নড়াইলে হিন্দু বাড়িতে হামলা আওয়ামী লীগের 'অন্তর্দ্বন্দ্বে': বিএনপি

নিতাই রায় বলেন, "তদন্ত টিম সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে আক্রান্ত পরিবার এবং স্থানীয় জনসাধারণের বক্তব্যের পরিপেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীতি হয়েছে যে, ঘটনাটি নিশ্চিতরূপে স্থানীয় আওয়ামী লীগের গ্রুপিয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।"

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 July 2022, 11:47 AM
Updated : 28 July 2022, 11:47 AM

নড়াইলের লোহাগড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলার পেছনে ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর জয় নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের 'অন্তর্দ্বন্দ্বকে' দায়ী করেছে বিএনপি।

বৃহস্পতিবার সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে নড়াইলের ঘটনা সরেজমিন পরিদর্শন করে আসা তদন্ত দলের আহবায়ক অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী এই অভিযোগ করেন।

তদন্তের উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ওই গ্রামের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান। এই ঘটনায় বাড়িঘর ভাংচুর হচ্ছে, দরজা ভেঙে ফেলছে, বাড়িতে আগুন দিয়েছে অথচ এরা (আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান) নির্বিকার।

"যে চেয়ারম্যান হয়েছেন তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। আর পাশের গ্রামের আওয়ামী লীগের যে প্রার্থী সে পরাজিত হয় বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে। এখন দ্বন্দ্বটা শুরু হয় বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী পাস করল কিভাবে?

"দিঘলিয়া গ্রামের ৭০ শতাংশ ভোট হিন্দু ভোট। হিন্দুরা ভোট দিয়েছে সেই প্রার্থীকে। কেন দিল ভোট? এখান থেকে ঘটনার সূত্রপাত।”

ফেইসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শুক্রবার সন্ধ্যায় লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ায় হিন্দু বাড়িতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও মন্দিরে হামলা হয়।

এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যের তদন্ত দল গঠন করে বিএনপি। পরে ২৩ জুলাই তদন্ত দল নড়াইলের দিঘলিয়া সাহাপাড়া গ্রামে গিয়ে তদন্ত করে।

নিতাই রায় বলেন, "তদন্ত টিম সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে আক্রান্ত পরিবার এবং স্থানীয় জনসাধারণের বক্তব্যের পরিপেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীতি হয়েছে যে, ঘটনাটি নিশ্চিতরূপে স্থানীয় আওয়ামী লীগের গ্রুপিয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

"তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই সংখ্যালঘুদের একটি সহজ উপাদান হিসেবে টার্গেট করা হয়। যেটা অন্যান্য জায়গার মতো নড়াইলেও ঘটেছে।”

বিএনপির তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সাধারণ মানুষের কথা বলে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ দেখতে পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

"নড়াইল আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ‍সুভাষ বসু-তিনি ২/৩দিন পরে ওখানে যান। ওখানের উপজেলা চেয়ারম্যান তিনিও সম্ভবত যান নাই। প্রশাসন নির্লিপ্ত এবং এটা সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত একটি সাম্প্রদায়িক ঘটনা।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, "১৫ তারিখ হঠাৎ করে মাগরেবের নামাজের পরে প্রায় দুই-তিনশ' উশৃঙ্খল লোকজন সাম্প্রদায়িক শ্লোগান দিয়ে সাহাপাড়াতে প্রবেশ করে।

"সেখানে ১০/১২টি বাড়ি-ঘর ভেঙে তছনছ করে, সেখানে বাড়ি-ঘর ভাংচুর করা হয়, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, মন্দিরের প্রতিমা ভাঙে।

"তার অদূরেই পুলিশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে। পুলিশের নাকের ঠগার ওপরে এই ঘটনাটা ঘটল।”

বর্তমানে নড়াইলের দিঘলীয়া গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, "এখানে ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে এই অঞ্চলটাই ছিল যশোর-নড়াইল-বগুড়া মুক্তাঞ্চল। ওই সময়েও এখানে এরকম ঘটনা ঘটে নাই।

" সেই গ্রামের ওপরে এরকম নির্মমতা সেখানকার লোকজন মর্মবেদনায় ভুগছেন।"

দলের তরফ থেকে সেখানে কিছু সাহায়তা দিতে চাইলে ক্ষতিগ্রস্তরা তা ফিরিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, "আমরা কোনো সাহায্য চাই না। আমাদেরকে অনেক সাহায্য দিতে এসেছে আমরা সেই টাকা ফিরিয়ে দিয়েছি।

"কারণটা হচ্ছে যে, সাহায্য দিয়ে হয়ত আমাদের ঘরটা মেরামত হতে পারে কিন্তু হৃদয়ের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে সেই ক্ষত মুছে যাবে কিভাবে। সেখানে এখন ভয়াবহ আতঙ্ক, শশ্মানের আতঙ্ক বিরাজ করছে।"

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "নড়াইলের এই ঘটনার সঙ্গে সরকারই দায়ী। প্রতিবেদনে তা পরিস্কার করে বলা হয়েছে।

"আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই যারা সংখ্যায় কম সেই সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন-হামলা-লুটপাট-ভাঙচুরের এই ঘটনাগুলো বেড়েছে এবং তাদের সম্পত্তির বেশিরভাগ মালিক কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী।”

এসব ঘটনায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব।

"পরিকল্পিতভাবে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে তাদের গৃহ থেকে জমি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সম্পদ দখল করা হচ্ছে তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে আছে।”

নড়াইলের ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, "দুঃখজনক হচ্ছে যে, আজ পর্যন্ত এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আমরা দেখতে পাইনি।"

তদন্ত প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত ২২ জনের বাড়ি-ঘর এবং দোকান-পাটের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দিঘলিয়া রাধা মন্দির, আভরাবাগড়ি সর্বজনীন দুর্গা মন্দির, একাবাড়ি কালি মন্দির, দিঘলিয়া পালপাড়া দুর্গা মন্দির, পালপাড়া গোবিন্দ মন্দির, স্বপন সাহার বাড়ির শিব মন্দির, শশ্মান কালী মন্দির, ঋষিপাড়া চান্দি মন্দির, আখড়া বাড়ি নন্দ মাস্টারবাড়ি দুর্গা মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির তদন্ত দলের সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, অমলেন্দু দাস অপু ও অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক