গাজীপুরের জাহাঙ্গীরের বহিষ্কারাদেশ তুলে নিল আওয়ামী লীগ

দলের সম্মেলনের আগে জাতীয় কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Jan 2023, 05:52 PM
Updated : 21 Jan 2023, 05:52 PM

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে আওয়ামী লীগ; তবে কিছু শর্ত মানার বাধ্যবাধকতাও দেওয়া হয়েছে।

বহিষ্কৃতদের ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষমা চাওয়ায় প্রায় এক বছর তিন মাস পর এ সিদ্ধান্ত এল।

এ সংক্রান্ত চিঠিতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ১ জানুয়ারি সই করেন বলে শনিবার জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপ দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান।

সেই চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়ে গাজীপুর সিটির সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি মাননীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্যারের চিঠি পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাকে ক্ষমা করে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন।"

বিতর্কিত এক অডিও বক্তব্য সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর জাহাঙ্গীরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পরে বেশকিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ নভেম্বর তাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় মামলাও হয়।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় কমিটির সভায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে অব্যাহতিপ্রাপ্তদের ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে জাহাঙ্গীর শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমার আওতায় এলেন।

বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ওই চিঠিতে বলা হয়, "শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন। আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্বার্থ, আদর্শ, শৃঙ্খলা তথা গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার জন্য এর আগে আপনাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার/অব্যাহতি প্রদান করা হয়।

"আপনার বিরুদ্ধে আনিত সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ স্বীকার করে আপনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং ভবিষ্যতে সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নীতি ও আদর্শ পরিপন্থি কোনো কার্যকলাপে সম্পৃক্ত হবেন না মর্মে লিখিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।"

চিঠিতে শর্ত দিয়ে বলা হয়, “গত ১৭ ডিসেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ১৭(৬) এবং ৪৭(২) ধারা মোতাবেক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নিকট সাধারণ ক্ষমা প্রার্থনা করে আপনার প্রেরিত লিখিত আবেদন পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতে সংগঠনের স্বার্থ পরিপন্থি কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে আপনার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা হলো। ভবিষ্যতে কোনো প্রকার সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে, তা ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।"

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাহাঙ্গীর আলমের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে সমালোচনার সৃষ্টি করে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করতে শোনা যায় জাহাঙ্গীর আলমকে।

জাহাঙ্গীর মেয়র পদও ফিরে পেতে পারেন বলে গত মাসের শেষে গাজীপুরের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের এক কথায়।

তিনি বলেছিলেন, তাকে তো মেয়র পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি; সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িকভাবে বরখাস্ত যেসব কারণে করা হয়েছে, সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এ বিষয়ে বলা যাবে।

জাহাঙ্গীরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রলীগের মাধ্যমে। গাজীপুরের কানাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোনোর পর চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সালে মানবিক শাখায় এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এর মধ্যে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন, দায়িত্ব পান কেন্দ্রীয় কমিটিতে।

এলএলবি পাস করলেও ব্যবসায়ী হিসেবেই নিজেকে তৈরি করেন জাহাঙ্গীর, সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। গাজীপুর উপজেলা পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।

এরপর মেয়র হওয়ার সাধ জাগে তার। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনের আগে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে মেয়র পদের প্রার্থী হয়ে যান।

কিন্তু ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীরের বদলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল টঙ্গী পৌরসভার মেয়র আজমত উল্লাহ খানকে। আর জাহাঙ্গীরকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে হয়। অবশ্য তারপর নবগঠিত গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান তিনি।

শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচনে আজমত উল্লাহ হেরে যান বিএনপি নেতা এম এ মান্নানের কাছে। পাঁচ বছর পর প্রবীণ আজমত উল্লাহকে বাদ দিয়ে নবীন জাহাঙ্গীরের হাতেই নৌকার বৈঠা তুলে দেয় আওয়ামী লীগ। বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকারকে হারিয়ে ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ারে বসেন ৩৫ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর। 

Also Read: মেয়র পদ থেকে জাহাঙ্গীর সাময়িক বরখাস্ত: মন্ত্রী

Also Read: গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার

Also Read: জাহাঙ্গীরকে আওয়ামী লীগের কারণ দর্শাও নোটিস

Also Read: গাজীপুরের জাহাঙ্গীরের বিষয়ে ‘সিদ্ধান্ত আসছে’

Also Read: জাহাঙ্গীরেই নৌকা ভিড়ল নগরভবনে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক