Published : 03 Mar 2026, 12:13 AM
আমি আমার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে এখন বাস করছি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহতে। আর আমার ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্র দুবাইয়ে। গত তিনটা দিন ধরে আমরা আসলে খুব বীভৎস সময় পার করছি এখানে।
প্রতিনিয়ত মিসাইলের সাইরেন বাজছে, প্রতিনিয়ত মোবাইলে আমিরাত সরকারের অ্যালার্ট আসছে– ‘মিসাইল থ্রেট’। এই মিসাইল অ্যালার্ট দিয়ে তারা আমাদেরকে সচেতন করছে, আমরা যেন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকি।
তো, এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে সময় পার করছি। পরিস্থিতিটা বাচ্চাদেরকে চরমভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বাবা-মা হিসেবে আমরাও চরমভাবে আতঙ্কিত। এই আতঙ্ক থেকে কতটুকু পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, কতদিনে পাওয়া যাবে, সেটা আমরাও বুঝতে পারছি না।
এ পর্যন্ত আমরা যতটুকু দেখেছি, ১৫৬টার মত মিসাইল আক্রমণ করেছে আরব আমিরাতে। সেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছে; কিছু কিছু আঘাতও হেনেছে।
আমার বাসা শারজাহর যেখানে, খুব বেশি দূরে না, সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে একটা ড্রোন অ্যাটাক হয়েছে। যেখানে আঘাত করেছে, সেই জায়গাটা ছিল মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার ওয়্যারহাউজ। এই ওয়্যারহাউসগুলো একদম পুড়ে গেছে। এখান থেকে আমরা ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছিলাম, শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
প্রতিনিয়ত এই ধরনের শব্দ। আকাশ দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে প্রচণ্ড শব্দ করে চলে যাচ্ছে মিসাইল। আরব আমিরাতের বিমান বাহিনীর টহল বিমানও হতে পারে। বোঝার উপায় নেই। আবার কখনও কখনও দেখছি উল্কার মত প্রচণ্ড বেগে আলোর কুণ্ডলীগুলো চলে যাচ্ছে এক দিক থেকে আরেক দিকে।
বিশেষ করে রাতের সময়টা আমাদের জন্য অনেক বেশি আতঙ্কের। দিনের বেলায় হয়ত অনেকে বাইরে যাচ্ছে, অনেকে দেখতে পাচ্ছে, অনেকে বুঝতে পারছে। কিন্তু রাতের বেলা সত্যিকার অর্থে সবাই মিলে জড়সড় হয়ে থাকতে হয়। যে রুমে গ্লাসের প্যানেল বেশি আছে, সেই রুমগুলো আমরা পরিহার করছি। বিশেষ করে কংক্রিটের দেয়াল চারপাশে আছে যে রুমগুলোতে, সেই রুমগুলোতে সবাই মিলে একসাথে থাকছি।
আমাদের জন্য আরো বেশি চ্যালেঞ্জের সময় অপেক্ষা করছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এখানে তেলের দাম বেড়ে যাবে খুব দ্রুত। খাদ্যপণ্যের মধ্যে যেগুলো মসলা জাতীয় পণ্য, যেমন পেঁয়াজের দাম গতকাল (রোববার) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
যে পেঁয়াজটা আমরা এখানে কিনতাম এক থেকে দেড় দিরহামের মধ্যে, কখনও কখনও দুই দিরহামের মধ্যে, সেই পেঁয়াজ আমরা কিনেছি পাঁচ দিরহাম দিয়ে। আজ-কালের মধ্যে হয়ত এটা আরও অনেক বেড়ে যাবে।
সবজি থেকে শুরু করে সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। এর কারণও আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাঁচা যে সবজি, বেশিরভাগই আসত ইরান থেকে। আমিরাতের বাজারে ইরানই আসলে বড় ধরনের যোগানদাতা ছিল। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে।
আবার ওমান থেকেও আসত কিছু সবজি। এখন বিভিন্নভাবে ওমানও আক্রান্ত। সবদিক দিয়ে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পথে।
তারওপর হরমুজ প্রণালি বন্ধ। এইদিক দিয়ে জাহাজগুলো আগের মত আসছে না। নৌবন্দরগুলো চরমভাবে হুমকির মুখে। আমিরাতে জাবেল আলী পোর্টেও একটা অ্যাটাক হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে সময় কাটাচ্ছি।
এখানে তো আমরা ওরকমভাবে কিছু মজুদ করিনি। কোনোভাবে আমরা মনে করিনি যে, আমাদের এখানে চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবকিছু কিনে বাসায় রেখে দিতে হবে ১৫-২০ দিনের জন্য। সত্যি বলতে, আমরা কোনোভাবে চিন্তাও করতে পারিনি যে আরব আমিরাত এমনভাবে আক্রান্ত হবে।
এখানে আমরা যারা ছোটখাটো ব্যবসা করি, তারা আরো বেশি বিপদের মধ্যে পড়ে গেছি। আমাদের ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছুই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এখানকার ক্রেতা মূলত ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে উন্নত দেশগুলোর পর্যটকরা। এটা তো একটা বিজনেস হাব। লোকজন যারা এখানে আসে, তারা কেনে।

আমি যেমন পারফিউমের ব্যবসা করি। আমার নিজস্ব ব্র্যান্ডের পারফিউম আছে। বিক্রি এখন একেবার জিরো হয়ে গেছে।
যত ধরনের বিজনেস আছে, ছোট থেকে বড়, সবগুলো এখন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রেতাশূন্য হয়ে গেছে মার্কেট। সবাই আতঙ্কিত।
জরুরি প্রয়োজনের যে জিনিসগুলো আছে, সেগুলো কিনতেও মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তারপরে আবার বাইরে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবার-পরিজন রেখে নিজে একা একা ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যেতে হয়।
প্রথম দিনে যেমন ছিল, দ্বিতীয় দিন বিপদ অনেক বেড়ে গেছে। তৃতীয় দিন, রোববার রাতেও আমরা ঘুমাতে পারিনি, অনেকগুলো অ্যালার্ট এসেছে। তিন-চারটা মোবাইলে যখন একসাথে অ্যালার্ট দেয়, পরিবারের সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়। আসলে প্রতিনিয়ত এরক হচ্ছে।
বাসার বারান্দায় দাঁড়ালে দেখতে পাচ্ছি প্রচণ্ড গতিতে আলো ছুটে যাচ্ছে। তখন মনে হচ্ছে, এটা কোথায় গিয়ে যে আঘাত করবে কে জানে!
এখানে যারা শ্রমিক হিসাবে কাজ করছেন, তার মধ্যে অনেক বাংলাদেশি আছেন। আমি রোববার সেই লেবার মার্কেটে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলেছি। তাদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক। বিভিন্ন জায়গায় যেসব কাজ হচ্ছিল, কনস্ট্রাকশনের কাজ, অন্যান্য কাজ, সেসব থেমে আছে। কাজ থেমে থাকা মানে হচ্ছে শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ। নিত্যদিনের খরচ মেটানোই দায়। তাদের অনেক দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।
প্রথম দিন থেকে স্কুলগুলোকে অনলাইন করে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চারা এখন অনলাইনে ক্লাস করছে। চার তারিখ পর্যন্ত অনলাইন করা হয়েছে আপাতত। এটা কতদিন পর্যন্ত চালু থাকবে, সেটাও বলা মুশকিল।
রাত হলে আতঙ্কটা বাড়ে। রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে আক্রমণটা বেশি হয়। আজ দিনে রাস আল খাইমাতে দুটো ড্রোন হামলা হয়েছে, তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শারজাহর তুলনায় দুবাই আর আবুধাবিতে আক্রমণ পেশি হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি।
আমাদের আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করা ছাড়া সত্যিকার অর্থে কোনো কিছু করার নেই। আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি। চাইছি যে কোনোভাবে যেন পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হয়ে আসে। যুদ্ধটা যেন থামে।
যুদ্ধ যারা করে তাদের উদ্দেশ্য তো ভিন্ন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা সাধারণ মানুষ। এর থেকে আমাদের কবে রেহাই মিলবে, কবে আমরা মুক্তি পাব, সেটা সৃষ্টিকর্তাই জানেন।
[খন্দকার হাসিবুজ্জামান দুবাইয়ের এনলিভেন জেনারেল ট্রেডিং এলএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক]