে ব্যবসায়িক পরামর্শ চাইতে লাগল, তাদের সাহায্য করতে বলল। এমনকি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাতে শুরু করলো। সেগুলোর মধ্যে ছিলো প্যানন্টিন, ফোর্ড, লিংকন এমনকি হোয়াইট হাউসও।

এরপর আমি ‘স্টোরি ব্র্যান্ড’ নামে দ্বিতীয় একটি কোম্পানি চালু করি। এখান থেকে বিভিন্ন কোম্পানিকে পরামর্শ দিতে থাকি এবং কীভাবে কোম্পানিগুলো তাদের ব্র্যান্ডগুলোর মার্কেটিং করবে সেই কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করি যাতে সহজভাবেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের পণ্যের গুণাগুণ তুলে ধরতে পারে।

আমি এই গল্প হাজারবার বলেছি, কাঠামো অনুযায়ী সহজ ও পরিষ্কারভাবে কোনো গল্প বলেছি তখন কেউ বুঝতে পারেনি এমন কখনো হয়নি। শুধু তাই নয়, আমার প্রতিষ্ঠান থেকে ‘চিক-ফিল-এ’-এর মতো ব্র্র্যান্ডগুলোকে সাহায্য করেছি, যাতে তারা তাদের স্টাফদের শেখাতে পারে কীভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত গল্পগুলোকে ব্র্যান্ডের সাথে মিলিয়ে সাবলীলভাবে বলতে হয়। ভেবে দেখুন, এমন একটি কোম্পানি রয়েছে যেখানে প্রতিটি কর্মী তাদের কাজ সম্পর্কে জানে, তাদের কাজ কেন গুরুত্বপূর্ণ তা জানে এবং তাদের ব্যক্তিগত গল্পগুলোকে দিয়ে কোম্পানির ব্র্যান্ডের মার্কেটিং করতে পারে, এভাবে কোম্পানির পুরো স্টাফ নীরবভাবে একটি বিক্রয়দলে পরিণত হয়।

গল্পের আয়নায় আমাদের জীবনকে দেখা

আপনি হয়তো এখন বুঝতে পেরেছেন, গল্প হলো বিভিন্ন এলোমেলো ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজানো যা পড়লে বুঝতে পারা যায় ও অর্থপূর্ণ মনে হয়। মানুষের সাথে কথা বলে, তাদের সাথে একাত্ম হয়ে আমি যা খুঁজে পেয়েছি- গল্প হলো জীবনকে বোঝার জন্য অসাধারণ এক মাধ্যম। আমার প্রতিদিনকার কাজ হলো, বিভিন্ন কোম্পানির ব্র্যান্ডের মার্কেটিং কলাকৌশল লেখা, ব্যবসায়িক কাজে বিজ্ঞাপণ তৈরির গল্প লেখা। আমি বই লেখার সময় বের করতে পারি না। চার বা পাঁচ বছর পর পর বই লেখার সুযোগ পাই, লেখার সময় বের করি। বেশিরভাগ মানুষ আমাকে লেখক হিসেবে চিনে, কিন্তু তারা জানে না ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ হিসেবেও আমি কাজ করি। সত্যি কথা বলতে নিজের মতো করে গল্প, উপন্যাস লেখার সুযোগ আমি ততোটা পাই না।

নতুন কোন বই লেখার আগে নিজেকে সবসময় একটা প্রশ্ন করি: শেষ বই লেখার পর আমার জীবনে কী কী ঘটনা ঘটেছে?

কারণ আমি স্মৃতিকথাই লিখি। আর আমার জীবন যেহেতু রাশিয়ান স্পাইদের মতো রোমাঞ্চকর নয়, তাই আমার বেশিরভাগ লেখাই আসলে নিজের দিকেই যাত্রা। কীভাবে জীবন বদলায়, মানুষ হিসেবে নিজের পরিবর্তন, মানুষ হয়ে ওঠা, এসব কথা থাকে আমার বই জুড়ে। যখন আমি এই ধরনের বই লিখি তখন জীবনকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি। বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যখন ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে লিখি তখন বুঝতে পারি কত কিছু ঘটে গেছে জীবনে। অথচ না গুছিয়ে লিখলে বোঝা যায় না জীবন কত ঘটনাবহুল, কত নাটকীয়! আমার জীবনের নানা ঘটনা আমি গল্পের কাঠামোর নিয়ম অনুযায়ী সাতটি উপাদান দিয়ে চিন্তা করি। গল্পের উপাদান নিয়ে ইতিমধ্যে আমি বলেছি, যখন আমি গল্পের মতো করে ঘটনাগুলোকে সাজাই, তখন আর পুরাতন মানুষটি থাকি না, আমি তখন বদলে যাই।

আমাদের মানব জীবন একটা সফর। ঠিক তাই- আমরা সফরে বের হয়েছি। জীবনে আমরা নিজেদের জন্য ও আমাদের পরিবারের জন্য নানা কিছু চাই, এই আশা-আকাঙ্খা ও ইচ্ছাগুলোই আমাদের জীবনের গল্প শুরু করে। আমাদের জীবনের গল্পগুলোতে নানা রকম ঝুঁকি থাকে, ভয় থাকে, আনন্দ- বেদনা থাকে। আমাদের প্রত্যেকের গল্পেই এমন কিছু মানুষ আসে যারা আমাদের বন্ধু, পথপ্রদর্শক, যাদের কাছ থেকে আমরা নানা কিছু শিখতে পারি, যা জীবনে চলার পথের পাথেয়। কিন্তু আমরা যা শিখি জীবন থেকে, এসব শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারব না যতক্ষণ না ঘটনাগুলো নিজেদের ভাষায় মিলিয়ে নিতে পারব।

যেকোন গল্পের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চরিত্রের রূপান্তর। আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এই কারণে যে আমি প্রচুর গল্প পড়েছি আর এই গল্প পাঠ করার ফলে মানুষ হিসেবে নিজের পরিবর্তনগুলো বুঝতে পেরেছি।

জীবনের সৌন্দর্য ও অর্থপূর্ণ দিক আমি খুঁজে পেয়েছি গল্প পাঠ করে। গল্পকে হৃদয়ে ধারণ করে। জীবন শুধু এখন আর অগোচরে বয়ে যায় না, জীবনের ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে ভাবি। আসলে জীবন থেকে পাওয়া সব অভিজ্ঞতাগুলোই আমাকে বদলে দিয়ে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

আমি মনে করি, প্রত্যেক মানুষের তার নিজের জীবনের গল্প লেখা উচিত। নিজের জীবনের গল্প থেকে বুঝতে পারবে- সে কে, আর জানতে পারবে জীবনের নানা ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতাগুলো তাকে কেমন মানুষে পরিণত করেছে। যে নিজেকে ভালোভাবে বোঝে, তার সাথে সহজেই সম্পর্ক তৈরি করা যায়। নিজেকে ভালো ভাবে বুঝতে পারলে একজন মানুষ মানসিক ভাবে স্থির থাকে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- সে বুঝতে পারে তার জীবনের গল্পের সাথে কীভাবে অন্য মানুষের গল্প জড়িয়ে আছে।

উপসংহার

গল্প জিনিসটি আমার কাছে সঙ্গীতের মতোই রহস্যময়। একটি গল্প আমি কখনোই পুরাপুরি বুঝতে পারি না। শুধু অনুভব করতে পারি গল্প জীবনে কী দারুণ প্রভাব ফেলে, আর এটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ যে এই সুন্দর সত্যটি বুঝতে পেরেছি।

রবার্ট ম্যাকি’র একটি উক্তি দিয়ে আমার বইটি শেষ করতে চাই। উক্তিটি তার অসাধারণ বই ‘স্টোরি’ থেক নেয়া। এটিই আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা।

‘‘প্রতিদিন লিখুন, লাইন ধরে, ঘন্টা ধরে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে থাকুন। ভয় থাকা সত্ত্বেও লিখে যান। কারণ কল্পনা ও দক্ষতার চেয়েও বেশি পৃথিবী আপনার কাছে চায় সাহস, প্রত্যাখ্যান, উপহাস ও ব্যর্থতার ঝুকি নেওয়ার সাহস। অর্থবহ ও সুন্দর গল্পের সন্ধানে মনোযোগ দিয়ে সাহিত্য পাঠ করুন, কিন্তু সাহসিকতার সাথে লিখুন। তখন রূপকথার গল্পের নায়কের মতো আপনার সৃষ্টিশীল কাজ বিশ্বকে মুগ্ধ করবে।’’